বার্তাবাংলা ডেস্ক »

কমার কোনো লক্ষণই নেই, বরং পদ্মাবতী বিতর্ক বেড়েই চলেছে। সঞ্জয় লীলা বানসালীর তৈরি এই ছবি চলতি বছর সম্ভবত মুক্তি পাচ্ছে না। ছবিটির নির্মাতা ‘ভায়াকম-১৮’ সূত্রের ইঙ্গিত তেমনই।

কিন্তু আগামী বছর মুক্তি পেলেও আদৌ কি ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে? সন্দেহটা দানা বাঁধছে কারণ, প্রায় ২০০ কোটি টাকায় তৈরি এই সিনেমার ভাগ্য এখন দেশের প্রধান শাসক দলের হাতে। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের হুমকির পর এখন বিজেপিশাসিত সব রাজ্যেই হয়তো পদ্মাবতী নিষিদ্ধ হতে চলেছে।

শিবরাজ সিং চৌহান ঘোষণা করেছেন, তাঁর রাজ্যে সিনেমাটা দেখানোর প্রশ্নই ওঠে না। বরং জানিয়েছেন, ক্ষত্রিয় রাজপুত জাত্যভিমানের স্বার্থে পদ্মাবতীর একটি স্মৃতিসৌধ তিনি রাজধানী ভোপালে তৈরি করবেন।

বানসালীর অপরাধ, তিনি নাকি রাজস্থানের চিতোরের মহারানি পরমা সুন্দরী পদ্মিনীর (সিনেমায় পদ্মাবতী) সঙ্গে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির প্রেমকথা চিত্রায়িত করেছেন। কথিত আছে, পদ্মিনীর অসামান্য রূপে মুগ্ধ আলাউদ্দিন খিলজি পাগলপারা হলেও যুদ্ধে স্বামীর মৃতুর পর রানি পদ্মিনী রাজপুত নারীদের ধর্ম মেনে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেছিলেন।

অথচ ত্রয়োদশ শতকের ইতিহাসে পদ্মিনী বা পদ্মাবতীর কোনো উল্লেখই কেউ কোনো দিন পায়নি। ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইতিহাস আলাউদ্দিন খিলজির অস্তিত্ব স্বীকার করে, চিতোরের রাজা রতন সিংয়েরও। দুজনের মধ্যে যুদ্ধে রতন সিংয়ের পরাজয় ঘটেছিল। সেটাও ইতিহাস। কিন্তু রানি পদ্মিনীর কোনো অস্তিত্ব কোনো ইতিহাসে নেই। তাঁর কথায়, আলাউদ্দিন খিলজির রাজসভার কবি ছিলেন আমির খসরু। চিতোর আক্রমণের সাক্ষীও তিনি। অথচ তাঁর কোনো লেখাতেও পদ্মিনীর কোনো উল্লেখ নেই!

পদ্মিনীর প্রথম উল্লেখ ১৫৪০ সালে, সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সির পদুমাবতকাব্যগ্রন্থে। ইরফান হাবিব বলেছেন, সেখানে পদ্মিনী আবার শ্রীলঙ্কার নারী, রাজপুত নন। ইতিহাসবিদ ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় ও গৌতম ভদ্রও ইরফান হাবিবের সঙ্গে একমত। তাঁদের কথায়, পুরোটাই লোকগাথা। নিছকই রোমান্টিসিজম। কল্পনাশ্রয়ী সৃষ্টি। এ রকম কল্পনার ছোঁয়া বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজকাহিনীতেও পাওয়া যায়। একটি মাত্র কবিতা থেকে জন্ম নিয়েছে এক ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি।

ইতিহাসবিদেরা যা-ই বলুন, জাত্যভিমানে টইটম্বুর বিজেপির রাজপুত ও ক্ষত্রিয়রা খড়্গহস্ত। হরিয়ানার যে নেতা দীপিকা পাড়ুকোন ও সঞ্জয় লীলা বানসালীর মাথার দাম পাঁচ পাঁচ—দশ কোটি রুপি ধার্য করেছিলেন, সেই সূরয পাল আমু পার্টি থেকে কারণ দর্শানোর চিঠি পেয়ে মাথার দাম দশ দশ—বিশ কোটি রোপিতে তুলে দিয়েছেন। উৎসাহ তাঁর পাওয়ারই কথা। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, এমনকি কংগ্রেসশাসিত পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীও যে এই বিষয়ে এককাট্টা! অবশ্য কর্ণাটকের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার দীপিকা পাড়ুকোনের নিরাপত্তা দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।

সিনেমার বিচ্যুতিকে কেন্দ্র করে এ ধরনের বিতর্ক অবশ্যই নতুন নয়। সঞ্জয় লীলা বানসালীই দেবদাস (২০০২) সিনেমায় পার্বতী ও চন্দ্রমুখীকে দিয়ে একই সঙ্গে নাচা-গানা করিয়েছিলেন, যদিও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনিতে এই দুই নারী মুখোমুখি হননি। আশুতোষ গোয়ারিকরের যোধা আকবর (২০০৮) সিনেমাতেও ছিল আকবরের সঙ্গে যোধা বাঈয়ের প্রেমের কল্পনার মিশেল। এসব নিয়ে কথা-চালাচালি হলেও ছবি প্রদর্শনী বন্ধে এমন জঙ্গিয়ানা দেখা যায়নি। সে ছিল ইউপিএ আমল। এখন বিজেপির।

ইতিহাস ও কল্পনাশ্রয়ী কাহিনির এই সংঘাতের পরিণতি কী, এখনো তা অজানা। একদিকে শিল্পীর স্বাধীনতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা। দ্বৈরথ অব্যাহত।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »