মোস্তফা ইমরান সোহেল »

ধরুন কোনো একজন সাংবাদিক গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ করলো, অন্য সাংবাদিকরা কি তার পক্ষে সাফাই গাইবে? ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে দুয়েকজন হয়তো পক্ষ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে সহায়তা করবে। তা করতেই পারে। কিন্তু তার পক্ষে সাংবাদিক সংগঠনগুলো কখনোই একাট্টা হবে না। পক্ষান্তরে অপরাধী সাংবাদিকের বিষয়ে কোনো ভুল পেলে তা নিয়ে রীতিমত প্রতিবেদন লিখে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহযোগিতা করবে। অপরাধ প্রমাণ হলে সংঠনের সদস্যপদ বাতিলের পাশাপাশি চাকুরিও হারাবে।

শুধু সাংবাদিক নয়, পুলিশের অপরাধে পুলিশই পুলিশকে গ্রেপ্তার করে। আইনজীবীর অপরাধ প্রমাণ হলে বার-কাউন্সিল সনদ বাতিল করে। প্রকৌশলীর অবেহেলার কারণে ভবন ধ্বসে গেলে তার পক্ষে প্রকৌশলীর সংগঠন কথা বলে না। শিক্ষক-সমাজের কেউ অপরাধী হলে তাকে বাঁচাতেও শিক্ষক সংগঠন মাঠে নামে না।

কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিকিৎসক-সমাজ ব্যতিক্রম মনে হচ্ছে। অবহেলা ও গাফিলতির কারণে আমাদের শিশুকন্যা রাইফার অকাল মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ড. ফয়সাল ইকবাল সাহেবসহ আরও কয়েকজন নেতৃস্থানীয় চিকিৎসক নেতা যেভাবে দুর্বৃত্তসুলভ আচরণ করলেন তা অশোভনীয়। রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় সাংবাদিক-সমাজ পুরো চিকিৎসক সমাজকে দোষারোপ করে নি, করবেও না। শুধু রাইফার হত্যাকারীদের শনাক্ত করে শাস্তিদাবি করেছিলো। তাতেই ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়ে সাংবাদিক পরিবারের চিকিৎসা দেবে না বলে আস্ফালন করেছেন। এভাবে বিশেষ গোষ্ঠীকে চিকিৎসা না দেওয়ার হুমকি ডাক্তারদের প্রফেশনাল এটিকেট-পরিপন্থী।

দায়িত্বে থাকা কোনো ডাক্তার কখনোই রোগীকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করতে পারে না, এমনকি রোগী যদি সিরিয়াল কিলারও হয়। চিকিৎসা দেওয়ার সময় চিকিৎসক রোগীর উপর শর্তারোপও করতে পারে না। যেমন : সিরিয়াল কিলারকে “যদি তুমি আর খুন না করো, তবে আমি তোমার চিকিৎসা করবো” এমন শর্ত দিতে পারে না।  ডা. ফয়সাল সাহেব সাংবাদিকদের ও সাংবাদিক পরিবারের চিকিৎসা বন্ধের যে হুমকি দিয়েছেন, এরূপ হুমকি সভ্য দেশের কোনো চিকিৎসক নেতার মুখ থেকে বের হলে সেদেশের অন্য চিকিৎসকরাই তার প্রতিবাদ করতো। এমনকি সনদ বাতিলেরও দাবি জানাতো।

মোস্তফা ইমরান সোহেল

ডা. ফয়সাল সাহেবরা যা করেছেন তা কতিপয় দোষীর পক্ষ নিয়ে পুরো চিকিৎসক সমাজকে সাধারণের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফায়দা লুটতে চেয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের দেশের সাধারণ চিকিৎসকরা এদের হাতেই জিম্মি।
এদেশে অসংখ্য সুচিকিৎসক রয়েছেন। আমার বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতদের মধ্যেও আমি অনেক অনেক সুচিকিৎসক দেখেছি। এমন চিকিৎসকও রয়েছেন যাঁদের আমার ‘ঈশ্বর’ মনে হয়। সম্প্রতি আমার বাবাকে অস্ত্রোপচারকারী ভাস্কুলার সার্জন জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. নির্মল কান্তি দে, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. ফারুক আহমেদ, চমেক হাসপাতালের প্রফেসর অর্থোপেডিক সার্জন ডা. সালাউদ্দিন আহমেদ, প্র‍য়াত অর্থোপেডিক সার্জন ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনসহ আরও কয়েকজন। অপরদিকে হাতেগোণা মাত্র দু’তিনজন চিকিৎসককে চিনি, যাঁরা প্রফেশনাল এটিকেটের থোড়াই তোয়াক্কা করেন। এটা আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির পরিসংখ্যান। অন্যকারো ক্ষেত্রে হয়তো ঈশ্বরের সংখ্যা বেশি হতে পারে। কারও তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ডেভিলের পাল্লা ভারী হতে পারে।

একজন সিনিয়র মহিলা কার্ডিওলজিস্টকে চিনি, যিনি মেডিকেল/সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভের কাছ থেকে কোনোরূপ উপঢৌকন গ্রহণ করা তো দূরে থাক, চেম্বারের ধারে-কাছেও ঘেঁষতে দেন না। ডায়াগনোস্টিক সেন্টার থেকে পার্সেন্টেজ নেওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না। আমি যতদূর জানি এরকম বহু চিকিৎসক কতিপয় দুর্বৃত্ত চিকিৎসকের হাতে জিম্মি।

নানা সময় নানা আলাপে জেনেছি সৎ চিকিৎসকরা এ ধারার পরিবর্তন চাইলেও গুটিকতেকের ভয়ে তটস্থ থাকেন। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেদলের মুষ্টিমেয় কয়েক দুর্বৃত্তের হাতে বাকিরা থাকে জিম্মি। এমনকি অন্যান্য দলের এরকম দুর্বৃত্তের সাথে থাকে তাদের সখ্য, অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট। ফলে দুর্বৃত্তরাই সংগঠন নিয়ন্রণ করে। সেখানে অন্যান্য পেশাজীবীদের নির্বাচনের মত সুষ্ঠু নির্বাচনও হতে পারে না। ভোটের সময় প্রতিপক্ষদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয় এমনকি প্রতিপক্ষ যদি নিজের দলের অনুসারীও হয়! আড়ালে সাধারণ চিকিৎসকরা এর সমালোচনা করলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে ভয় পায়।

যতদিন এ ধারার পরিবর্তন না হবে, পেশাজীবীর নির্বাচন পেশাজীবীর মতো সৌহার্দপূর্ণ না হবে ততদিন রাইফাদের হত্যাকারীদের আড়াল করার অপচেষ্টা চালাবে ফয়সাল সাহেবদের মতো দুর্বৃত্তরা। চিকিৎসকদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব যতদিন সুচিকিৎসকের হাতে যাবে না ততদিন সিংহভাগ চিকিৎসক রোগীর চোখে ঈশ্বর হয়ে ওঠবে না। আর পরিবর্তনের জন্য বাইরের চাপেও কিছু হবে না। সচেতন, দক্ষ মেধাবী সাধারণ চিকিৎসকরা যতদিন ভয়ে মুখ বন্ধ রাখবে ততদিন এরকম দুর্বৃত্তদের হাতে কেবল রোগী নয় তাঁরা নিজেরাও জিম্মি থাকবেন। তাঁদেরকে অযাচিত অবাঞ্ছিত পোস্টিং দিয়ে হয়রানি করা হবে। তাই পরিবর্তনটা তাঁদের মধ্য থেকেই আসতে হবে। আমরা সাধারণ মানুষ চেয়ে আছি চিকিৎসকদের থেকেই রাইফার হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি উঠুক। একইসাথে দায়ীদের বাঁচানোর জন্য যে কয়জন চিকিৎসক দুর্বৃত্তের মত আচরণ করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠুক চিকিৎসক-সমাজ।

সবশেষে দেশের সকল চিকিৎসকের প্রতি বলি, প্রত্যেকে নিজগুণে “ঈশ্বর” হয়ে উঠুন রোগীর চোখে।

মোস্তফা ইমরান সোহেল : সাংবাদিক ও আইনজীবী

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »