পেনশনজীবীদের ভাগ্য খুলবে কবে

পেনশন

আধুনিক সমাজব্যবস্থায় প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিষয় আলোচিত হলেও বাস্তবে তাঁরা উপেক্ষিত। বিশেষত, বাংলাদেশের মতো উঠতি পুঁজির দেশে তাঁদের দুরবস্থা উত্তরোত্তর বাড়ছে। যৌথ পরিবারপ্রথা ভেঙে যাওয়ায় এটা প্রকট হয়েছে আরও। প্রবীণ নাগরিকদের একটি অংশ দীর্ঘদিন প্রজাতন্ত্রের চাকরি করে মেয়াদান্তে অবসরে গেছে। নিয়মমতো কিছু পেনশনও পায়। তবে সে নিয়মটি বৈষম্যমূলক। তার প্রতিকার চেয়ে বারবার আবেদন–নিবেদন করা হচ্ছে। কিন্তু তারা ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ানোর অবস্থানে নেই। যারা সে অবস্থানে আছে, তারা এর প্রতিকারের আশ্বাস দিলেও তেমন কিছু হয়নি অদ্যাবধি।

এখানে অসংগতি নানাবিধ। বিশেষ করে সর্বশেষ বেতন স্কেল দিতে গিয়ে তা আরও বেড়েছে। বেতন স্কেল কার্যকর করতে গিয়ে পেনশন বাড়ানো হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। অথচ বেতন বেড়েছে প্রায় শতভাগ। তদুপরি নতুন করে যাঁরা পেনশনে যাবেন, তাঁদের পেনশন–সুবিধাও করা হয়েছে অনেক আকর্ষণীয়। অথচ ২০০৯, ২০০৫, এমনকি এর আগের বেতন স্কেল থেকে পেনশনে যাওয়া কর্মচারীদের বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি বললে অত্যুক্তি হবে না। এখনকার সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিজেদের গৃহপরিচারকদের বেতন–ভাতার জন্য যে নগদ সহায়তা পান, সে পরিমাণ বেতনও ছিল না ২০০৫–এর আগে একই পদ থেকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের। বিনা সুদে গাড়ি কেনার ঋণের পাশাপাশি তা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপসচিব পর্যায় পর্যন্ত যে ভাতা পান, তা–ও ২০০৯–এর আগে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের বেতন থেকে বেশি। এ গাড়িসেবার নগদায়নে পরিবহন পুলের ওপর চাপ কতটা কমল, ব্যয়ভারই–বা হ্রাস পেল কী পরিমাণ তার কোনো মূল্যায়নও আমাদের অজানা।

অবসরজীবীরা বর্তমানে কর্মরতদের অবসর–সুবিধাদি ইতিবাচকভাবেই দেখেন। রাষ্ট্রের সামর্থ্য বৃদ্ধির সুফল তার চাকুরেরাও ভোগ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাঁরা ৫ শতাংশ সুদে বাড়ি কেনার জন্য ব্যাংকঋণ পেতে যাচ্ছেন। ব্যাংক সুদের অবশিষ্ট টাকা দেবে সরকার। কর্মরত অবস্থায় কেউ মারা গেলে তাঁর বাড়ি–গাড়ির ঋণ পরিশোধ করতে হবে না। মানবিক দিক বিবেচনায় এটি প্রশংসনীয়। এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি অবসরজীবীরা প্রত্যাশা করেন, বর্তমানে ক্ষমতার চাবিকাঠি যাঁদের হাতে, তাঁরা তাঁদের পূর্বসূরিদের আর্থিক দুরবস্থা নিরসনেও ভূমিকা রাখবেন।

অবসরজীবীরা কর্মরতদের মতো নামমাত্র সুদে বাড়ি করার ঋণ কিংবা বিনা সুদে গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের টাকা চান না। যাঁরা সরকারের কাজ করছেন, এসব তাঁদেরই প্রাপ্য। তবে অবসরজীবীরা যাতে ছিটেফোঁটা কিছু পান, সেদিকে নজর দেওয়া সংগত। তাঁদের একটি দাবি, একই পদের জন্য একই পেনশন চালু করা। অর্থাৎ আগের বেতন স্কেল থেকে অনেক কম বেতনে যাঁরা অবসর নিয়েছেন, তাঁদেরও একই পদে প্রচলিত বেতন স্কেল থেকে অবসর গ্রহণকারীদের সমান পেনশন দেওয়া। এটা সময়ের দাবি। ১৯৯৬ সালে ভারতে একটি বেতন স্কেল কার্যকর করায় একইভাবে পুরোনো অবসরজীবীদের চেয়ে নতুনদের সুবিধা অনেক বেড়ে যায়। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আদালতে যান। মামলা যুগাবধি চলে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ২৮ এপ্রিল ২০১৮–এর একটি খবরে দেখা গেছে, ভারত সরকার সময়–নির্বিশেষে অবসরপ্রাপ্ত সব মেজর জেনারেলকে একই পরিমাণ পেনশন দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা আদালতকে জানালে সে মর্মে মামলাটি নিষ্পত্তি হয়।

আরেকটি প্রধান দাবি, যাঁরা পুরো পেনশন সমর্পণ করে ফেলেছেন, তা একটি মেয়াদান্তে পুনর্বহাল। এখানে অর্ধেক পেনশন সমর্পণ করা বাধ্যতামূলক। অবশিষ্ট অর্ধেকও ১০০ গুণ টাকা নিয়ে সমর্পণ করা যেত। বিপদে পড়ে তা–ও অনেকে করে ফেলেছেন। আট বছর চার মাসের পেনশন। দাবি আসছে এটা মেয়াদান্তে পুনর্বহালের। ভারতে এক-তৃতীয়াংশ পেনশন সমর্পণ করা যায়। সেটিও এখন ১৫ বছর পর আপনা থেকেই পুনর্বহাল হয়। এ বিষয়ে ২৩ মার্চ ২০১৭ তারিখে প্রিন্সিপাল কন্ট্রোলার অব ডিফেন্স অ্যাকাউন্টসের একটি নির্দেশিকা নজরে এসেছে। শুধু তা নয়, বয়স ৮০ হলে সে মূল পেনশনে যুক্ত হতে থাকে বোনাস। শতায়ুরা পান শতভাগ বোনাস। স্বভাবতই এত পরমায়ু খুব কম লোকই পান। তাই সরকার দিল–দরাজভাবে রাষ্ট্রের টাকা লুটিয়ে দিচ্ছে, এমনও বলা যাবে না।

বার্ধক্যে টাকা প্রয়োজন কতটা, এটা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবেন না। যাঁরা কোনো না কোনোভাবে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাঁদের কথা ভিন্ন। তাঁরা সংখ্যায় খুবই কম। ওপরের দিকের পদ থেকে যাঁরা অবসর নিয়েছেন, তাঁরা সরকারি আনুকূল্যে একটি জমি পেয়ে বাড়ি করে কিংবা ফ্ল্যাট নিয়ে কোনোরকমে টিকে আছেন। তবে অবসরে যাওয়া শতকরা ৮০ ভাগ কর্মচারী শোচনীয় আর্থিক দুর্ভোগে থাকেন। হাত পাততে হয় ছেলেমেয়ের কাছে। সবাই দেয়ও না। কারও আবার তেমন সংগতিও নেই। বার্ধক্যের বড় ব্যয় চিকিৎসা। সরকারি চিকিৎসাসেবা নামমাত্র মূল্যেই পাওয়ার কথা। তবে সেখানেও যোগাযোগ না থাকলে দুর্বিষহ অবস্থায় পড়তে হয়। অতি সজ্জন চিকিৎসকেরাও প্রচণ্ড ভিড়ে মানসম্পন্ন চিকিৎসা দিতে পারেন না। তাই নির্ভর করতে হয় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর। সীমিত আয়ের জীবন কাটিয়ে যাঁরা অবসরে গেছেন, তাঁরা বুঝতে পারেন এটা কত ব্যয়বহুল।

পেনশনজীবীদের আয়ের একটি উৎস চাকরিতে সঞ্চিত টাকা পেনশন সঞ্চয়পত্রসহ কোনো না কোনো সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। এখানে মুনাফার হার সোয়া ১১ শতাংশ। আয়কর দিতে হয়। এসব সঞ্চয়পত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচারণা চলছে। মনে হয়, মুনাফার হার আসন্ন নির্বাচনের পরই কমে যাবে। সঞ্চয়পত্র খাতে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে কিছু বিত্তশালী লোকের টাকা নামে–বেনামে থাকতে পারে। এটা ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে নির্ধারিত সীমার ঊর্ধ্বে থাকা সঞ্চয়পত্রগুলোর ওপর মুনাফা দেওয়া বন্ধ করা যায়। তবে পেনশন সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র নেহাতই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির। এখানে মুনাফার হার কমালে তাঁদের রিজিক কাটা পড়বে। তাঁদের মধ্যে আছেন বিপুলসংখ্যক পেনশনার।

বলা হয়, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিতে রাজকোষে টান পড়ছে। তাহলে জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ডে মুনাফার হার এখনো ১৩ শতাংশে থাকে কীভাবে? এখানে রাখা যায় বেতনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা। ভারতে প্রতি তিন মাস অন্তর এ মুনাফার হার পর্যালোচনা করা হয়। বর্তমান জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তা আছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। গত দুই প্রান্তিকেও তা–ই ছিল। আগামী অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে। সেখানে বেতনের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত রাখা যাবে। অবশ্য আমাদের এ হারটাকে যৌক্তিকই বলব।

অবসরজীবীদের এখনকার প্রধান দুটো দাবি, একই পদ থেকে অবসরে যাওয়াদের একই পেনশন আর যাঁরা পুরো পেনশন সমর্পণ করে বসে আছেন, তাঁদের নেওয়া ১০০ মাস, অর্থাৎ ৮ বছর ৪ মাসের মেয়াদ শেষে এ পেনশন পুনর্বহাল করা। এগুলো করতে রাজকোষে বড় ধরনের চাপ পড়বে, এমনও নয়। তবে বিধিবিধান কিছু পরিবর্তন করতে হবে। এভাবে বিধিবিধান পরিবর্তন করেই তো সরকারি চাকুরেদের গাড়িসেবা নগদায়ন ও স্বল্প সুদে বাড়ি করার ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ দুটো ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। এটা সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের কিছুটা সম্প্রসারণ বলেই বিবেচনা করা যায়। বিধিবিধানে পরিবর্তন আনার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা নিতে হবে, এখন যাঁরা কর্মরত আছেন, তাঁদের। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের ভূমিকা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই তাঁদের অনেকের সদিচ্ছাও আছে। আমলাদের পরিবর্তন বিমুখ বলে যে রটনা, তা কিন্তু বিভিন্ন প্রয়োজনে তাঁরা ভুল প্রমাণ করেছেন। অবসরজীবীদের জন্যও দয়া করে একটু জোরালো উদ্যোগ নিন। কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভাবতে হয়, এ কবরবাসীরা একদিন আমাদের মতো জীবন্ত ও সক্রিয় ছিল।