বার্তাবাংলা ডেস্ক »

সাম্প্রতিক সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে যৌক্তিক বলেই অভিহিত করেছিলেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। কিন্তু সেই যৌক্তিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা-হয়রানি অব্যাহত থাকলেও তাদের ওপর যারা সন্ত্রাসী হামলা করেছে, তাদের টিকিটিও খুঁজে পাচ্ছে না সরকার।

বুধবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় যেসব স্থানে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি, সেখানেও থানা-পুলিশ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামিদের অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতী বলে আখ্যায়িত করেছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে গিয়ে এখন হলো দুষ্কৃতী। অস্বীকার করা যাবে না যে শিক্ষার্থীরা সভা-মানববন্ধনের পাশাপাশি কয়েক দিন সড়কের যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণও করেছিল, যেসব যানবাহনে বৈধ কাগজপত্র ছিল না, সেসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা পুলিশকে সহায়তা করেছে। কিন্তু নিজেরা আইন হাতে তুলে নেয়নি। এই কাজের জন্য শিক্ষার্থীরা সর্বমহলে প্রশংসিত হলেও এখন থানা-পুলিশের কাছে চিহ্নিত হয়েছে দুষ্কৃতী হিসেবে।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ছাত্র আন্দোলনের সময়ে সংঘটিত ঘটনার মামলার হালনাগাদ খবর জানতে চাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। এর আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যে শিক্ষার্থীরা নিগৃহীত ও নাজেহাল হয়েছে, তারাও মামলা ও হয়রানি থেকে রেহাই পায়নি। ঈদের আগে শিক্ষার্থীরা জামিন পেলেও এখনো অনেকের নামে মামলার খড়্গ ঝুলছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দায়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সরকার আইনি ব্যবস্থার নামে মামলা-হয়রানি করলেও তাদের ওপর যারা হামলা করেছে, তারা রয়ে গেছে আইনের ঊর্ধ্বে। দেশবাসী দেখেছে আন্দোলন দমনের নামে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একশ্রেণির নেতা-কর্মী কীভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সে সময় সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলেছিলেন, অপরাধী যে–ই হোক না কেন, কেউ ছাড় পাবে না। তথ্যমন্ত্রী সাংবাদিক নিগ্রহকারীদের আইনের আওতায় আনার কথা বললেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে আক্রমণকারীরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে এবং পত্রিকায় ও টিভি ফুটেজে তাদের ছবিও দেখা গেছে। সরকার চাইলে অনায়াসে তাদের ধরতে পারত।

ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে যেসব শিক্ষার্থী আহত হয়, তাদের অনেকে এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রাজিবুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী এখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না হলে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন না। এ ব্যাপারেও সরকারের করণীয় আছে বলে মনে করি। একটি যৌক্তিক আন্দোলনকে অযৌক্তিক পথে নিয়ে যাওয়ার পরিণাম কখনোই ভালো হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে বৃহত্তর জনগণের স্বার্থে। এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে যদি কেউ নাশকতা করে থাকে, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিলে কারও আপত্তি থাকবে না। কিন্তু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের গয়রহ দুষ্কৃতী আখ্যায়িত করা শুধু বেআইনি নয়, নিষ্ঠুরতাও বটে। কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই আচরণ মেনে নেওয়া যায় না।

এ অবস্থায় সরকারের কাছে আমাদের আহ্বান, ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো এখনই প্রত্যাহার করা হোক। একই সঙ্গে তাদের ওপর যারা হামলা করেছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। আন্দোলন দমনের নামে যারা দুষ্কর্ম করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন; নিরীহ শিক্ষার্থীদের হয়রানি করবেন না।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »