বার্তাবাংলা ডেস্ক »

রমা চৌধুরী নিজ নামে পরিচিত এক অমর সাহসী নারী। একাত্তরের প্রীতিলতা তিনি। একাত্তরের জননী তিনি। ‘একাত্তরের জননী’ তিনি নিজেকে দাবি করেছেন, তাঁর লিখিত বইয়ে আছে সে উল্লেখও।‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন, ‘সবদিক ভেবে দেখলে একাত্তরের জননী আমি নিজেই। পাক হানাদার বাহিনী আমাকে প্রাণে না মারলেও আমার আত্মার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে, যার ফলে নেমে এসেছে জীবনে শোচনীয় পরিণতি। আমার দুটি মুক্তিপাগল অবোধ শিশুর সাধ স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা ভরা জীবন কেড়ে নিয়েছে বাংলার মুক্তিসংগ্রাম।’

সেই জননী যিনি খালি পায়ে হাঁটতেন সন্তানদের মৃত্যুর পর থেকে। যে মাটিয়ে বুকের তাঁর সন্তানেরা ঘুমিয়ে সেই মাটির ওপর দিয়ে জুতা পায়ে কীভাবে হাঁটবেন- এ ছিল তাঁর সাদামাটা বয়ান। মাতৃত্বের অপরিমেয় ভালোবাসা জড়ানো সে কথাগুলো আমরা অনেকেই জানতাম আগে থেকেই, কিন্তু এটাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। অথচ তাঁর চিরপ্রস্থানের পর মনে হচ্ছে ভুল বলেন নি তিনি, মমত্বের পরিধিতে।

সন্তানদের প্রতি অপরিমেয় প্রেমের কাছে তুচ্ছ ছিল তাঁর ধর্মীয় আচার-রীতি। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে পোড়ানো হয় নি তাঁর ছেলেদের। পা দিয়ে হাঁটতেই হয় বলে হাঁটতেন তিনি, নইলে বুক দিয়েই হাঁটতেন-এমনটাই ছিল তাঁর বক্তব্য। তাঁর ভাষায়, ‘আমার ছেলেদের আমি পোড়াতে দিইনি। এই মাটিতে তারা শুয়ে আছে। আমি কীভাবে জুতা পায়ে হাঁটি। পারলে তো বুক দিয়ে চলতাম–ফিরতাম। তারা কষ্ট পাবে।’

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে বর্বর পাকিস্তান বাহিনী। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন, কেবল সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে। পাকিস্তানিরা তাঁর ঘরবাড়ি পুড়িয়েছিল, এমন অবস্থায় সন্তানদের নিয়ে তিনি জঙ্গলে আত্মগোপনেও ছিলেন।

যে সন্তানের ভালোবাসায় তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেননি সেই সন্তানের একজন বাংলাদেশের বিজয়ের ৪ দিন পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। অপর এক সন্তান মারা যায় পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে, এবং সে সন্তানও আক্রান্ত ছিল নিউমোনিয়ায়। এরপরের সন্তান মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়।

তিনি নিজেকে একাত্তরের জননী দাবি করতেন। সে বইয়েও ছিল তাঁর কষ্টকঠিন জীবনের গল্প। বইটির পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ সেসব গল্পের একটা অংশে তিনি লিখেন, ‘যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হলো পাক সেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিলেন। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও। তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।’

তিনি মা ছিলেন। জানেন মাতৃত্ব আর তার কদর। পৃথিবীতে কিংবা দেশে আরও মা আছেন; তারাও সন্তান বাৎসল্যে নিজেকে হাজির করেন নানা রূপে। তবে রমা চৌধুরী ব্যতিক্রম, স্বভাবে-জীবনাচরণে।বৈষয়িক অভাবে জর্জর ছিলেন জীবনের পুরোটা সময়, অথচ কারও কাছ থেকে নেননি অর্থ সাহায্য। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সময়েও নেননি কোন সাহায্য। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়েও গণভবনে গিয়েছিলেন খালি পায়ে।

শিক্ষক ছিলেন; লেখক ছিলেন। লিখেছেন অনেক। বই ফেরি করে বেড়াতেন, বিক্রি করতেন। এরআগে যখন পত্রিকায় লিখতেন তখন সম্মানি হিসেবে পাওয়া পত্রিকাগুলো বিক্রি করতেন। ওসবে কত টাকাই বা আসে, তবু সেখানেই তাঁর তৃপ্তি ছিল। বৈষয়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন এমন মানুষ আর ক’জন আছে; কে জানে?

তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। সেটা স্থানিক দূরত্বের কারণে। কিন্তু মনে পড়লেই মনে হত আপন খুব। প্রথমবার যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্লগে আলোচনা হয় তাঁকে নিয়ে তখন তাঁর ‘একাত্তরের জননী’ বইটি পরিচিত সুহৃদেরা বিক্রির ব্যবস্থা করেছিল। চট্টগ্রাম থেকে সে বই সিলেটেও এসেছিল।

একুশ তাপাদার, সৃজিতা মিতুরা সে ব্যবস্থা করেছিল। আমাদের পরিচিতদের মাঝে সে বই ছড়িয়েওছিল বেশ কিছু। রমা চৌধুরীও চাইতেন তাঁর বই কিনুক-পড়ুক সবাই। সেখানেই তাঁর যেমন আনন্দ ছিল, ছিল সেখানে তাঁর মূল্যায়নও। একেকটা বই থেকে উপার্জিত যৎসামান্য থেকেও জুটত বেঁচে থাকার বৈষয়িক অবলম্বন।

একাত্তরের জননী রমা চৌধুরীকে সহায়তা করে এসেছেন চট্টগ্রামের আলাউদ্দিন খোকন। তিনি এই বীরাঙ্গনার বই প্রকাশের পাশাপাশি দুই যুগের বেশি সময় ধরে দেখভাল করে আসছিলেন। রাষ্ট্রের উচিত তাকেও সম্মানিত করা। স্বার্থপরতার এই সময়ে এমন নিঃস্বার্থ লোকদের মূল্যায়ন না করলে আমরা নিজেরাও ছোট হয়ে যাব!

রমা চৌধুরীর ইচ্ছা ছিল একটা অনাথ আশ্রম গঠনের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ২০১৩ সালে সাক্ষাতের সময়েও প্রধানমন্ত্রীকেও তাঁর সে ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। বই বিক্রি করে সে আশ্রমের ব্যবস্থাও করতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেটা সম্ভব হয় নি, হওয়ার কথাও না। তাঁর মৃত্যুর পর এবার সরকারই সে ব্যবস্থা করতে পারে, অন্তত তাঁকে সম্মান জানিয়ে; এবং সম্ভব হলে সেটা তাঁর নামেই।

রমা চৌধুরীর মৃত্যুর পর এখন তাঁকে নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, হয়ত এ আলোচনা আরও কিছুদিন চলবে। তারপর অন্য অনেক ঘটনার ভিড়ে তিনিও হয়ত আলোচনা থেকে হারিয়ে যাবেন। হারিয়ে যাবে তাঁর স্বপ্ন। তবে এই হারানোর আগে অন্তত তাঁর অনাথ আশ্রম গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জোর দেওয়া দরকার। তাঁর প্রধান স্বপ্নে ছিল চট্টগ্রামের বোয়ালখালির নিজ বসতভিটায় অনাথ আশ্রম।

এই আশ্রম নিয়ে আরও বড় স্বপ্নও ছিল তাঁর যেখানে ছিল দেশের প্রতি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম গঠন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার একটি স্বপ্ন আছে। আর সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম গড়ে তোলা। এ জন্য ৪০ শতক করে জায়গা কিনব। যদি না পারি প্রয়োজনে দুই শতক জায়গা কিনব। সেখানেই অনাথ আশ্রম গড়ে তুলব।’ [প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৫] অর্থাৎ যেকোনো ভাবে হলেও তাঁর অনাথ আশ্রম গঠনের ইচ্ছা ছিল।

রমা চৌধুরী নেই, কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন আছে। তাঁকে আমরা মৃত্যুর পর সম্মান জানিয়েছি বিভিন্নভাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে, হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছেন তিনি শেষযাত্রায়। এই আলোচনা-শোকপ্রকাশকে এবার রুটিনওয়ার্ক থেকে বের করে নিয়ে এসে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করা দরকার। এজন্যে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত।

তিনি আমৃত্যু পুরো শরীরে ধারণ করেছিলেন একাত্তরকে। একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী একাত্তরের বীরাঙ্গনাও। এই বীরাঙ্গনার দৈহিক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বপ্নেরও মৃত্যু যেন না হয় সে উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি তাই আমাদের বিনত অনুরোধ।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »