জার্মানির হামবুর্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঈদ-উদযাপন

একুশে আগষ্ট যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে জার্মানির বিভিন্ন শহরে উদযাপিত হয়েছে মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। জার্মানির বন্দর নগরী হামবুর্গে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে আয়োজিত ঈদ জামায়াতে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন ।

বাংলাদেশের মতো হাটে-ঘাটে কুরবানীর জন্য গরু, ছাগল, মহিষ-ভেড়ার দেখা নেই, তবুও হামবুর্গের বাঙালি অধ্যুষিত হউপ্টবাহনহোফ এলাকায় ঈদের আমেজ ছিল অনেকটা বাংলাদেশের মতোই। এদিন অনেকেই অফিস থেকে বিশেষ ছুটি নিয়েছিলেন। হেমন্তের হিম হিম ভোরে নারী, শিশুসহ পরিবারের সবাই নানা রঙের পাজামা-পাঞ্জাবী, টুপি, শাড়ি, হিজাব পরে হাতে জায়নামাজ নিয়ে হামবুর্গের প্রাণকেন্দ্র হউপ্টবাহনহোফের ঈদগাহ মাঠে জমায়েত হয়েছিলো।

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক লা শারীকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নিয়মাতা লাকাওয়াল মুলক লা শারীকা লাক …….. ধ্বনিতে মূখরিত হয়ে উঠে ইদগাহ প্রাঙ্গন। মসজিদের ভেতর জায়গা না হওয়ায় মসজিদের অদূরে তাবু টানিয়ে মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজের আগে কুরবানীর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়। ঈদের জামাতের ইমামতি করেন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন আলহাজ্ব হযরত মাওলানা হাফেজ মাহবুবুর রহমান। বিভিন্ন ভাষী মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশি এই ইসলামিক স্কলার একাধারে আরবী, উর্দু, বাংলা এবং জার্মান ভাষায় খুতবাহ পাঠ করেন।

ঈদের জামায়াত পরবর্তী খুতবায় ইমাম মাওলানা মাহবুবুর রহমান বলেন, ইসলামের পরিভাষায় কোরবানি হলো- নির্দিষ্ট পশুকে একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে নির্দিষ্ট সময়ে তারই নামে জবেহ করা। মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে জবাই করা পশুর মাংস বা রক্ত কিছুই পৌঁছায় না, কেবল নিয়ত ছাড়া। ঈদুল আজহার অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে, মনের পশু অর্থাত্ কুপ্রবৃত্তিকে পরিত্যাগ করা। সূরা হজ্বে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘‘এগুলোর গোশ্ত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে যায়।’’

মানবজীবনে সব জিনিসের চেয়ে আল্লাহর নির্দেশকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে কোরবানিতে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবনের প্রিয়তম বস্তুকে হারাতে হলেও তা থেকে পিছিয়ে যাওয়া যাবে না। এ মহান আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য সামনে রেখেই মুসলিম উম্মাহর মাঝে কোরবানির প্রচলন হয়। কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসা প্রভৃতি খোদাপ্রেম-বিরোধী রিপুগুলোকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ ও দমন করার শিক্ষা রয়েছে এ কোরবানিতে। প্রতিবছর ঈদুল আজহা মুসলিম জাহানে এসে মুসলমান জাতির ঈমানি দুর্বলতা, চারিত্রিক কলুষতা দূর করে ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমায় তাদের ঈমানি শক্তিকে বলীয়ান, নিখুঁত ও মজবুত করে। মুসলমানরা এ কোরবানির মাধ্যমে সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দীক্ষা নেন, সমাজের বুক থেকে অসত্য, অন্যায়, দুর্নীতি ও অশান্তি দূর করার জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার প্রেরণা লাভ করেন।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানির নিয়ম করেছি, যাতে আমি তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি, সেগুলো জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত-৩৪)

ইমাম সাহেব তার খুতবায় জাতীয় কবি নজরুলকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কোরবানি হত্যা নয়, সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’ সুতরাং, মানুষের মনের মধ্যে যে পশুশক্তি সুপ্ত বা জাগ্রত অবস্থায় বিরাজমান, তা অবশ্যই কোরবান করতে হবে। কেননা, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা, পশু কোরবানি হচ্ছে আত্মকোরবানির প্রতীক। তাই কোরবানি করার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে ঈদুল আজহায় কোরবানি নিখুঁতভাবে আদায় করতে যত্নবান হওয়া উচিত।

ঈদের জামায়াতের পরে সমবেত বাংলাদেশিরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময় করেন। নিজ নিজ বাসা থেকে রান্না করে আনা বাংলাদেশি পিঠা-পায়েস, মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার সবার সঙ্গে ভাগ করে খান। আত্মীয়-স্বজনহীন দূর-পরবাসে কিছু সময়ের জন্য হলেও স্থানটি হয়ে উঠে একটি ছোট একখন্ড বাংলাদেশ। তবে জার্মানিতে ঈদের দিন সরকারী ছুটি না থাকায় নামাজ আদায় করেই অনেককেই কাজে ছুটতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য যে প্রকাশ্যে কুরবানীর অনুমতি না থকলেও সামর্থ্যবান মুসলমানগণ বিভিন্ন স্লটারহাউজে কুরবানীর পশুর জন্য ন্যায্যমূল্য পরিশোধ করে নাম-ঠিকানা প্রদান করলে কুরবানীর এক বা দু’দিন পরে নিজ নিজ ঠিকানায় কুরবানীর গোশত পৌছে দেয়া হয়।