হিংসে নয় ঘৃণা করি

তুষার আবদুল্লাহ

সুপার শপে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কতো প্রয়োজন আর অপ্রয়োজনের সমাহার। কতো পণ্যের স্বাদ না নিয়েই যে এই বয়সে পৌঁছে গেলাম। পনের আনা পণ্যের নামই জানিনা। চেখে দেখার নাকি অন্য কাজের বুঝে উঠতে পারিনা। চোখ ঝলসে যায় কোন কোনটির দিকে তাকিয়ে।

যেমন চোখ ঝলসে দেয় পুরনো কোন মুখ। স্মৃতিতে মলিন হয়ে সংরক্ষিত মুখটির ঝলমল রূপ পুড়িয়ে দিয়ে যায়। চিনতে পারেনা এই সময়ের মলিন মুখটিকে। অবাক হই আমি যা যা চিনে উঠতে পারিনি তিনি তার কাছে সেসব একেবারেই জানাশোনা। নির্দ্ধিধায় তুলে নিচ্ছেন। মুখটি আমার কাছে ধীরে ধীরে অপরিচিত হয়ে উঠতে থাকে। তিনি যে প্রকারের পণ্য কিনছেন, সেই পণ্যের সঙ্গে তার এবং তার পরিবারের অভ্যস্ততা ছিলনা।

‘এখানে একটু ঈর্ষে হতেই পারে তার মতো তাদের মতো কেন আরো ঘাম ঝরাতে পারিনি। কিন্তু যারা অন্ধকারে অসততার হাতে রাখি পড়িয়েছে। মুখোশ পাল্টে পাল্টে বৈভব বাড়িয়েছে। এখন ভোগের আস্ফালনে আত্মহারা, দিকহারা, তাদের ঈর্ষা করার সংকীর্ণতা আমার নেই। আছে ঘৃণা করার উদারতা।’
তিনি দোকানি এবং সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলছেন, তারা যে ভাষায় উত্তর দিচ্ছেন, সেই ভাষা আমাদের নিত্য কথোপকথনের ভাষা নয়। তিনি আয়েশ করে বিলাসী কেনাকাটা শেষ করে প্রাসাদোপম গাড়িতে চড়ে আমার চোখের সীমানা পেরিয়ে গেলেন। তার আভিজাত্য দেখে সত্যি বলছি আমার মোটেও হিংসে হয়নি।

ফোনে হঠাৎ পুরনো কণ্ঠ। বয়স বাড়ে কণ্ঠ পুরাতন হয় না। অপরপ্রান্ত ভেবেছিল চিনতে পারবোনা তাকে। কণ্ঠে আবেগের চেয়ে ক্ষমতার উত্তাপ বেশি। তবে বন্ধুর জন্য সেই উত্তাপে ভাদ্রের পাগলাটে হাওয়াও বয়ে যাচ্ছিল চিকন করে। অপরপ্রান্তকে কলেজবেলায় একটি দলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে দুরন্ত দেখেছি। ভেবেছিলাম সেই দলের নেতা হবার স্বপ্নে ও চঞ্চল।

কতোদূর এগিয়ে ছিল জানা হয়নি। তবে এখন জানলাম দল পাল্টে নিজ গন্ডিতে এখন সে মহানেতা। অবশ্যই ক্ষমতার চলতি দলের হাওয়ার পন্থি হয়েছে। বিত্ত-প্রতিপত্তি তার কণ্ঠ দিয়েই বের হচ্ছে। প্রতিপত্তির প্রসার ঘটাতে কোন একটি দেয়াল সামনে পড়ে গেছে। দেয়াল টপকে দখল নেয়া যাচ্ছে না। গণমাধ্যম সেই দেয়াল। যদি আমার হাত সঙ্গে পায় তবে দেয়াল টপকানো যাবে বলে তার বিশ্বাস ছিল। আমি তার দিক থেকে ঝট করে কানটাই সরিয়ে নিলাম। ওর এই ফেঁপে উঠাকে আমি মোটেও হিংসে করছিনা।

হিংসে করবো কেন? হিংসে করারও সামর্থ্যের প্রয়োজন আছে। সবার সেই যোগ্যতা ও সামর্থ্য হয়ে উঠেনা। হিংসেতো তিনিই করবেন যিনি আফসোসের আগুনে পুড়বেন। মেয়েটাকে, ছেলেটাকে ইংরেজি স্কুলে পড়ানো হলোনা। সন্ধ্যা-মাঝরাতে শহরের আলোকিত বা অন্ধকার নেমে আসা রেস্টুরেন্টে গাল-গপ্পো করা হয় না বন্ধু-পরিজনদের সঙ্গে। ঈদটা এবারও ফেলনা শহরেই কাটিয়ে দিতে হলো। কিংবা অজপাড়া গাঁয়ে।

উড়াল দেয়া গেলোনা আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা ন্যূনতম ব্যাংকক-ভুটানে। এই আফসোস গুলো যার রইবে, তিনিইতো ঐ সীমায় না পৌঁছতে পেরে হিংসের আগুনে পুড়ে যাবেন। সেই আফসোস কোন কালেই ছিলনা। নিজে পারিনা বলে হিংসের আগুনেই শুধু পুড়তে হবে কেন? বাহবাই বা দেবোনা কেনো? আমার আশপাশের কেউ কেউতো সত্যি মেধা ও ঘাম ঝরিয়ে আপন শক্তিতে সামর্থ্যের চূড়ায় পৌঁছেছে। কোন সহজ ও ছোটপথ বেছে নেয়নি।

অন্ধকারের সঙ্গে তারা মিতালী করেনি। এক সময়কার সংযম ও পরিশ্রমের বিনিময়ে কিছুটা এখন ভোগ তাদের বরাতে জুটেছে। সেই ভোগে পরিমিতির ঘাটতি নেই। আছে উপভোগ বা আনন্দের সৌন্দর্য। তাকে তো বাহবা দেবোই। এখানে একটু ঈর্ষে হতেই পারে তার মতো তাদের মতো কেন আরো ঘাম ঝরাতে পারিনি। কিন্তু যারা অন্ধকারে অসততার হাতে রাখি পড়িয়েছে। মুখোশ পাল্টে পাল্টে বৈভব বাড়িয়েছে। এখন ভোগের আস্ফালনে আত্মহারা, দিকহারা, তাদের ঈর্ষা করার সংকীর্ণতা আমার নেই। আছে ঘৃণা করার উদারতা।