তরুণ প্রজন্মের একজনের কিছু কথা

স্কুলে পড়া অবস্থায় একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে, প্রথম বারের মত ছাত্র রাজনীতির সাথে পরিচয় হই। ভাইয়াদের কথাগুলো খুব ভাল ছিল, ধীরে ধীরে ওদের সমর্থক এবং কিছু বই পড়ে দলটির কর্মীও হয়ে যাই। আর চেষ্টা করতে থাকি পরবর্তী স্ত্মরের নেতা হতে। বলাবাহুল্য, নেতৃত্বে প্রতি আমার টান ছোটবেলা থেকেই এবং ফলস্বরূপ মোটামুটি জীবনে যত জায়গায় গিয়েছি, নেতৃত্বের সাধ ঠিকই পেয়েছি। তো স্কুলে থাকতেই ঐ দলটির মাধ্যমে আমি গনতন্ত্রের সাথে পরিচিত হই। সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক চর্চা আছে ওদের মধ্যে বলতে হবে, ভোট দিয়েছিলাম কমিটি নির্বাচনের জন্য। কিন্তু আমি বরাবরই মুক্তমনা, তাই ওদের কিছু বিষয়ই আমার ব্যক্তিত্ব্যের সাথে সংঘাত পূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে, যার মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও স্বাধীনতার চেতনাবোধে ওদের কিছুটা বিতর্কিত অবস্থান অন্যতম প্রধান কারন ছিল। তাই ধীরে ধীরে সরে আসলাম ওদের কাছ থেকে, এবং পড়াশুনার পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক কাজে নিজেকে জড়িত করতে থাকলাম।তবে, ঐ ভাইয়াদেরকে সম্মান দেখাতাম ওরা বেশ ভালো মানুষ ছিল।

কলেজের প্রথম দিকে পরিচয় হল আরেকটি ছাত্র-রাজনৈতিক দলের সাথে আমারই এক কাছের বড় ভাইয়ের মাধ্যমে। বেশ, শেল্টার দিতো উনি, ছোটখাটো দু’একটা মারামারি করলেও ভাই বঁচিয়ে দিত। ভালই লাগছিলো, ওদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ আছে, স্বাধীনতার চেতনাও আছে।কিন্তু, ছাত্র রাজনীতির ছাত্রদের খুঁজে পাওয়া ছিল দুস্কর। অখাদ্য-কুখাদ্য কিংবা হাতাহাতির চর্চায় ওরা পড়াশুনা থেকে অনেক বেশী অস্ত্মাদ ছিল। আর ধর্মের ওদের শ্রদ্ধাবোধ থাকলেও, চর্চা ছিলোনা খুব একটা। অতঃপর সুনাগরিক হওয়ার লক্ষে উক্ত দল ত্যাগ করলাম।

কলেজ শেষ করলাম,ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার অপেক্ষা এবং নির্বাচনকালীন সেই সময়। সে’বার ভোটার হওয়ার বয়স হইলেও নিজের একটি ভুলে জাতীয় পরিচয়পত্র করতে না পারায় ভোট দিতে পারিনি। কিন্তু,তাতে কি? রাজনীতি থেকে দূরে থাকিনি, সেবার জড়ালাম আরও একটি ছাত্র-রাজনৈতিক দলের সাথে, এখানকার সমর্থক ও কর্মী গুলো একটু উশৃঙ্খল হলেও নেতাদের পকেটে টাকা থাকতো বেশ। গেলেই খাওয়া,আর টুকটাক খরচ পেতাম। বেশ ভালোই লাগতে শুরম্ন করলো আবার। নির্বাচনে তাদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারেও অংশ নিলাম এবং খরচপাতি কামাতে লাগলাম, শেষ পর্যন্ত্ম প্রার্থী জিতেও গেলো। বড় নেতা হওয়ার জন্য, বড় বড় নেতাদের সাথে সময় কাটাতে লাগলাম এবং তাদের প্রচারে ইফতার পার্টি থেকে শুরম্ন করে খেলাধুলার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে লাগলাম। ইতিমধ্যেই, আমি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম এবং বলাবাহুল্য আমার রাজনৈতিক কাজে আমার কাছের বন্ধুরা সবসমই আমাকে সহযোগিতা করতো। কারন, ক্ষমতাসীনদের খুশী রাখতে পারলে নিজেদেরও ব্যাক্তিগত উন্নতি হয়,এই আর কি। মোহ কেটে যাওয়ার পর ঐ দলটিকে নিয়ে যখন একটু চিন্ত্মা করতে শুরম্ন করলাম,তখন অনেক কিছুই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো, যেমন দলটির মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা থাকলেও জাতীয়তাবোধের অভাব, বাকশালের সমর্থন, অনেকের ধর্মের প্রতি অবজ্ঞার পাশাপাশি এলাকার কুখ্যাত লোকদের নেতৃস্থানীয় পদ পাওয়া,আর সর্বোপরি উশৃঙ্খল সমর্থক ও কর্মী বাহিনী। নাহ! আবারও নিজের ব্যাক্তিত্ব্যের সাথে সংঘাত। তাই,আবারও প্রস্থান। কিছু দিন বেশ লুকিয়ে লুকিয়ে এলাকায় ঢুকতাম, নেতাদের ভয়ে, আর যদি কখনো দেখা হয়েই যেত, বলতাম “আরে ভাই বইলেননা। ভার্সিটির পড়াশুনার চাপে, সময় বের করতে পারিনা”

তারপর পড়াশুনা ও নিজের ব্যাক্তিগত একটি ব্যাবসায় জড়িয়ে পড়লাম।ব্যবসার সুবাদে, মোটামটি পুরা বাংলাদেশ ঘোরা এবং অনেক মানুষের সাথে মিশে আমার ভিতর আবারো রাজনীতির চেতনা কাজ করতে লাগলো। নাহ! এবার আর কোন দলের সাথে জড়িয়ে নয়, আগে জানতে হবে রাজনীতি সম্পর্কে, জানতে হবে ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে। তাই, খুজতে শুরম্ন করলাম ইতিহাস। এখনও খুঁজছি এবং সেই থেকে একটু একটু করে শিখছি।এই খুঁজাখুজির মধ্যে যেমন কিছু কিছু সময় অনেক অনুপ্রানিত হয়েছি, হয়েছি আবেগি আবার কোন কোন ইতিহাস নষ্ট রাজনীতি ও এদেশের মানুষের মূর্খতার পরিচয় দিয়ে নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে।

আজকে চিন্ত্মা করলাম, এই জ্ঞান আমার কি কাজে আসবে?? আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি সু-শিক্ষিত ভদ্র ছেলে কিভাবে রাজনীতি করবে ? বাবার টাকা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে নেতা বনে যাওয়া অনেক তরম্নণ রাজনীতিবিদদের দেখলে হিংসা হয়, আমার বাবারও যদি ঐ রকম একটা পরিচয় কিংবা অতো টাকা থাকলে, নিশ্চিতভাবে তাদের চেয়ে বড় ও গুণী নেতা হতে পারতাম কারন ওদের চেয়ে রাজনৈতিক জ্ঞান আমার হয়তোবা অনেক বেশিই আছে। কিন্তু তাতো লাভ নেই।বাবা-মা অনেক কষ্ট করে সুনামের সাথে বড় করেছেন,তাই কারও মাথায় বাড়ি দিয়ে কিংবা চাঁদা তুলে রাজনীতি করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তাছাড়া আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত যুবকদের ভদ্র, প্রগতিশীল ও সত্যের রাজনীতি করার কোন সুযোগ ও তারা রাখেনি। তাহলেও হয়তোবা যোগ দিতে পারতাম। কোন উপায় না দেখে ইদানিং অনলাইনে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে দু’চারটা কথা লিখি। ভালোই লাগে যখন দেখি অনেকের সাড়া পেয়ে,তারাও আমার মত।কিন্তু কয়েকদিন ধরে আমার আত্মীয় স্বজন ও কাছের মানুষরা আমাকে নিষেধ করছে,অনলাইনেও যাতে লেখালেখি না করি।কারন তারা চায় না হঠ্যাৎ করে আমি লাশ হয়ে যাই।আমাকে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন। কিন্তু, আমিতো স্বপ্ন দেখি রাজনীতি নিয়ে, দেশ নিয়ে।

আমার মতো অনেক ফারহান আছে,এই দেশে যাদের জীবনের গল্প অনেকটা কিংবা কিছুটা কিংবা আমারি মতো একই। যারা দেশকে ভালোবেসে রাজনীতি করতে চায়। লাশের রাজনীতির পরিবর্তন করতে চায়।কিন্তু সুযোগ কোথায় ???

এই লেখাটার মাধ্যমে সমগ্র রাজনৈতিক দলের প্রধানদের বলতে চাই,

“আমরাও রাজনীতি করতে চাই,নতুন কোন রাজনৈতিক দল নয়,প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংশোধন আনতে চাই। যে রাজনীতিতে থাকবে জাতীয়তাবাদ, প্রগতিশীলতা, মুক্তি যুদ্ধের চেতনা, ধর্মীও মূল্যবোধে বিশ্বাস আর সত্য ও ন্যায়ের রাজনীতি… ভদ্র ও সভ্য রাজনীতি”

লেখক : সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ; আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়