অদৃশ্য এক মোহনায় হাজির হলেন বঙ্গবন্ধু ও ইয়াসির আরাফাত

অঘোর মন্ডল

একটা ট্রফি। ইতিহাসের দুই মহান নেতাকে অদৃশ্য এক মোহনায় এনে দাঁড় করালো। বঙ্গবন্ধু কাপ গেল প্যালেস্টাইনে। পশ্চিম এশিয়ার দেশ প্যালেস্টাইন। এই দেশটার কথা উঠতেই ঘুরে ফিরে চলে আসবে ইয়াসির আরাফাতের কথা। আর সেই আরাফাতের দেশেই গেল বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ।

‘আসলে শেখ কামালের আবাহনী অনেককে অনেক কিছু দিয়েছে। অনেকে অনেক কিছু পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর নামটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা এবং চিন্তা খুব কম হয়েছে। বরং এখন ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, ক্রীড়াপ্রেমী শেখ কামালকেও ‘ আওয়ামী লীগ’ নামক দলটার বৃত্তে আটকে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সেটা সফল হলে প্রধানমন্ত্রীর আবেগতাড়িত আনুকুল্য পাওয়া অনেকের জন্য সহজ।’
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নতুন করে কিছু লেখার দরকার পড়ে না। বঙ্গবন্ধু কিংবা ইয়াসির আরাফাত কেউ আর এই গ্রহে নেই। ফুটবল গ্রহেও নেই। তারপরও ফুটবল ঈশ্বরই যেন তাঁদের খুঁজে আনলেন। বঙ্গবন্ধু কন্যাই নিজের হাতে বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত কাপটা তুলে দিয়েছেন প্যালেস্টাইনদের হাতে।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী স্প্যানিশ ভাষায় যখন অনূদিত হলো, ঠিক সেই সময় ফুটবল নামক একটা মহান খেলার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু পৌঁছালেন নতুন প্রজন্মের প্যালেস্টাইনদের কাছে। বড় বড় আওয়াজ তোলা রাজনীতিবিদরা যেখানে ব্যর্থ, সেখানেই ফুটবল নামক একটা খেলা সফল।

ফুটবল শুধুই একটা খেলা নয়। শুধুই বিনোদন নয়। কিংবা শুধুই অর্থ উপার্জনের পণ্যও নয়। কখনো কখনো খেলাটা ইতিহাস-ভূগোল-অর্থনীতি-সংস্কৃতি-কূটনীতির অংশ হয়ে যায়। সেটা আরও একবার প্রমাণিত হলো।

বঙ্গবন্ধুর নিজের এবং তাঁর পরিবারের খুব প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। কিন্তু সেই খেলাটা কেন যেন ভাল কোন স্তরে পৌঁছাতে পারলো না এদেশে। তাঁর দায় খানিকটা রাজনীতিবিদদের নিতে হবে। খেলাটা যতদিন পর্যন্ত দলীয় রাজনীতির বাইরে ছিল ততোদিন তাঁর উন্নতির গ্রাফটা একটু উর্ধ্বমুখি ছিল। কিন্তু ফুটবলে যখন দলীয় রাজনীতিবিদদের দাপাদাপি বেড়ে গেলো তখনই খেলাটার জীর্ণ চেহারাটা বেরিয়ে পড়তে শুরু করলো।

এখন তার দীনতা সবার জানা। স্বল্প উন্নত দেশ যখন আজ উন্নয়নশীল দেশের সরণিতে পা রেখেছে, তখন ফুটবল পা পিছলে গড়াতে গড়াতে অনেক নিচে নেমে গেছে। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হচ্ছে, দেশের ফুটবলের মান উন্নয়নে যা যা করণীয় সরকার তা করবে। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন, কীভাবে? কাদের দিয়ে? শুধু সরকারি টাকা দিয়ে ফুটবল উন্নয়ন সম্ভব নয়। হ্যাঁ, একটা কথা আছে তৃতীয় বিশ্বের জন্য। এখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা ছাড়া কারো ভাগ্যের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ফুটবলের উন্নয়নেও রাষ্ট্র তথা সরকারের পৃষ্টপোষকতা দরকার। কিন্তু তারও আগে দরকার উন্নয়ন পরিকল্পনার। সেখানেই গলদ।

পরিকল্পনায় ত্রুটি থাকলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবলে। সরকার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সারা দেশের প্রথমিক স্কুলগুলোর ছেল-মেয়েদের প্রতি বছর বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমতা টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। যার ফল হিসেবে আজ বাংলাদেশের বয়স ভিত্তিক নারী ফুটবল দলগুলো ভাল করছে।

এই ভাল করার সিংহভাগ কৃতিত্ব দিতে হবে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। তারা পরিকল্পনাটা করেছিলেন বলে সারা দেশে প্রতি বছর লাখ লাখ কিশোরী ফুটবল খেলছে। কলসিন্দুর নামে একটা স্কুল আছে। সেখানকার মেয়েরা ভাল ফুটবল খেলে সেটা জেনেছে মানুষ সেই বঙ্গমাতা ফুটবলের সৌজন্যে। সুতরাং পরিকল্পনা সঠিক হলে , কিছু কিছু উন্নতির ছোঁয়া সব জায়গায় লাগে। নারী ফুটবল তার বড় উদাহরণ।

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এটা ঠিক। এবং তার অনেক কিছু দৃশ্যমান। আবার এটাও ঠিক অনেক ক্ষেত্রে আমাদের পশ্চাদপসরণ ঘটেছে। এর কারণ ; সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বুনটের দুর্বলতা। এই বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু ভুল-ত্রুটি স্বীকার করার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে নেই। আমাদের রাজনীতিতেও নেই।

ফুটবল নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে এক সময় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে নিষিদ্ধ করেছিল বিশ্ব ফুটবলের সবোর্চ্চ সংস্থা ফিফা। সেই নিষেধাজ্ঞার কথা অনেকে হয়তো ভুলেও গেছেন। আবার সেই রাজনীতিটা এমন ছিল যে বঙ্গবন্ধুর নামে টুর্নামেন্ট অতএব ওটা আর আয়োজন-ই করা হয়নি লম্বা একটা সময়।

বর্তমান সরকার টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকেই বা ক’বার বঙ্গবন্ধু কাপ আয়োজন করতে পেরেছে। ধারাবাহিকভাবে কেন আয়োজন করা যায়নি সেটাও ভাবা দরকার। নির্বাচনী বৎসরে এসে যদি আয়োজন করা সম্ভব হলো, তাহলে আগেও নিয়মিত আয়োজন করতে না পারার কারণটা খতিয়ে দেখা দরকার।

তর্কের খাতিরে অনেক কারণ উল্লেখ করা যাবে। তবে নতুনভাবে অনেক কিছু চিন্তা করার আছে দেশজ ফুটবলকে এগিয়ে নেয়ার জন্য। বাফুফে সভাপতি নিজে লম্বা সময় ধরে সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন-সাফ এর সভাপতির দায়িত্বে। সাফের বেতনভোগী সাধারণ সম্পাদকও বাংলাদেশের। তারা কি সাউথ এশিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ নামে একটা টুর্নামেন্ট বাংলাদেশে নিয়মিত আয়োজন করার উদ্যগ নিতে পারতেন না।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করে একটা প্রস্তাবনা নিয়ে সাফের অন্যান্য দেশের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। তারা করেছেন তেমন কোন খবর অন্তত গণমাধ্যমে আসেনি। শেখ কামাল দেশের ফুটবলকে আধুনিকায়নের চেষ্টা করেছিলেন দেশ স্বাধীনের পর সাড়ে তিন বছর জীবিত থাকার সময়ে। এবং তিনি অনেকাংশেই সফল ছিলেন। তাঁর নামে চট্টগ্রাম আবাহনী একটা টুর্নামেন্ট বার দুয়েক করেছে। কিন্তু তাদেরও যেন উৎসাহে ভাটা।

আসলে শেখ কামালের আবাহনী অনেককে অনেক কিছু দিয়েছে। অনেকে অনেক কিছু পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর নামটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা এবং চিন্তা খুব কম হয়েছে। বরং এখন ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, ক্রীড়াপ্রেমী শেখ কামালকেও ‘ আওয়ামী লীগ’ নামক দলটার বৃত্তে আটকে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সেটা সফল হলে প্রধানমন্ত্রীর আবেগতাড়িত আনুকুল্য পাওয়া অনেকের জন্য সহজ।

অথচ প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক পৃষ্টপোষকতায় শুধু কামালের নামে হতে পারতো সাফ ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ। ওরকম একটা টুর্নামেন্ট বাংলাদেশে নিয়মিত হলে দেশের ফুটবলের পাশাপাশি আঞ্চলিক ফুটবল পরিচালনার পরোক্ষ একটা নিয়ন্ত্রণও থাকত দেশের ফুটবল কর্তাদের হাতে।

আসলে এখন কেউ শুধু ফুটবলার, ফুটবল কর্তা, এসব পরিচয়ে খুশি থাকতে চান না। তাতে তাঁরা সন্তুষ্টও নন। বরং তাঁরা এই সব পরিচয়কে পুঁজি করে নিজেদের রাজনীতির পরিসরকে আরো বাড়াতে চান। ফুটবলের পশ্চাদপসরণের এটাও একটা কারণ।
তাই ফুটবলের উন্নয়নে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়। অন্যদের ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষেও লাগাম টানা জরুরি।