যে কারণে বিশ্বে নারীর অবস্থান শক্ত হচ্ছে

নারী

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হলো বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিদ্যমান মতাদর্শগত ভিন্নতাকে ধারণ করা। সর্বপ্রথম ইউনেস্কো ২০০১ সালে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের চালিকা শক্তি হিসেবে বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাতিসংঘ ২০০২ সালে সংলাপ ও উন্নয়নের জন্য এই দিবসটি পালনের ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে প্রতিবছর ২১ মে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

বিশ্বে যত সংঘর্ষ, ঘাত-প্রতিঘাত সংঘটিত হয় তার বেশির ভাগই সাংস্কৃতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করে। তাই বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়নে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসন করে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিশ্বের সংকটাপন্ন পরিস্থিতি মোকাবেলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকা শক্তি নয়। সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক উন্নয়নেও এর অবদান অনেক। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যকার বিভেদ কমিয়ে সব সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সেভেন কালচার কনভেনশনে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা হয়। বলা হয়- ‘সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এমন একটি অনিবার্য সম্পদ যা দারিদ্র বিমোচন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অনিবার্য হাতিয়ার।’ সুতরাং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে বিশ্বের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর সংস্কৃতি পরিবর্তন ও নারীর উন্নয়ন কতটা জরুরি তা ভেবে দেখার বিষয়। কারণ নারী সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অনেকটা জায়গাজুড়ে রয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশিরভাগ সংস্কৃতিতে নারী পুরুষের প্রভেদ ভয়ংকরভাবে লক্ষণীয়। যার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষা, কর্ম ও উন্নয়নে নারীরা পিছিয়ে পড়েছে। এর মূল কারণ বিভিন্ন সমাজের বিদ্যমান সংস্কৃতি, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় অনুভূতি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পুরুষকে দিয়েছে সব ক্ষমতা অন্যদিকে নারীকে করে রেখেছে গৃহমুখী। কিন্তু বিশ্বের উন্নয়নে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই সংস্কৃতির পরিবর্তন খুবই জরুরি। কেননা সমাজে উন্নতির মূলে যেমন পুরুষের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে ঠিক একইভাবে নারীরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর উন্নয়নে শুধু একটি সমাজ, সংস্কৃতি বা জাতির উন্নয়ন নয়। বরং সমগ্র বিশ্বের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর ইতিবাচক ভূমিকা ও প্রগতিশীল ভাবমূর্তি তুলে ধরে নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথকে সুগম করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন- সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনা, সম-অধিকার, সুযোগ, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তবেই নারী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিটি সমাজে নারীকে বোঝা হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। যার ফলস্বরূপ কন্যাশিশুকে জ্যান্ত মাটি চাপা দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটে থাকত। এর কারণ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা নারী বঞ্চনার সংস্কৃতি, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকেই প্রধানত দায়ী করা যায়। বেশিরভাগ সমাজ পুরুষ শাসিত ও পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ধারণ করায় নারীরা পারিবারিকভাবেই অবহেলিত, বঞ্চিত এবং অধীনস্থ।

প্রতিটি সামজে সংস্কৃতির ধারা অনুসারেই নারী বঞ্চনার প্রথা চলে আসছে। যেমন- একটি কন্যাশিশু জন্মগ্রহণ করে, সে তার পরিবার ও পরিস্থিতির চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়। যেখানে সে পুরুষ দেখে সবল, শক্তিশালী, সিদ্ধান্ত প্রণেতা ও সব কর্তৃত্বের অধিকারী হিসেবে। অন্যদিকে নারীকে দেখে দুর্বল, গৃহমুখী ও অধীনস্থ অবস্থানে। তাকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া হয় না। ফলে নিজের অজান্তেই- নারীমাত্রই কারো অধীনস্থ এবং অবহেলিত এই সংস্কৃতি ধারণ করে।

একটু লক্ষ্য করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে- বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রচলিত ধারণা, পরিবার ও পরিবেশই নারীকে অবদমিত হওয়ার শিক্ষা দেয়। যেমন- একটি কন্যাশিশুকে যে ধরনের খেলনা দেওয়া হয় তা গৃহস্থালির সাথে সম্পর্কিত। সেখানে বেশি প্রাধান্য পায়- পুতুল, হাড়ি-পাতিল জাতীয় খেলনা। অন্যদিকে একটি ছেলেশিশুকে দেওয়া হয়- ব্যাট, বল, বন্দুক জাতীয় খেলনা। পুতুল দিয়ে কোন একটি ছেলেকে গৃহমুখী বা গৃহস্থালির কাজে অভ্যস্ত করা হয় না, তেমনি কন্যা শিশুর হাতে বন্দুক দিয়ে শক্তিশালী বা সাহসী কোন কাজের অভ্যাস গড়ে তোলা হয় না। একটি শিশু তার পরিবার থেকেই নিজ দায়িত্ব কর্তব্য বুঝতে শেখে। সেখানে পরিবারই তাকে অধীনতার শিক্ষা দেয়। এছাড়াও ধর্মীয় অনুভূতি, কুসংস্কার ও অশিক্ষা নারীর অবহেলিত হওয়ার জন্য বিশেষ ভাবে দায়ী।

নারীর নিরাপত্তাহীনতা প্রতিটি সংস্কৃতিতে একটি সাধারণ বিষয় হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। যা নারীকে পিছিয়ে রাখে সব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ থেকে। যেখানে কোনো নারীকে সর্বদা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকতে হয় সেখানে স্বাধীন কাজ দ্বাররুদ্ধ থাকে। একবিংশ শতাব্দীতেও নারীরা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে নির্যাতিত ও অনিরাপদ। আমাদের সংস্কৃতিও এটাই ধারণ করছে। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পথ-ঘাট এমনকি নিজের পরিবারেও নারীরা নিরাপদ নয়। বিচার ব্যবস্থায় অসঙ্গতি, ক্ষমতা, দুর্নীতি, ন্যায় বিচারের অভাব ইত্যাদি নানা কারণে প্রতিনিয়ত বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে নারীকে।

এক রিপোর্টে দেখা গেছে- চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮৭ জন নারী ও শিশু। নির্যাতিত হয়েছে আরও ৮১ জন শিশু। গণপরিবহনগুলোতে নারীর যাতায়াত রীতিমত আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিচারব্যবস্থা বারবার আমাদের হতাশ করছে। কারণ অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে তারা ক্ষমতার জোরে বিচারের ঊর্ধ্বে থেকে যাচ্ছে। একটি ঘটনা সাময়িকভাবে ব্যাপক আলোচিত হলেও কিছুদিন পর তা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। ফলে বিচার সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। বিচারহীনতা নারীকে আরও বেশি অনিরাপদ করেছে। এ ধরনের অপসংস্কৃতি থেকে যদি বেরিয়ে আসা না যায় তবে নারীর উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

মধ্যযুগীয় বর্বরতা পেরিয়ে আমরা সভ্যতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছি। এ অবস্থায় পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া নানা নিষেধাজ্ঞা অনেকাংশে কমে গেছে। নারীরা এখন কর্মমুখী হয়েছে এবং স্বাক্ষর রাখছে নিজেদের সাফল্যে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীদের উন্নয়নের জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নারী শিক্ষাই নারী অগ্রগতির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রাথমিক পর্যায় থেকে সব পর্যায়ে নারী শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণে নানা ধরনের আইন প্রণীত হয়েছে। কার্যকর হয়েছে নারী ও শিশু অধিকার আইন। নারীর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, নিরাপদ পরিবেশ, উপযোগী কর্মপরিবেশ তৈরী হচ্ছে সমাজের প্রতিটি জায়গায়।

বিশ্ব উন্নয়নে নারীর পারিবারিক, সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছে নারী। যেখানে কয়েক যুগ আগেও নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। এছাড়াও স্পিকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী ও সরকারের উচ্চপদস্থ বিভিন্ন পদে নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে।

তবে রাজনৈতিক পর্যায়ে নারীর যতটুকু উন্নতি হয়েছে অন্য পর্যায়গুলোতে তেমন হয়নি। অর্থনৈতিকভাবে নারীরা আজও স্বচ্ছল নয়। যদিও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। যেমন- বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের ৮০% নারী সদস্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নারীর সংশ্লিষ্টতা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায়ে নারী শিক্ষকদের আধিক্য, নারী শ্রমিক রফতানি ইত্যাদিকে আমরা নারীর অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। বর্তমানে নারীকে দেখেছি অনন্য এক উচ্চতায় এবং ক্ষেত্র বিশেষে নারীরা কোথাও কোথাও পুরুষকেও ছাড়িয়ে গেছে। তৈরি হচ্ছে নারীর জন্য নতুন এক সংস্কৃতি।

সংস্কৃতির ধারক হিসেবে বিশ্ব উন্নয়নে নারী-পুরুষ সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নারী উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যেখানে নারী, সেখানে নারীকে পেছনে ফেলে বিশ্বের উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নারীর গুরুত্ব অনুধাবন করে ‘নারী’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন-

‘আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

তাই সমাজে নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নারীর অবদান ছাড়া একটি সংস্কৃতি কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। নারীরা আজও স্বাধীন নয়। তারা এখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে আসেননি। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সব ক্ষেত্রে নারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সমাজের প্রচলিত সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে আদিম সমাজের প্রতিষ্ঠিত নারী সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান পদচারণা প্রয়োজন। নারীকে পুরুষের অধীনস্থ নয়, বরং সমকক্ষ ভাবা এখন প্রতিটি সমাজের দাবি। এক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহমর্মিতা নয়, প্রয়োজন সহযোগিতা।

বিশ্ব উন্নয়নে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন সংস্কৃতিতে বিদ্যমান অসঙ্গতিগুলো দূর করা। নারীবান্ধব সংস্কৃতি এবং লিঙ্গ বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা বিশ্বের সব সংকীর্ণতা দূর করে নতুন বিশ্ব গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও নারীর উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।