বিয়ের কার্ডে টয়লেটের ছবি!

বিয়ের কার্ডে

ভারতের গ্রামে ‘লোটা-পার্টি’র ভরসায় দিন কাটে যে নারীদের, তাদের ‘টয়লেট এক প্রেম কথা’ মুভি নতুন দিশা দেখিয়েছিল। বাস্তবে মুর্শিদাবাদের সামসাল বেগম বিয়ের কার্ডে শৌচাগারের ছবি ছাপিয়ে নারীদের আত্ম-সম্মানবোধের বার্তা দিলেন।

অক্ষয় কুমার-ভূমি পেডনেকর অভিনীত ‘টয়লেট এক প্রেম কথা’ সিনেমাটিতে সদ্যবিবাহিত শিক্ষিতা জয়া দল বেঁধে পাড়ার মেয়ে-বউদের সঙ্গে (লোটা-পার্টি) খোলা স্থানে প্রাতঃকৃত্য সারার লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে শ্বশুরবাড়িই ছেড়ে দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে চাপিয়ে রাখা জগদ্দল ভাবনাটা কেবল সিনেমাতেই নয়, উপড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকেও।

এই বড়ঞার একঘরিয়া গ্রামেই ৩০ আগস্ট নির্মল বিয়ে অনুষ্ঠিত হলো। এই বিয়ে ইতিমধ্যে সারা গ্রামে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাত্রী উচ্চমাধ্যমিক পাস সামসাল বেগম নিতান্ত দারিদ্র্যের কারণেই কলেজে যেতে পারেননি। কিন্তু তিনি সচেতন নাগরিক হিসেবে বিয়ের কার্ডে শৌচাগারের ছবি ছেপেছেন, সে জন্যই প্রশাসনিক স্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তার বিয়ে আক্ষরিক অর্থে ‘নির্মল শুভ বিবাহ’ হয়ে উঠে।

শৌচাগার যখন ‘ইজ্জতঘর’

প্রিয়াঙ্কা ভারতীর কথা সারা ভারত জানে। শ্বশুরবাড়িতে শৌচাগার না থাকায় তিনি সংসার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। সামসাল প্রিয়াঙ্কার এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেন। কারণ, শৌচাগারের ব্যাপারে সামসাল খুব একবগ্গা। প্রায় দু’বছর ধরে গ্রামের নজরদারি টিমে মল্লিকা দাস, লায়লা বেগম, স্মৃতি দে, সালমা বেগম, রাজিয়া খাতুনের মতো সামসালও প্রতিদিন ভোরবেলা সবাইকে সচেতন করতে বেরিয়ে পড়েন।

সামসাল বলেন, ‘ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না।’ সামসালের নিজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, গ্রামের শৌচাগারসম্পন্ন দ্বিতল পাকাবাড়ির মানুষেরাও খোলা স্থানে মলত্যাগ করতে পছন্দ করতেন। তাদের বোঝাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। অনেকে সামসালের বাড়িতে প্রতিবাদও জানাতে এসেছে এই নজরদারির। নজরদারি টিমের হীরা গাঙ্গুলি, পূর্নিমা দাস বা টোটান সূত্রধর গ্রামবাসীর হাতে এ জন্য প্রহৃতও হয়েছে। সামসাল বলেন, ‘তা-ও আমরা থামিনি। আশ-পাশের সবাইকে জানিয়েছি শৌচাগারের বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’ তাই শৌচাগার সামসালের কাছে ‘ইজ্জতঘর।’

অখ্যাত একঘরিয়া গ্রামের সেল্ফ হেল্প গ্রুপের সামসাল বেগম সিনেমাটি দেখেননি। নিজের বোধবুদ্ধি থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শৌচাগার সম্পন্ন বাড়িতেই বিয়ে করবেন। তাই কি বিয়ের কার্ডেও শৌচাগারের ছবি?

পাত্র যদি রাজি না হতেন? সামসাল বলেন, ‘বিষয়টা তখন ভেবে দেখতাম। উনি রাজি না হলে আমার আপত্তি থাকত। তবে উনি রাজি হয়েছেন।’ আদতে তিনি মনে করেন, রোগজীবাণু, দূষণ থেকে বাঁচতে যেমন খোলাস্থানে মলত্যাগ করা উচিত নয়, তেমনি মেয়েদের সম্মান রাখতেও শৌচালয় খুবই দরকারি। আর তাই বিয়ের কার্ডেও ছেপেছেন শৌচাগারের ছবি।

পাশের গ্রাম পাঠানপাড়ার পাত্র তাউসেফ রেজা আহমেদও এই কাজে বাধা দেননি। আর বিয়েতেই বড়ঞার যুগ্ম বিডিও শ্যামলকান্তি শিকারির সামনে নবদম্পতি অঙ্গীকার করলেন নির্মল বাংলা গড়ার। সামসাল ভবিষ্যতে নজরদারির কাজ চালিয়ে যাবেন। বিয়ের আসরে নববধূ সাজে তিনি বললেন, ‘এখন এখান থেকে চেষ্টা করেছি। এবার শ্বশুরবাড়ি থেকেও নির্মল বাংলার প্রচারের চেষ্টা করব। অবশ্যই স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে।’

২০১৪ সালে স্বচ্ছ ভারত মিশন শুরু হওয়ার পর খোলা জায়গায় মলত্যাগের প্রবণতা কমেছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, গত ৪ বছরে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ খোলা স্থানে মলত্যাগ বন্ধ করে শৌচালয় ব্যবহার করছে। পশ্চিমবঙ্গেও ‘মিশন নির্মল বাংলা’ উদ্যোগের আওতায় শৌচাগার ব্যবহারে মানুষকে আগ্রহী করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরও এখনো এই ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’তে এই কাজ অনেকটাই বাকি। এখনো অভ্যাসের বশে অনেকে মাঠে-ঘাটেই যেতে পছন্দ করেন আবার সচেতনতার অভাবে অনেক বাড়িতেই শৌচাগার নেই।

রাজ্যের এই ছবিটার বিপরীতে বিয়ের কার্ডে ‘ইজ্জতঘর’-এর ছবি ছাপানোয় সুবিধাই হয়েছে জেলা কর্মকর্তাদের। মনিতেই মুর্শিদাবাদকে নির্মল জেলা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য প্রশাসনের উদ্যোগের অভাব নেই। সেখানে সামসাল নিজেই উদ্যোগ নিয়ে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিয়েতে উপস্থিত যুগ্ম বিডিও শ্যামলকান্তি শিকারি বলেন, ‘মানুষের বদভ্যাস পরিবর্তন করা খুব কঠিন। ৩ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ এখনো পুরানো অভ্যাস বদলাতে পারেননি।’

সাহসী ও সচেতন সামসালের বিয়ের বাসরে এই কর্মকর্তা প্রচার করতে ছাড়েননি। আমন্ত্রিত অতিথিদের হাতে বিলি করেছেন লিফলেট।

এসব দেখে নির্মল বিয়ের পাত্র তাউসেফ রেজা আহমেদ বলেন, ‘যখন থেকে বিয়ে ঠিক হয়েছে, তখন থেকেই সামসালকে সাহায্য করে এসেছি। বলেছি, ভালো করে কাজ করো। ভবিষ্যতেও সাহায্য করবো। মিশন নির্মল বাংলায় প্রচারের কাজ করবো।’ডিডব্লিউ।