সিলেট বাঘের পিঠে জামায়াত

সিলেটের

ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত এবং দলের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হওয়ার ঘটনায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সিলেটে বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছে। সন্দেহ নেই, সিলেটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের যে একটি অলিখিত ও অস্বীকৃত বন্ধন তৈরি হচ্ছে, তার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে। এটা লক্ষণীয় যে জামায়াত ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য পুণ্যভূমি সিলেটকেই বেছে নিয়েছে।

জামায়াতের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এই প্রতিবেদককে বলেছিল, সিলেটে রুকন (সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মী ) প্রায় ৬০০ ও সক্রিয় কর্মী ৩ হাজার ৪০০। কর্মী প্রায় ৬ হাজার। তঁাদের পরিবারসহ ভোটার দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার। সম্প্রতি সিলেট সফরে এসে বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, জামায়াত ১০ হাজারের বেশি ভোট পাবে না। জামায়াতের সমর্থকেরা এতে কষ্ট পেয়েছেন। ওই সূত্রটির দাবি, তিনি কয়েক দিন আগে জামায়াতের প্রার্থী ও সিলেট মহানগরের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে বলেছেন, কোনোভাবেই তিনি ৪০ হাজারের বেশি ভোট আশা করতে পারেন না। শেষ মুহূর্তে অবশ্য জামায়াতের ভেতরের, বিশেষ করে তার নীরব সমর্থকদের মধ্যে নৌকা ঠেকাও মনোভাব জেগে উঠতে পারে।

সিলেটের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গতকাল শুক্রবার বলেছেন, ‘আপনি তো আসল খবরটিই লিখছেন না।’ তাঁর কথায় আসল খবরটি হলো জামায়াতের প্রার্থী এখন সরে দাঁড়ালে তাঁকে চরম মূল্য দিতে হবে। প্রথমত, তাঁকে পুনরায় লোকচক্ষুর আড়ালের জীবন বেছে নিতে হতে পারে। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে জুবায়ের টেলিফোনে বলেছিলেন, তাঁকে দীর্ঘকাল পালিয়ে থাকতে হয়েছে। হলফনামা অনুযায়ী তিনি ২০১২ থেকে ২০১৪ সালে দায়ের করা ৩৪টি মামলার আসামি। এসবের বিচার চলছে। তবে ৯টি মামলা থেকে খালাস পাওয়ার ঘটনাও লক্ষণীয়। ২০১৬ সালের জুনে দুটি মামলায় এবং ২০১৭ সালের ২০ জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে জুবায়ের ৭টির বেশি মামলা থেকে খালাস পান। জামায়াতের এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ষোলো আনা কৌশলগত।

জামায়াত বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ায় সিলেট আওয়ামী লীগ জামায়াতের প্রতি খুশি। তারা দুটি তাৎক্ষণিক লাভকে বড় করে দেখছে। প্রথমত, সিলেট শহরে এই সেদিনও একসঙ্গে পাঁচজন জামায়াতের নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে চলাচল করতে পারেননি। এখন তাঁরা বৃহত্তর সিলেট থেকে প্রচারের নামে শোডাউন করেছেন। এর নিরাপত্তায় সতর্ক থেকেছে পুলিশ। দ্বিতীয়ত, দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মুরব্বিদের কাছে হৃত ‘গৌরব’ পুনরুদ্ধার করা। তাদের দেখানো যে ফিনিক্স পাখির মতো তারাও ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। জামায়াত বলছে, এটা তাদের অস্তিত্বের লড়াই। তাই ঝুঁকি নিয়েছে। তাদের হিসাব হলো আগের চেয়ে বেশি কাউন্সিলর পার্থী জিততে পারেন। বিসিক শিল্পনগরীতে জামায়াতের এক রুকন দুবার কাউন্সিলর হয়েছেন। এবার জামায়াতের সমর্থিত প্রার্থী প্রায় এক ডজন। ২৬ জুলাই দাড়িয়াপাড়ায় গিয়ে সংখ্যালঘুদের কাছে জানতে চাই, আপনাদের এলাকায় প্রায় ৫০ ভাগ সংখ্যালঘু ভোটার হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে গত নির্বাচনে জামায়াতের লোক জয় পেলেন। তাঁরা বললেন, ‘তিনি দাবি করেছিলেন, জামায়াত করেন না। এবার আমরা তাঁকে জুবায়েরকে সঙ্গে নিয়ে ভোট চাইতে আসতে দেখেছি। এবার আর জিতবেন না।’এবার আওয়ামী লীগের সমর্থিত একজন সংখ্যালঘু দাঁড়িয়েছেন। আগের নির্বাচনে সংখ্যালঘু প্রার্থী ছিলেন দুজন।

দুই প্রধান মেয়র প্রার্থী বিপরীত কারণে জামায়াত সম্পর্কে নিস্পৃহ প্রতিক্রিয়া দেখান। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে বলি, জামায়াতের মেয়র প্রার্থী এখন হঠাৎ বসে গেলে আপনারা জামায়াত কাউন্সিলরদের জিততে দেবেন না? তিনি হেসে কথাটি উড়িয়ে দিলেন। বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হকের কাছে শেষ মুহূর্তে জামায়াতের মেয়র প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘তাদের ভোট কত সেটা তাদের যাচাই করতে দিন।’

আসলে যাঁরা বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার কথা বলছেন, তাঁরা এ দিকটির ওপরই জোর দিচ্ছেন। সিলেটের সদর আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগবান্ধব নয়। সুতরাং ভোট অবাধ ও সুষ্ঠু হলে ভোটের ফল কোন দিকে গড়াবে তা হলফ করে বলা কঠিন। তবে যাঁরা জামায়াতের কট্টর সমর্থক নন, তাঁরা মনে করতেই পারেন যে জামায়াতকে ভোট দেওয়া মানে নৌকায় দেওয়া। আর যদি তখন জুবায়েরের ভোটের প্রাপ্তি যথেষ্ট কম হয় (১০ হাজারের নিচে), তাহলে জামায়াতের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে না কমবে, সেটাও প্রশ্ন।

বিএনপির উচ্চপর্যায়ে যখন ধারণা দেওয়া হলো যে জামায়াত দর-কষাকষি করতে চাইছে। ঢাকার একটি সংসদীয় আসন ছেড়ে দিলে তারা সিলেটে সরে দাঁড়াবে, তখন বিএনপি ভাবলেশহীন থেকেছে বলেই জানি। বরং বিএনপির একজন উচ্চপর্যায়ের নেতার কথায় ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, খালেদা জিয়া জামায়াতকে খুব বেশি আর গুরুত্ব দিতে আগ্রহী নন।

তবে সিলেটে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী যে অন্তত পাঁচ হাজার হলেও বিএনপির ভোট কাটতে পারে, সেটা বিএনপির জন্য কম দুশ্চিন্তার কারণ নয়।

সার্বিক বিচারে একটি অগ্রগতি এই হতে পারে যে জামায়াত কার্যকরভাবে দুই বড় দলের আশীর্বাদের বাইরে চলে এলে নতুন প্রজন্মের জামায়াত হয়তো পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে সচেষ্ট হবে।