বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি

বঙ্গবন্ধু

১৯৭৫ সালে শুধু একজন মানুষ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার-স্বজনদের হত্যার ঘটনাই ঘটেনি, ঘাতক অবৈধ দখলদার ও সামরিক শাসকেরা জাতির আত্মাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। সাম্প্রদায়িকতার ছুরিতে বিদ্ধ হয় জাতির আত্মা। রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এখনো হচ্ছে। কারণ, সাম্প্রদায়িকতার ছুরি জাতির আত্মা থেকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ফেলা হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার কার্যকর করার মধ্য দিয়ে জাতির কলঙ্ক মোছার সংগ্রাম এক ধাপ এগিয়েছে। সংবিধান আবার চার মূলনীতিতে ফেরত গেছে, সামরিক শাসনকে আইনগতভাবে ও সাংবিধানিকভাবে অবৈধ কর্ম বলে চিহ্নিত করা হয়েছে; আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকারীদের বিচার ও সাজার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে জাতির কপাল থেকে কলঙ্ক মোছার সংগ্রাম আরও জোরদার হয়েছে। তবে এখনো আমরা জাতির আত্মায় বিদ্ধ সাম্প্রদায়িকতার ছুরিটা সম্পূর্ণভাবে উপড়ে ফেলতে পারিনি।

এখনো সাম্প্রদায়িকতা ও সামরিক শাসনের সব চিহ্ন মোছা শেষ হয়নি। এখনো সামরিক শাসকদের ‘একটু গণতন্ত্র, একটু ধর্মতন্ত্র, একটু সামরিকতন্ত্র’ মিশ্রণের গোঁজামিল তত্ত্ব রাজনীতির অঙ্গনে বিভ্রান্তির ধূম্রজাল ছড়াচ্ছে। এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে বঙ্গবন্ধুকে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য। এই প্রত্যাবর্তন সহজ ও দ্রুত হবে যদি আমরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোভাবে জানতে পারি, চিনে নিতে পারি—বঙ্গবন্ধু কে?

বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন। বঙ্গবন্ধু একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, একটি দেশ, বাঙালি জাতীয়তার একটি মহাকাব্য, একটি আন্দোলন, জাতি নির্মাণের কারিগর, ঠিকানা প্রদানের সংগ্রাম, একটি বিপ্লব, একটি অভ্যুত্থান, একটি ইতিহাস, বাঙালি জাতির ধ্রুবতারা: জাতির উত্থান–রাজনীতির কবি, জনগণের বন্ধু, রাষ্ট্রের স্থপতি, স্বাধীনতার প্রতীক, ইতিহাসের মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বিবিসি বাংলা বিভাগের জরিপে বঙ্গবন্ধুকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা হয়। কিন্তু আমরা ৭ কোটি বাঙালি ১৯৭০-৭১ সালেই সেই রায় দিয়ে দিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার বন্ধু নন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বিবিসি বঙ্গবন্ধুকে পুনঃ আবিষ্কার করেছে মাত্র।

বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়। এটি একটি বাস্তব কথা।’ বঙ্গবন্ধু সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে উপলব্ধি করেই ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক ভুল শোধরান। যে হিন্দু ও মুসলিম ভারতে আলাদা হয়ে পড়ে, সেই তাদের সবাইকে একত্র করে এক অখণ্ড বাঙালি জাতিকে পরিণত করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। বঙ্গবন্ধু তাই আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক এবং বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু অভিন্ন সত্তা।

১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান সৌদি বাদশাহ ফয়সালের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। আমি জানতে চাই, কেন সৌদি আরব স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি দেয়নি?’ বাদশাহ ফয়সাল বলেন, সৌদি আরবের স্বীকৃতি পেতে হলে বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু জবাব দেন, ‘এই শর্ত বাংলাদেশে প্রযোজ্য হবে না। বাংলাদেশের জনগণের প্রায় অধিকাংশই মুসলিম। আমাদের প্রায় এক কোটি অমুসলিমও রয়েছে। সবাই একসঙ্গে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে বা যুদ্ধের ভোগান্তিতে পড়েছে। তা ছাড়া সর্বশক্তিমান আল্লাহ শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্যই নন। তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা। তা ছাড়া আপনার দেশের নামও তো “ইসলামিক রিপাবলিক অব সৌদি আরব” নয়। আরব বিশ্বের একজন গুণী ও খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ প্রয়াত বাদশাহ ইবনে সৌদের নামে নাম রাখা হয়েছে “কিংডম অব সৌদি আরব”। আমরা কেউই এই নামে আপত্তি করিনি।’

এমনই ছিলেন বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতির পিতা। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই যে দেশের নাম ইসলামি প্রজাতন্ত্র হতে হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই, সংখ্যালঘুদের কথাও মনে রেখেছেন তিনি। ১৯৭২ সালের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতে সৈয়দ মুজতবা আলী ও সন্তোষ কুমার ঘোষ অনেক কথা বলেছিলেন। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেন, উপমহাদেশের এই সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ তার পূর্বাঞ্চলে ধর্মীয় জাতীয়তার ছুরিতে বিভক্ত বাংলার পূর্বাংশে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তার বিকাশ এবং তার ভিত্তিতে মুজিব নেতৃত্বের অভ্যুদয় দক্ষিণ এশিয়ায় এ সময়ের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।

সন্তোষ কুমার ঘোষ বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজমকে তিনি কী চোখে দেখেন। এই জাতীয়তাকে কি তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সম্পূরক, না বিরোধী বলে ভাবেন? বঙ্গবন্ধু জবাব দিয়েছিলেন, ‘সেক্যুলার ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিপূরক। যেমন ইউরোপের প্রতিটি দেশের মানুষ নিজেদের ইউরোপিয়ান মহাজাতির অন্তর্ভুক্ত বলে ভাবেন। আবার তাদের স্বতন্ত্র জাতীয়তা আছে এবং এই জাতিরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিজ নিজ স্বার্থে যুদ্ধবিগ্রহও হয়। সন্ধি ও শান্তিচুক্তিও হয়। সহযোগিতাও থাকে।’

সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, ‘শেখ সাহেব, আপনার কথা শুনে মনে হয় আপনি বর্তমান ভারতীয় জাতীয়তাকে পুরোপুরি সেক্যুলার মনে করেন না।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘না, তা মনে করি না। গান্ধী, জিন্নাহ দুজনই “মডার্ন লিডার” ছিলেন। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি সেক্যুলার ছিল না। নেহরু চেষ্টা করেছিলেন “সেক্যুলার ইন্ডিয়া” গড়তে। পুরোপুরি সফল হননি। গান্ধী-জিন্নাহর রাজনীতির দ্বারা উপমহাদেশ এখনো প্রভাবিত। আমরা বাঙালিরা চাচ্ছি সেই বৃত্ত ভাঙতে। পারব কি না, জানি না।’

সৈয়দ মুজতবা আলী আরও বলেছিলেন, ‘আপনাদের বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তি কি কেবল ভূগোল আর ভাষা?’ বঙ্গবন্ধু মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘না, কেবল ভূগোল বা ভাষা হলে তো আপনাদের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও বিহার-উড়িষ্যার অংশবিশেষ দাবি করতাম। সে দাবি আমি করছি না। আমাদের বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তি বাংলার সকল ধর্মের সকল বর্ণের মানুষের হাজার বছরের মিলিত সভ্যতা ও সংস্কৃতি। তাতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও উপজাতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির যেমন ছাপ আছে, তেমনি আছে মুসলমানদের সভ্যতা-সংস্কৃতির মিশ্রণ। বর্তমানের ভারত একটি “পলিটিক্যাল ইউনিয়ন”। আর আমরা একটি “কালচারাল নেশন”। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের পরিচয় বাঙালি। বহুকাল আমাদের একটি নেশন স্টেট ছিল না। সেটি এখন পেয়েছি। সেটি যদি তার সেক্যুলার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে আমরা টিকিয়ে রাখতে পারি, তাহলে বাঙালি জাতি বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিশ্বে একটি আধুনিক জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাবেই।’

১৯৬৯ সালের ৬ ডিসেম্বর তিন নেতার মাজার প্রাঙ্গণে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন, ‘আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম “পূর্ব পাকিস্তান” না, শুধুমাত্র “বাংলাদেশ”।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিজাতি তত্ত্বকে ত্যাগ করার আহ্বান জানালেন। ৬ দফার ভিত্তিতে স্বশাসনের পক্ষে দাঁড়াতে ঘোষণা দিলেন; সামরিক স্বৈরতন্ত্র হটানোর কথা বললেন; গণতন্ত্রের ওপর দাঁড়াতে বললেন। গণসংগ্রাম-নির্বাচন-সশস্ত্র যুদ্ধ—এই তিনের অপূর্ব সমন্বয় করলেন। নির্বাচনকে গণরায়ে রূপান্তর করলেন। অসহযোগ আন্দোলনের নামে স্বশাসিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন। নিরস্ত্র জনগণের সশস্ত্র সংগ্রামের মানস গঠনের রাজনীতি উপহার দিলেন।

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান।’ বাংলাদেশের জনগণকে তিন ধাপে তাঁদের পরিচয় সাজাতে বললেন, আগে মানবতা, তারপর জাতিসত্তা, তারপর ধর্ম। এটাই হলো বঙ্গবন্ধু রচিত বাঙালির বাংলাদেশ উত্থানের, প্রতিষ্ঠার, স্বশাসনের স্বাধীনতার মহাকাব্য। সবাই বাঙালি হয়ে গেল। সাম্প্রদায়িকতার দ্বিজাতিতত্ত্বের আলখাল্লা ফেলে দিল।

পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন তাই বঙ্গবন্ধুর এই বিরল কৃতিত্ব কবিতায় প্রকাশ করলেন:

‘শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী জীবন করিয়া দান,

মিলাতে পারেনি প্রেম–বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান।

তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর

জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।’

জাতির পিতার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বও ছিল বিস্ময়কর। নাইজেরিয়ার জেনারেল ইয়াকুব গাওয়ান যখন বললেন, অবিভক্ত পাকিস্তান একটি শক্তিশালী দেশ, কেন আপনি দেশটাকে ভেঙে দিতে গেলেন। উত্তরে শেখ মুজিব বললেন, ‘শুনুন মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনার কথাই হয়তো ঠিক। অবিভক্ত পাকিস্তান হয়তো শক্তিশালী ছিল। তার চেয়েও শক্তিশালী হয়তো হতো অবিভক্ত ভারত। কিন্তু সেসবের চেয়েও শক্তিশালী হতো সংঘবদ্ধ এশিয়া, আর মহা শক্তিশালী হতো এক জোট এই বিশ্বটি। কিন্তু মহামান্য রাষ্ট্রপতি, সবকিছু চাইলেই কি পাওয়া যায়।’

১৯৭৩ সালে রাজশাহীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ প্রশ্ন করেন ফরাসি লেখক বিপ্লবী মার্লোকে। অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ বলেন, ‘মুজিব পারবেন তো একটি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করতে?’ মার্লো বলেন, ‘অবশ্যই, যদি না আপনারা শিক্ষিতরা, বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে মেরে ফেলেন।’

মুজিবের বিশ্বাস ছিল বাঙালিদের ওপর। ভরসা ছিল। তাই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী হয়েও দিশেহারা হননি। বাঙালিরা লড়ে স্বাধীনতা আনবেই। বাঙালিরা তাঁকে মারতেই পারে না। বিশ্বাস করে তাই তিনি নিরাপত্তাহীনভাবে থাকতেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে। আগস্টের এই শোকাবহ মাসে কাঁদো, প্রিয় দেশ। কাঁদো মুক্তিদাতা মুজিবের জন্য। তাঁর সেই পরিচয়টাই ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। কাঁদো, কাঁদো, প্রিয় দেশ।

কিন্তু এখনো দেশ কলঙ্কমুক্ত নয়। এখনো সাম্প্রদায়িকতার ছুরিকাবিদ্ধ জাতির আত্মার রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এখনো বৈষম্যের বিশাল পাহাড়ের তলে সাধারণ মানুষেরা, গরিবেরা চাপা পড়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি, যুদ্ধ এখনো চলছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বুকে নিয়ে, শেখ হাসিনার হাত ধরে, আমরা লড়ে যাব মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত।