বার্তাবাংলা ডেস্ক »

ক্যানসার একটি জটিল মারাত্মক রোগ। এটি শরীরের যেকোনো অঙ্গে হতে পারে। এটি টিউমার অথবা অদৃশ্য রক্তের শ্বেতকণিকা হতে পারে। ক্যানসার একটি মাত্র কোষ থেকে সৃষ্টি হয়।

মানুষের শরীর লাখো-কোটি কোষ দিয়ে গঠিত। এই কোষের মূল উপাদান হচ্ছে ক্রমোসোম। এই ক্রমোসোমের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য জিন। প্রতিটি জিন একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে বা কর্মসম্পাদনের জন্য দায়ী থাকে। এ ধরনের একটি জিন হচ্ছে প্রটো অনকোজিন, আরেকটি হচ্ছে ক্যানসার সাপ্রেসরজিন। নাম শুনেই হয়তো বুঝতে পারছেন, ক্যানসার সাপ্রেসরজিন শরীরে ক্যানসার না হওয়ার জন্য কাজ করে। আর প্রটো অনকোজিন অনকোজিন হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। কোনো কারণে যদি ক্যানসার সাপ্রেসর জিন তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে বা প্রটো অনকোজিন অনকোজিনে রূপান্তরিত হয়ে যায়, অথবা উভয় প্রক্রিয়া একই সঙ্গে ঘটে, তাহলে অনকোজ বা টিউমার বা নিওপ্লাসিয়া বা ক্যানসার শুরু হয়ে যায়।

ধরা যাক, যেকোনোভাবে আপনার জিহ্বায় একটি ক্ষত সৃষ্টি হলো। দু-চার দিনের মধ্যে ক্ষতটি পূরণ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষ বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেল। যদি কোষ বৃদ্ধি ব্ন্ধ না হয়ে চলতেই থাকত, তাহলে কী হতো? কোষ বাড়তে বাড়তে মুখের বাইরে চলে আসত। এই প্রক্রিয়া ওই দুটি জিনের সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের জন্য হয়ে থাকে।

জন্মগতভাবে অনেকের জেনেটিক সমস্যা থাকে। এতে খুব অল্প বয়সে, এমনকি দুই বছরের কম বয়সে চোখের ক্যানসার, কিডনির ক্যানসার, মস্তিষ্কের ক্যানসার ইত্যাদি হয়। জিনের এই নষ্ট হয়ে যাওয়া বা কার্যকারিতা হারানোর প্রক্রিয়াকে বলা হয় সেলুলার মিউটেশন। এই সেলুলার মিউটেশন পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণেও হয়ে থাকে। যেমন : রেডিয়েশন এক্স-রে, গামা-রে, সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি , তামাকের ধোঁয়া, অ্যাসবেসটর, আলকাতরা, আর্সেনিক, ডিটিটি পাউডার, কাপড়ের রং করার অ্যানিলিনডাই, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশন, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস ইত্যাদি।

অধিক চর্বিযুক্ত খাবার, ছত্রাকযুক্ত খাবার, অধিক মাংসভোগী এবং কম সবজি ও কাঁচা ফল গ্রহণকারীর ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। যে মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করান না এবং যে নারী সন্তান গ্রহণ করেননি অথবা আদৌ বিয়ে করেননি, তাঁদের স্তন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ ছাড়া যেসব লোক একাকী জীবনযাপন করেন এবং সদা বিমর্ষ থাকেন, তাঁদেরও ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে প্রচুর কারসিনোজেন থাকে। কারসিনোজেনই হচ্ছে সেই পদার্থ, যা ক্যানসার সৃষ্টি করে বা করাতে চায় (সেলুলার মিউটেশনের মাধ্যমে)। তামাকের ধোঁয়ার মধ্যে কারসিনোজেন হচ্ছে কেমিক্যাল কারসিনোজেন। ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্যানসার, স্বরনালির ক্যানসার, গলনালির ক্যানসারসহ প্রায় প্রতিটি অঙ্গের ক্যানসার হতে পারে।

কোন ক্যানসারে কোন লক্ষণ

ক্যানসারের উপসর্গ নির্ভর করে শরীরের কোন অঙ্গে ক্যানসার হয়েছে এবং কোন রোগ কোন পর্যায়ে আছে, তার ওপর। যেমন : মুখগহ্বরের ক্যানসার হলে দীর্ঘদিন স্থায়ী একটি ক্ষত থাকবে, ব্যথা থাকতে পারে।

খাদ্যনালিতে হলে ক্রমান্বয়ে খাবার গিলতে অসুবিধা হয়, শক্ত খাবার থেকে শুরু করে তরল খাবার পর্যন্ত। এবং গলার মধ্যে আটকে থেকে বমি হয়ে বেরিয়ে যায়।

পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রে ক্ষুধামন্দা, বমি ভাব এবং পেটব্যথা হওয়া, কালো মল ইত্যাদি হয়।

ফুসফুসের ক্যানসার হলে কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, গলার স্বর বসে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

স্তন ক্যানসার হলে একটি পিণ্ড বা চাকা হতে পারে। স্তনের চামড়া কুঁচকে যেতে পারে এবং বোগলে চাকা হতে পারে।

বৃহদান্ত্রের ক্যানসার হলে মল ত্যাগে অনিয়ম, মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া অথবা তৈলাক্ত পদার্থ যাওয়া ইত্যাদি হতে পারে। একপর্যায়ে পায়খানা বন্ধ হয়ে গিয়ে পেট ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।

মলদ্বারের ক্যানসারে মলত্যাগে অসুবিধা, ব্যথা, রক্ত যাওয়া হতে পারে। রোগ বেশি বেড়ে গেলে পায়খানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে।

নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসারের জন্য দায়ী হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাস। এ ছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, অল্প বয়সে বিয়ে, সন্তান হওয়া এবং অধিক সন্তান প্রসব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সাদাস্রাব যাওয়া, সহবাসের সময় রক্তক্ষরণ হওয়া, ব্যথা ইত্যাদি এ ক্যানসারের উপসর্গ।

মস্তিষ্কের টিউমার হলে মাথাব্যথা করা, শরীরের নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, হঠাৎ চোখে দেখতে অসুবিধা হওয়া, হঠাৎ খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া—এসব উপসর্গ এককভাবে বা সমষ্টিগতভাবে হতে পারে।

ব্লাড ক্যানসার বা রক্তের ক্যানসার একটি মারাত্মক ব্যাধি। এটি হলে দুর্বলতা, রক্তশূন্যতা, দাঁতের মাড়ি বা অন্য স্থান থেকে রক্তক্ষরণ হওয়া, জ্বর হওয়া, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া, কাশি, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।

যকৃৎ, অগ্ন্যাশয় এগুলোর ক্যানসার হলে খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব, বদহজম, পেট ফাঁপা, পায়খানা পরিষ্কার না হওয়া, পেটে ব্যথা হতে পারে।

আরো অনেক ধরনের ক্যানসার আছে, যেগুলো বিভিন্ন অঙ্গে হতে পারে। এদের উপসর্গগুলোও ভিন্ন রকম। তবে ক্যানসার বলতেই কমবেশি রক্তশূন্যতা হবেই। খাবারে অরুচি, বমি ভাব, ক্লান্তি এবং অবসাদ, শরীরের ওজন কমে যাওয়া এইসব উপসর্গ থাকবে।

লেখক : অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »