বার্তাবাংলা ডেস্ক »

সমবয়সী শিশুরা যখন ক্লাসের সব পড়া সানন্দে পড়ে শেষ করে। কাজরীর তখন একদম পড়তে ইচ্ছা করে না। সন্ধ্যা হলেই টিভিতে কার্টুন, নয়তো মায়ের ফোনে ইউটিউবে মেতে থাকে সে। তারপর একদিন বুদ্ধি আঁটলেন মা। যদি তুমি পড়তে না বসো, তাহলে রাতে ভূত এসে তোমাকে তুলে নিয়ে যাবে। এই ভয়ে কাজ হলো। এখন অল্প অল্প করে সে পড়তে বসে। তেমন খাওয়া নিয়েও ভয় দেখান মা মাঝে মাঝে। সে ঠিকমতো তার ভাত খাওয়া শেষ না করে তাহলে সাপ এসে তাকে কামড় দিয়ে যাবে। ছোট্ট শিশু সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে মায়ের এই দেখানো ভয়ে। আবার কার্টুনের ভক্ত আবীর স্কুল থেকে ফিরেই টিভির রিমোট নিয়ে বসে পড়ে। টম অ্যান্ড জেরি, মিকি মাউস, ডিজনিসহ তার পছন্দের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কৌতূহলবশত একদিন ভয়ের সিনেমা দেখে তো অবস্থা খারাপ। ভয়ে সারারাত ঘুমাতে পারল না। বাথরুমে যেতে হলেও মাকে দরকার। সারাক্ষণ যেন সিনেমার অ্যানাকোন্ডা মাথার মধ্যে আছে। কোমলমতি শিশুরা অনেক সময় গল্প শুনে বা ছবি দেখে ভয় পায়। আর এই ভয় শিশুর মনের গভীরে ছাপ ফেলে। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ হয় বাধাগ্রস্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের কোনো কাজ করানোর জন্য ভয় দেখালে তা তার মনে গেঁথে যায়। এর ফলে ওই শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং আত্মবিশ্বাস কমে যায়। এর ফলে শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে না। তাই শিশুদের কোনোভাবেই ভয় দেখানো উচিত নয়।

এ রকম পারিবারিক কলহের চাপে আবীরের মতো অনেক শিশুর স্বাভাবিক জীবনই অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় শিশুদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেসব শিশু মা-বাবার মনোমালিন্য দেখতে দেখতে বড় হয়, তারা হতাশ, অসামাজিক ও সহিংস হয়ে ওঠে। নানা অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকে তারা। তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। ফলে মনোসংযোগের ঘাটতিও দেখা দেয়। মানসিক রোগ ও ব্যক্তিত্বের অস্বাভাবিকতা ঘটতে পারে। ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ-২০০৯’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা যায়, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। এমন ঘটনা আবার মেয়েশিশুর তুলনায় ছেলেশিশুর মধ্যে বেশি। মেয়েশিশুদের ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশের পাশাপাশি ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ ছেলেশিশু মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গবেষকরা বলেন, ‘শিশুদের ওপর মানসিক আঘাতের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষতিকর। যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মানসিক আঘাত শিশুর পরবর্তী জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে, আবেগজাত সমস্যায় আক্রান্ত করে।’

প্রতিদিন মা-বাবার ঝগড়ার প্রত্যক্ষদর্শী অনেক শিশুর মধ্যে পরবর্তীকালে ব্যক্তিত্বের অস্বাভাবিকতাও দেখা যায়। সমাজে মানিয়ে চলতে অসুবিধা হয় তাদের। গর্ভকালে যেসব মা নির্যাতনের শিকার হন অথবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন, তাদের সন্তানও জন্মের পর নানা জটিলতায় ভোগে। নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই মেডিকেল সেন্টারের ট্রমাটিক স্ট্রেজ স্টাডিজ বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, মাতৃগর্ভে থাকার সময় যাদের মা মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছিলেন, সেই শিশুরা সহজেই মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে এবং তাদের মধ্যে অ্যাংজাইটি বা পোস্ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার হওয়ার আশঙ্কা বেশি।নিরাপত্তাহীনতা ও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি : ইউনিসেফের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, পারিবারিক কলহের মধ্যে বেড়ে ওঠা অথবা মাকে নির্যাতিত হতে দেখা শিশুদের জীবনের প্রথম দিকের বছরগুলোতে তারা হয় বিশেষভাবে অরক্ষিত, অসহায়। এসব শিশু পরবর্তীকালে হিংস্র, ঝুঁকিপূর্ণ বা অপরাধমূলক আচরণ করতে পারে। বিষণ্ণতা বা তীব্র দুশ্চিন্তায় ভোগার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে এসব শিশু। শিশুর মানসিক বিকাশে মা-বাবার ভালোবাসা, সান্নিধ্যের কোনো বিকল্প নেই। পরিবারে মাকে নির্যাতিত হতে দেখলে শিশু নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। শিশুর মা-বাবার বন্ধুত্বপূর্ণ ও মধুর সম্পর্ক শিশুর মধ্যে পরম সুখ ও নিরাপত্তা বোধ জাগায়। বাবাকেও তাই শিশুর মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে হবে। ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সিলিং সেন্টারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ইশরাত শারমীন রহমান বলেন, পারিবারিক নির্যাতন দেখে বেড়ে ওঠা শিশুরা এমন ধারণা নিয়ে বেড়ে ওঠে যে, অন্যকে আঘাত করা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তাই সে যে কাউকে আঘাত করতে পারে। আবার সেও অন্যের কাছ থেকে আঘাত পেতে পারে। তাই বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই তাদের নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি হলো শারীরিক বিকাশ। আর মানসিক বিকাশ হলো আচার-ব্যবহার, চিন্তা-চেতনা, কথা বলা, অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষমতা অর্জন। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ছাড়া শিশু তথা মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। গর্ভকালীন মায়ের অপুষ্টি, মা-বাবার মধ্যে কলহ, পারিবারিক নির্যাতন, মাদকাসক্তি, থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনের আধিক্য ও অভাব, জন্মগত ত্রুটি, প্রসবকালীন জটিলতা, শব্দদূষণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ ইত্যাদি কারণে শিশুর বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় মা-বাবার ভূমিকা :শিশুর মৌলিক চাহিদাগুলো থাকার জন্য তার মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষুণ্ণ হয়। তাই তার স্বাধীনতার চাহিদা, আত্মস্বীকৃতির চাহিদা, সক্রিয়তার চাহিদা, নিরাপত্তায় চাহিদা প্রভৃতি যাতে তার বাসগৃহ এবং বিদ্যালয়ে পূরণ করার সুযোগ পায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা আবশ্যক। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাসগৃহ এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অনুকূল হওয়া প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের পরিবেশ সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও বিকাশে সচেষ্ট হলেন, অথচ বাসগৃহে মা-বাবা এ ব্যাপারে সচেতন থাকলেন না, তাহলে শিশুর সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঘটবে না। শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কোনোভাবেই শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষা সম্ভব নয়। সমাজ মনোবিজ্ঞানী র‌্যাডকি মা-বাবার আচরণের সঙ্গে শিশুদের ব্যক্তিত্বের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও পর্যালোচনা চালিয়েছেন।তার গবেষণালব্ধ তথ্য নিম্নরূপ : মা-বাবার আচরণ শিশুর ব্যক্তিত্বে প্রতিক্রিয়া, প্রত্যাখ্যান আগ্রাসন, অসহায়বোধ ও ভীতি অতি। সংরক্ষণ শিশুসুলভ আচরণ, বশ্যতা, অসহায়বোধ ও উগ্রতা-নমনীয়তা ও অনুমোদনশীলতা আগ্রাসন, হঠকারিতা ও অবাধ্যতা, অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ আগ্রাসন, ঈর্ষা ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করে।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »