বার্তাবাংলা ডেস্ক »

নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের কারণে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনী খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন ওই এলাকার প্রার্থীরা। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা বলেছেন, নির্বাচনের সময় পরিবর্তনের কারণে নির্বাচন কমিশন থেকে বেঁধে দেওয়া খরচের চেয়ে প্রার্থীদের খরচ অনেক গুণ বেড়ে যাবে।

প্রার্থীরা বলছেন, নির্বাচনী খরচ বাড়ানো না হলে পরবর্তী সময়ে কমিশনে প্রার্থীদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়া কঠিন হবে। অবশ্য নির্বাচন কমিশন বলছে, প্রার্থীদের সর্বোচ্চ খরচের পরিমাণ বাড়ানো হবে না।

১৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোট গ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু হাইকোর্টের আদেশে প্রথমে ভোট আটকে যাওয়া এবং পরে আপিল বিভাগ সেটি প্রত্যাহার করে নেয়। নতুন করে আগামী ২৬ জুন এ ভোট হওয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে। প্রার্থীরা প্রচারের সুযোগ পাবেন ১৮ জুন থেকে। এর আগে কোনো প্রার্থী নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন না।

গাজীপুর নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয় করতে পারবেন ৩০ লাখ ও কাউন্সিলররা এলাকা ও ভোটারের পার্থক্য অনুসারে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়া মেয়র ও কাউন্সিল প্রার্থীরা বলছেন, এই নির্বাচনে তাদের দুবার পোস্টার লাগাতে হচ্ছে। প্রথমবার লাগানো পোস্টার ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে খরচ অনেক বাড়বে। এরপর নির্বাচন দেরিতে হওয়ায় প্রার্থীদের প্রতিদিনই কিছু না কিছু খরচ করতে হবে। প্রায় দেড় মাসের অতিরিক্ত এই খরচ তাদের চালিয়ে যেতে হবে। এরপর রোজা, জাকাত ও ঈদের সময় প্রত্যেক প্রার্থীরই অনেক টাকা ব্যয় করতে হবে। তাঁরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া যায় না। নির্বাচন কমিশন যদিও বলছে প্রার্থীরা ১৮ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত প্রচার চালাবেন, কিন্তু বাস্তবে সেটা সম্ভব না। এখন কোনো না কোনোভাবে প্রার্থীদের প্রতিদিনই নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে হচ্ছে। ফলে ব্যয় বাড়ছে।

সিটি নির্বাচনের বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে আমার এক দফা খরচ হয়ে গেছে। নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন হওয়ায় আবার নতুন করে হিসাব করতে হবে। অনেক নেতা-কর্মী মাঠে কাজ করছেন। তাঁদের খরচ দিতে হয়, প্রচারের জন্য পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন বানাতে হয়েছে। সব মিলে একটা নির্বাচনের জন্য যতটা খরচ করা দরকার, তা করা হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগের সময়ে এসে নির্বাচন বাতিল হবে, সেটি ভাবতে পারিনি। এখন নতুন দিন ধার্য হওয়ায় সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। এতে নির্বাচনের খরচ আরও কয়েক গুণ বাড়বে।’

একই কথা বললেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমও। তিনি  বলেন, ‘আগে নির্বাচনের যে দিন ধার্য ছিল, তা থেকে এখনকার নির্বাচনের তারিখ ১ মাস ১০ দিন বেশি। এই পুরোটা সময় মাঠে নতুন করে সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এই দীর্ঘ সময় আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে গেল। এ ছাড়া এতে খরচ অনেক বেড়ে যাবে।’

প্রার্থীরা বলছেন, এখন বর্ষাকাল হওয়ায় পোস্টার বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যদিও কিছু কিছু এলাকায় প্লাস্টিকের পলিব্যাগ মোড়ানো পোস্টার লাগিয়েছেন প্রার্থীরা তারপরও কালবৈশাখীতে এগুলো প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিপক্ষের সমর্থকেরা কিছু পোস্টার বা ব্যানার নষ্ট করে ফেলেন। সব মিলে ১৫ মে লক্ষ্য ধরে যে নির্বাচনের দিনক্ষণ গুনছিলেন, তা আবার শুরু করতে হবে। নতুন করে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন লাগাতে হবে প্রার্থীদের। এসব কাজে খরচ আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই প্রার্থীরা তাঁদের প্রচারণা শুরু করেছিলেন। পরে অবশ্য নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিলে অনেকে প্রচারণা কমান। কিন্তু সম্প্রতি নির্বাচনের নতুন দিন ঘোষণার আগে প্রচারণা বন্ধ থাকার কথা বলা হলেও প্রার্থীরা মাঠ ছাড়েননি। তাঁরা তাঁদের প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। কয়েকজন প্রার্থী  বলেন, নির্বাচনের নতুন দিন ধার্য হয়েছে ঈদের পর। এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে। ঈদের আগে নির্বাচনের প্রার্থীদের নানা ধরনের কার্যক্রম দেখাতে হবে। যেমন এ সময় ঈদের আগে জাকাতের বিষয়টি ভাবতে হবে। অনেক প্রার্থীই জাকাত দেবেন। দুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে খাবার বিতরণ করবেন। এতে নির্বাচনের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এ ছাড়া নির্বাচনের মাঠে আছেন যে তার জানান দিতে ঈদের শুভেচ্ছাসংবলিত ব্যানার বা পোস্টার ছাপাতে হবে। এসব করতে আলাদা খরচ করতে হবে প্রার্থীদের।

গাজীপুর তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. শাইজ উদ্দিন। ১৫ মে নির্বাচন সামনে রেখে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় পোস্টার, ব্যানার লাগিয়েছিলেন। এখন নতুন করে নির্বাচনের দিন ধার্য করায় তাঁকে আবার নতুন করে প্রচারণার জন্য খরচ করতে হবে। শাইজ উদ্দিন বলেন, ‘আগে যেসব পোস্টার লাগিয়েছিলাম, তার অনেকগুলোই নষ্ট হয়েছে। ব্যানার বা ফেস্টুনেরও একই অবস্থা। সব নতুন করে শুরু করতে হবে। এতে নির্বাচনের খরচ কয়েক গুণ বাড়বে। এটা আমাদের জন্য কষ্টকর। আবার প্রচারকাজে ব্যয় না করলেও মানুষ মনে করবে নির্বাচন থেকে সরে গেছি। তখন জনসমর্থন কমে যাবে।’

আরেকজন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. হুমায়ুন কবির খান। তিনি কোনাবাড়ী এলাকা থেকে নির্বাচন করছেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন আমাদের নির্বাচনী খরচ দুই লাখ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু এটা তো আগের হিসাব। এখন তো নির্বাচনের দিন পরিবর্তন হয়েছে। এখন আবার আমাদের নতুন করে প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে নতুন করে গণসংযোগ করতে হবে। এতে আমার মনে হয় নির্বাচনের খরচ আগের থেকে চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যাবে।’ এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণের অনুরোধ জানান তিনি।

জয়দেবপুর বাজার এলাকার ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল করিম বলেন, ১একটা নির্বাচন করতে অনেক খরচ হয়। আমি ১৫ মে নির্বাচনের জন্য যে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, তার থেকে বেশি প্রস্তুতি নিতে হবে এখন। কেননা, মাঠে থাকতে গেলে ছোট্ট-বড় অনেক খরচ করতে হয়। এতে নির্বাচনের খরচ আগের থেকে অনেক বাড়বে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডল  বলেন, নির্বাচনের তারিখ পুনর্নির্ধারণ হলেও খরচের অঙ্ক বাড়ছে না। প্রার্থীদের অতিরিক্ত সময় নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়া হবে। তাই নির্বাচনের খরচ বৃদ্ধির প্রশ্নই আসে না। তিনি বলেন, প্রার্থীরা প্রচারের সুযোগ পাবেন ১৮ জুন থেকে। এর আগে কোনো প্রার্থী নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন না।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »