বার্তাবাংলা ডেস্ক »

পাকিস্তানে যে সাধারণ নির্বাচন হয় গেল, সেটিকে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ইতিহাসের সবচেয়ে নোংরা ও বিতর্কিত নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছে। বলা হচ্ছে জেনারেল জিয়ার শাসনের পর পাকিস্তানে যে ‘গণতন্ত্র’ চালু হয়েছিল, তার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত করা হয়েছে এই প্রহসনমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।

চার বছর ধরে নীরব অভ্যুত্থান একটু একটু করে এগিয়েছে এবং সেই পুরোনো শক্তি ঘুণপোকার মতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলেছে। সবচেয়ে বেশি জখম হয়েছে গণমাধ্যম। বিচার বিভাগে ‘ডকট্রিন অব নেসিসিটি’র পুনরুত্থানে ন্যায়বিচারের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নওয়াজ শরিফের পিএমএল (এন) দলটিকে ভাঙতে যেভাবে সরকারি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং জয়ের সম্ভাবনায় থাকা পিএমএলের (এন) অনেক নেতাকে যেভাবে ভাগিয়ে এনে ইমরানের পিটিআইয়ে যোগ দেওয়ানো হয়েছে, তা নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুবিধাজনক অবস্থা) তৈরি হতে দেয়নি। নির্বাচন যত কাছাকাছি এসেছে, অন্য দলগুলো তত বেশি নির্বাচন জালিয়াতির পূর্বাভাসের উত্তাপ টের পেয়েছে।

পিএমএল (এন), পিপিপি ও পিকেএমএপি—এই তিনটি দল সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেছে, ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পিটিআইয়ের জয় নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা দরকার তার সবকিছু করেছে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দেওয়ার পরও অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কোনো তদন্তও হয়নি, কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।

পশতুন ও বেলুচ জাতীয়তাবাদীরাও বুঝতে পেরেছেন, তাঁরাও নির্বাচন কারসাজির শিকার হয়েছেন। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে সমানে জাল ভোট ও অনিয়ম হয়েছে। দেশেজুড়ে অগণিত ভোটকেন্দ্র থেকে পিটিআই বাদে অন্য সব দলের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে, নাহয় ভোট গণনার সময় তাঁদের কাছে আসতে দেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ফলাফলের ফরম কর্তৃপক্ষ দেখাতে রাজি হয়নি। নির্বাচনী ফল এক জায়গায় জড়ো করা এবং ফল ঘোষণা করার বিষয়ে অস্বাভাবিক বিলম্ব করা হয়েছে, এ কারণে ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

১৯৭৩ সালের সংবিধানের জন্মের পরপরই সরকার এবং ‘কার্যত সরকারের’ মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা শুরু হয়। তবে জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনের পর থেকে সামরিক বাহিনী লাগামছাড়া হয়ে ওঠে। তখন থেকেই তারা নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের আড়ালে থেকে মূল চালিকা শক্তি নিয়ন্ত্রণ করছে। ১১ বছর সেনাশাসনে থাকার কারণে রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা আশা করেছিলেন, পরপর কয়েকবার নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে বেসামরিক প্রশাসনের ওপর থেকে সামরিক শাসকদের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে কমে আসবে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাশাসকদের খপ্পর থেকে আজও বের হয়ে আসতে পারেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর দুটি কারণে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভিত শক্ত হওয়ার আশা জেগেছিল।

প্রথম কারণ হলো, ২০০৬ সালে রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের সনদে সই করেছিল। সেখানে নেতারা অঙ্গীকার করেছিলেন, তাঁরা সাংবিধানিক সংস্কার আনবেন এবং আইনকানুনের বাইরে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাবেন না। এর ফল হিসেবে নির্বাচনের পর জেনারেল মোশাররফকে অপসারণ করা হলো এবং সংবিধানে অষ্টাদশ সংশোধনী আনা হলো। এরপর প্রথমবারের মতো নির্বাচিত সরকার তার মেয়াদ পূরণ করল।

দ্বিতীয় কারণ হলো, সামরিক একনায়কেরা সংবিধান বিকৃত করে যেসব কালো আইনকানুন ঢুকিয়েছিলেন, অষ্টাদশ সংশোধনীতে তা বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে ৬ নম্বর অনুচ্ছেদকে জোরালো করে প্রাদেশিক শাসকদের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সেনা হস্তক্ষেপের পথকে কঠিন করা হয়।

কিন্তু এখন আমরা দেখলাম এসব কিছুই কাজে এল না। সামরিক মহল বিচার বিভাগের ওপর ভর করল এবং নির্বাচিত নেতাদের ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করিয়ে তাঁদের রাজনীতি থেকে বাইরে রাখা হলো। পুরোনো দলগুলো যখন শিখিয়ে দেওয়া কায়দায় খেলতে চাইল না, তখন আড়ালে থাকা ডিপ স্টেট ‘নতুন’ দল সৃষ্টি করে তাদের দিয়ে খেলানো শুরু করল। এই ডিপ স্টেট এবারের নির্বাচনে কমপক্ষে তিনটি নিষিদ্ধ ইসলামি দলকে মূলধারার দলে ফিরিয়ে এনেছে। নিশ্চিত করেই বলা যায়, এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি ভয়ানক দুঃসংবাদ।

এবারের রাজনৈতিক কারসাজির আরেকটি নতুন দিক হলো পশতুন নেতাদের এবার একেবারে উপড়ে ফেলা হয়েছে। আসফান্দিয়ার ওয়ালি খান, মাহমুদ খান আশাকজাই, আফতাব আহমেদ খান শেরপাও, মওলানা ফজলু রহমান ও সিরাজুল হকের মতো তুমুল জনপ্রিয় নেতাদের ‘হারিয়ে দেওয়া’ হয়েছে।

তবে এমন প্রহসনের নির্বাচনে জিতে ইমরান খানও যে খুব স্বস্তিতে থাকতে পারবেন, তা মনে হয় না। তীব্র দেনায় ডুবে থাকা পাকিস্তানের যে অস্থিরতা চলছে, তা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে যাচ্ছে। এটি সামাল দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন। সেনাবাহিনী যখন মনে করবে তাঁকে দিয়ে আর হচ্ছে না, তখন তাঁকে ঠিকই ছুড়ে ফেলা হবে।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »