বার্তাবাংলা সাহিত্য ডেস্ক »

সামিরের মন খারাপ। জালাল টি স্টলে বসে আছে লম্বা বেঞ্চের উপর।তার নিজের বিমর্ষ বিবর্ণ চেহারার পাশে কেতাদুরস্ত একটা অফিস ব্যাগ।সারাদিনের অফিসের ক্লান্তি আর মন খারাপের রেখা তার চোখে মুখে।বন্ধুরা সবাই জানে মাঝে মধ্যে আড্ডায় আসলেও মোবাইল ফোনের ডিসপ্লের দিকে তার নজর রেখেই সে কথা বলে।

মোবাইল ম্যানিয়া আক্রান্ত ব্যাক্তি সে, এতে কোন সন্দেহ নাই। শুধু তার কথা বললে ভুল হবে এখন প্রায় সবাই কম বেশী এই রকম। ধরুন আড্ডায় কোন বন্ধু যদি তাকে এসে সৌজন্য বশত জিজ্ঞেস করে কেমন আছিস? সে মোবাইলের ডিসপ্লের দিকে তাকিয়ে বলবে এইতো বন্ধু ভালো। কিন্তু আজ দিনটা ব্যাতিক্রম।

আজ বৃহস্পতিবার। চাকুরে ব্যাক্তির কাছে দিনটি চাঁদ রাতের মতো। পরের দিন ছুটি বলেই আজ আড্ডাটা অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে একটু বেশী জমে। এমনিতেই এই বয়সে কাউকে আড্ডায় নিয়মিত পাওয়াটাই মুস্কিল। দু একজন ছাড়া আর প্রায় সবাই বিয়ে করে বাচ্চা ফুটিয়ে সংসার নিয়ে ব্যাস্ত। দু একটি ব্যাতিক্রম ছাড়া যেহেতু এরা সবাই একই এলাকার এবং সেই স্কুল জীবনের বন্ধু, সপ্তায় দু সপ্তায় একবার আড্ডার টানেই হোক আর প্রানের টানেই হোক অথবা একটু ফুসরত পাবার জন্য হোক, একসাথে বসে নানান ব্যাপার নিয়ে হই হল্লা করে, আড্ডা দেয়। এই আড্ডায় ব্যাক্তি জীবন থেকে শুরু করে মেয়ে মানুষ, খেলা, সিনেমা, রাজনৈতিক আলাপের ফাঁকে কখনো সখনো হোয়াইট হাউজের নীতির সমালোচনা পর্যন্ত গিয়ে থেকে।

সন্ধ্যার পর পর অন্যদিন অনেকেই চলে আসে এতক্ষনে। কিন্তু আজ সামির এখনো একা বসে আছে। চাটগায়ে যারা অনেক দিন ধরেই থাকেন তাদের জানার কথা যে এই অঞ্চলের মানুষ যতই শিক্ষিত আর মার্জিত হোন না কেন তাদের মুখের ভাষায় গালি বস্তুটা কারণে অকারণে চলেই আসে। সেটা অবশ্য গালি দেবার খাতিরে গালি দেয়া না। ভাষার পূর্ণ ভাবের প্রকাশ এইটা দুইটা গালির মাঝে একটা অন্য রকম মানে গেথে দেয়া।

হ্যাঁ, যাকে নিয়ে কথা বলছি সে সামির,চাঁটগার লোকাল ছেলে।মোবাইলে ফোনের ডিসপ্লের বাতিতে তার ফর্শা মুখে একটা আভায় পস্টতেই বুঝা যায় আজ তার মন খারাপ। বন্ধুরা যারা তাকে চেনে,সবাই তার হাসি খুশি অভিব্যাক্তিতেই অভ্যস্ত। আড্ডার অন্যতম এক বন্ধু আরা যার আসল নাম আরেফিন। বন্ধুদের অনর্থক হাসি ঠাট্টার যোগান যে দেয়,সে এরি মধ্যে এসে পড়েছে।বদ অভ্যাসগত ভাবেই বুকের জমানো কফ নিঃশ্বাস টেনে একটা লম্বা ওয়াক থুঃ শব্দ করে একগাদা কফ ফেলে মাটিতে।

সেই সঙ্গে সামির খিস্তি করে উঠে- দুর ও!খবিস চোদানীর পোয়া!
আরা থু জড়ানো ঠোঁটে সিগারেট গলিয়ে মুখে চাপা হাসি মেখে বলে – ভালো আছস? সামিরের হটাথ চড়া রাগ হটাথই আবার চলে যায়।

নারে ভালো নাই।

কি হইছে? মুখ কুত্তার পুটকির মতো করে বসে আছস ক্যান?

মাদারচোদ! তোর মুখ বান্দরের পুটকির মতো! বাল একটা তুই।
খিস্তি চলছে কিন্তু সামিরের চোখ মোবাইলের দিকেই আছে। দু একটা গালি দিতে পেরে এতক্ষনে তার মনে একটু আনন্দ আসছে। এবার হালকা গলায় বলল- আসলে সকাল থেকে মেজাজ খারাপ। হেডার একটা চাকরী করি খালি কাজ আর কাজ। আর তার মধ্যে বৌ রাগ করে চলে গেছে বাপের বাড়ী। আরা সু্যোগ পেয়ে যায়- কেন রাগ করছে?
আর বলিস না বাল- কালকে অফিসে থেকে বাসায় গেছি রাত আটটায়। গিয়ে হাত মুখ ধুইছি, ফ্রেশ হইছি। তোর ভাবী এসে বলে তার মোবাইলে টাকা নাই। বাড়ীতে কাকে যেন কল দিবে। আমি বললাম, আমার মোবাইল থেকে কল করো। আমার মনে কোন প্যাঁচ ছিলোনা। আমি পোলাটারে নিয়ে খেলতে বসে গেলাম আরেক রুমে। কিন্তু আমি মাদারচোদের কপাল এমন খারাপ কে জানতো?

আরা বলল আচ্ছা, তো কি হইছে? সামির এইবার চোখ থেকে মোবাইল সরিয়ে দোকানদার জালাল ভাইকে একটা চায়ের ফরমায়েস দিলো। আরার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো সে খাবে কিনা। আরা বরাবরের মতোই খাবে বলেই জানিয়ে দিলো। এইদিকে জালাল ভাইয়ের দোকানে নানান বয়সের মানুষ বসে আছে। একটা চোদ্দ ইঞ্ছি টিভি অনবরত চলতেই থাকে এই দোকানে।এখন চলছে নতুন এক সিনেমার গান-“আমি ডানা কাটা পরী, আমি ডানা কাটা পরী”।দোকানী জালাল ভাই হা মুখ করে টিভি দেখে।সাথে দোকানের ভেতরে সারি করা চেয়ারে বসে বুড়া রিক্সাওয়ালা আর উঠতি বয়সি ছেলেরা।তাকে যে কোন ফরমায়েশ দুবার, কখনো কখনো তিন চার বার না দিলে তিনি অতি উচু ভলিয়মের কারনেই হোক আর তার টিভির নেশায় হোক সেটা পেশ করতে পারেন না।

আরা সামিরকে জিজ্ঞেস করলো-বল তারপর কি হইসে?সামির এইবার আরেকবার চায়ের ফরমায়েস দিয়ে কথা শুরু করলো। বালের কপাল বেটা। বৌ মোবাইল ফোন নিয়ে কথা বলতে গেল। আর আমি এইদিকে ছেলের সাথে খেলি, দুস্টামি করি। পোলাটা আমাকে আর কতক্ষন পায় বল?কপাল কুঁচকে অবাক হবার ভান করে সামির, অবুক!! হটাথ আমার মনে পড়ে গেলো, আমি তো নেটের লাইন অফ করি নাই। মোবাইলে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার খোলা, ইমো খোলা। এক লাফ দিয়ে পাশের ঘরে যখন গেছি তখন প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ মিনিট। কেয়ামত যা হবার এর মধ্যেই হয়ে গেছে।আমি যে ফেসবুকে কয়েকটা মেয়ের সাথে চ্যাট করি বৌ সেগুলার মেসেজ পড়তেছে।

আমি এক ঝটকায় মোবাইল কেড়ে নিতে গেলাম। বৌ কিছুতেই দিবে না বেটা।মোবাইল আমি যতই ধরতে যাই বৌ আরো শক্ত করে ধরে আর মেজাজ খারাপ করে।এই করতে করতে সেটটা হাতের থেকে পড়ে গেল। এই দ্যাখ ডিসপ্লে ভাঙ্গা।
আরা এইবার আবার সুযোগ বুঝে বলে- চ্যাট করবি, বাল করবি, এইগুলা এখন তোকে মানায়?ঘরে ছেলে আছে, সুন্দরী বৌ আছে। খাসলত পাল্টানোর সময় আছে এখনো। ভালো হই যা। আর যে খানকি গুলা তোর সাথে রসের চ্যাট করে সেইগুলার রুচির ও কি হাল আল্লায় জানে!ওরা জানেনা তোর ঘরে বৌ-বাচ্চা আছে?

জানেতো।

আরা আবাক হয়ে বলে-জানলে কিসের জন্য আলতু ফালতু চ্যাট করে?

তুই এইগুলা বুঝবি না, দৃঢ় গলায় সামির বলে।অবাক হয়ে আরা তাকিয়ে থাকে।

এইগুলা এখন সবাই করে,ভালো সময় কাটে,মন ভালো থাকে।

আচ্ছা তাই না? ধর যদি এই একই কাজ তোর বৌ করতো? তখন তুই কি করতি?

এই বিব্রত প্রশ্ন শুনে চুমুক দেয়া কড়া চিনির কন্ডেন্সড মিল্কের আধা কাপ চা সামির ফেলে দিলো রাগে।

মাদারচোদ!! যেগুলা বুঝস না সেগুলা নিয়া কথা বলবি না। তোরে পোলাপাইন এমনি এমনি আরাচোদা ডাকে? নিজের রাগ

সামলাতে না পেরে সামির দোকান ছেড়ে চলে যায়।

বৌয়ের হাতে হাতেনাতে ধরার পড়ার পরেও অন্য নারীর সাথে চ্যাট করার অপরাধে যতটুকু বিব্রত সামির তার চেয়ে বেশী মন খারাপ হইছে মোবাইলের ডিসপ্লে ভাঙ্গাতে। সেই অভিব্যাক্তি এখনো তার চোখে মুখে। এরপর সামী-স্ত্রী দুজনের ঝগড়া স্বাভাবিক ভাবে যতটুকু হবার কথা তাই হলো।

মেয়ে মানুষ পুরুষের কয়েকটা খুন মাফ করতে পারে হয়তো কিন্তু পর নারীতে আসক্তি কোনভাবেই সে মানতে পারেনা।এটাকে মেয়েরা যতটা পুরুষের দোষ মনে করে তার চেয়ে বেশী নিজের খুঁত মনে করে। ভাবে,তার নিজের হয়তো কোন ঘাটতি আছে।মেয়েরা আর যাই হোক নিজেদের রুপের ঘাটতি কেউ ইশারা ইঙ্গিতে বা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে মা থেকে মা কালী বনে যেতে সময় নেয় না।

সোনিয়া রুপবতী ও শিক্ষিতা। সে এই ঘটনায় মা কালী না হতে পেরে সীতার মতো বাপের বাড়ি বনবাসে চলে গেল একমাত্র ছেলেটাকে সাথে করে সামিরের অফিস গমনের পরেই।

এদিকে জালালের দোকানের টিভি যেমন দর্শকের অপেক্ষা না করেই চলতে থাকে, তার দোকানের আড্ডার দলটাও কে আসলো কে আসলোনা তার অপেক্ষা করেনা। এরি মধ্যে আরো দু চারজন এসে অফিসের ক্লান্তি আর ফিরতি পথের রাস্তার ঝক্কির আলাপ করতে থাকে।

ইদানিং শহরের রাস্তাগুলা এমন খারাপ লেভেলে গেছে মনে হয় আকাশ থেকে বোমা মেরে বড় বড় গর্ত খোদা হইছে। এই গেল সপ্তায় নীমতলা রোডে একটা কন্টেনার উল্টে সিএনজি ট্যাক্সির উপর পড়াতে সেখানে চাপা পড়ে দুজন জায়গাতেই মারা গেলো!মেয়রকে মা বোন তুলে গালি দেয়াতে গাড়ীর ড্রাইভার থেকে শুরু করে পেসেঞ্জার কেউই কম যায় না । একটু বৃষ্টির পর কোমর সমান পানিতে শহর কেন ডুবে যায়, আর কোন পথে অফিস থেকে বাসায় ফিরতে কতো টাকার ভাড়া কতগুন বেশী দিতে হয় তা নিয়ে আলাপ হচ্ছে মামুন আর শাহীনে।এই মধ্যে আরো দু একজন এসে চা খায় আর সিগারেট টানে,সাথে মোবাইল পকেট থেকে বের করে টিপাটিপি করে।

আরা সামিরের সাথে ঘটনার রেশ কাটাতে পারে না। ওয়াক থুঃ ওয়াক থুঃ করে একটু পর পর। রসিক মামুন আরাকে লক্ষ করে বলে,-আরে ভাই,এইবার একটু থাম- এই যে মাটির উপর থুঃ ফেলতেছস, একবার মাটিকে জিজ্ঞেস করে দেখ,তার কেমন লাগে।আর মাটি যদি কথা বলতে পারতো আর মাটির যদি তোর মতো মুখ থাকতো, সবগুলা থুঃ একসাথে তোর মুখে ফেলে দিতো।আড্ডার সবাই একসাথে হেসে উঠলো।সিকো, আড্ডার লিলিপুট নামে যে খ্যাত সে বলে- আরে বাদ দে, আরার মন খারাপ! মামুন জিজ্ঞেস করলো -কেন? আরা সামিরের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা বিস্তারিত বলল।মামুন বলে-তুই তো জানস,অল্মোস্ট আমরা সবাই জানি সামির একটু এই রকমের। এইটা নিয়ে মন খারাপ হবার কি আছে?

কথায় কথায় আড্ডার সাবজেক্ট যে কোথা থেকে কোথায় যায় সেটা অন্য আরেক দিনের গল্প। আজ কেবল সামিরের বিয়ে এবং মোবাইল ফোন কীভাবে সেই বিয়ে সম্পাদনের সবচে বড় নিয়ামক তা নিয়ে গল্প হবে।

সামির তখন টিউশনি করে দুইটা। সেই টাকায় তার দিন ভালোই যাচ্ছিলো। কিন্তু এখন সে খেয়াল করে তার প্রায় সব বন্ধু ও সমবয়সী ছেলেরা মোবাইলে প্রেম করে।এ যেন দরকারি কথা বলার যন্ত্র না,প্রেম করার একটা মোক্ষ অস্ত্র! সেই সময়টায় সামিরের পাশের গলির মায়াকে বেশ ভালো লাগতো। কলেজে পড়ার সময় একদিন আবেগে মায়ার রিক্সার পেছেন পেছনে দৌড়ে একবার প্রায় দুই মাইল গিয়ে রনভঙ্গ দেয়। সেই সব কথা মনে পড়লে তার বুক মোচড়ায়। একটা প্রেম সে করতে পারলো না। শালার মেয়েগুলা কেন যে তার আবেগ বুঝে না তা নিয়ে বিধাতার সাথে তার মনে মনে মনমালিন্য।আচ্ছা প্রেম না হোক অন্তত একটা সুন্দরী মেয়ের মোবাইল নাম্বার তো বিধাতা তাকে দিতেই পারেন।বাকীটা সে নিজ দায়িত্তে করে নিতে পারে। তাও সামিরের কপালে জুটে না।

দেশে যখন একাধিক মোবাইল ফোন কোম্পানী অনেক দিন চড়া কল রেটে মানুষের পকেট কেটে বহু টাকার মালিক,তখন আরো অধিক মুনাফা নিতে নিজেদের বাজার টিকিয়ে রাখার নানান রকম ফন্দি ফিকির শুরু করলো। দিনের বেলা মানুষ ফোনে কথা বলে, রাতে কেন ঘুমাবে? এই নিয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরেরা বিরক্ত ছিলো বোধহয়। কারণ মানুষ ঘুমালে তাদের ব্যাবসা হবে কি করে?যে করেই হোক কথা বলাতেই হবে। বাজারে আসলো ডিজুস নামে মস্ত এক ধামাকা! অরে বাবা সে কি অফার! দু টাকায় প্রায় দেড় ঘন্টা কথা বলা যাবে। সামির সেই রকম একটা সিম কিনে ফেললো চট করেই। কিন্তু মুস্কিল হলো কার সাথে কথা বলবে? তেমন কেউ তো নাই।

সামির বন্ধুদের একে ধরে তাকে ধরে –দেনা ভাই, একটা মেয়ের ফোন নাম্বার দে। কিন্তু সেই ফোন নাম্বার তো আর নাম্বার না যেন একটা নারীর সমস্ত শরীর,মন কয়েকটা গানিতিক শব্দের ভেতর। বহু প্রতিক্ষার পর একদিন একটা নাম্বার তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে দেয়। আলাপ জমে যায় প্রথম দিন থেকেই। যেন দুইটা রাত জাগা পাখি কথা বলার জন্য বুহুদিন অপেক্ষায় ছিলো।দিন সাতেক কথা বলার পর আর দেখা করার তর সইলো না।মেয়েটা এতো করে না না করলো কিন্তু সামির তো বলেই দিছে, দেখা না হলে আর কথাই বলবে না।উত্তরে মেয়েটা অনেকবার বলেছে আমাকে দেখলে আর কথা বলবেন না এমনিতেই।

কিন্তু অনেক জোর করে মেয়েটার সাথে দেখা হবার পর সামির সত্যি ভিরমি খেলো। সামির দেখতে ছোট খাটো কিন্তু এই মেয়েকে ছোটখাটো একটা হাতি বললে কম হয় না। নিজের চোখ কে বিশ্বাস না করে উপায় নাই সামিরের। এত মিস্টি গলার একটা মেয়ে দেখতে এমন কেন? টিউশনির টাকার প্রায় আধা দিয়ে সেই সাক্ষাতের নজরানা মিটালো।
সামির প্রেমের অংকে যতই কাঁচা হোক বিধাতা তো আর কাঁচা নন, তার এতো দিনের মনের বাসনা মিটাতে তখন তিনি খেললেন আরেক খেলা। ঘটনাচক্রে সে তার এক নিকট আত্মীয়ের বাড়ী বেড়াতে গিয়ে এইবার ফাইনালী ফেঁসে গেলো,নাকি বিধাতা তাকে ফাসিয়ে দিলো বলা কঠিন।

সোনিয়ার সাথে চোখাচোখি হতেই তার খালি মনে তালি বেজে উঠলো। তাদের দুজনের মধ্যে ভাব বিনিময় তো হলোই সাথে ফোন নাম্বার বিনিময়ও।“চোখের আড়াল মানে মনের আড়াল”-এসব এখন বাতিল কথা। আরে ভাই ফোন আছে না, মোবাইল ফোন।সোনিয়ার নিজের ব্যাক্তিগত ফোন তখনো নাই। ঘরের কারো একজনের নাম্মার দিয়ে তখন তাদের কথা বলার শুরু।

কিছুদিন দু চার বার আলাপ হবার পর সামির দেখলো এভাবে কথা বলে পোষাচ্ছে না। তার মন খুলে কথা বলা দরকার। তাই দু মাসের টিউশনির টাকা জমিয়ে কিছু টাকা বন্ধুদের থেকে ধার করে একটা জুতসই মোবাইল সেট নিয়ে উপহার দিয়ে আসলো সোনিয়াকে।অথছ তার নিজের সেটটা বদলানো দরকার ছিলো। বড় না হলে কি আর প্রেমিকের মন? শুধু তাই নয় সেই ফোনে টাকা তোলা থেকে যাবতীয় দায়িত্ত সামির নিজে নিয়ে নিলো। কথা বলা আর ঠেকায় কে?

এক এক দিন সারা রাত আলাপ হয়, আবেগে বিলাপ হয়। কথা ফুরোতেই চায় না। কিন্তু মোবাইল ফোন কোম্পানী কথা রাখেনা ঠিক মতো।এতো গভীর সব আবেগের মাঝে কি জানি কেন লাইন কেটে দেয়। আরেকটা কল করে লাইন পেতে সময়টাকেও সামিরের দীর্ঘ মনে হয়।আলাপ থামেই না।যতক্ষন ফোনে টাকা ততক্ষনই কথা। রাতভর,রাতের পর রাত তারা আলাপ চালাতেই থাকে। দুজনের ভালো মন্দ জানা হয়ে যায়।

আলাপ আরো গভীর হলে প্রেম মোড় নেয় আরেক দিকে। দু একটা চুমো বিনিময় হয়ে যায় মোবাইলে। ধীরে ধীরে সেই চুমুর সংখ্যা যেমন বাড়ে সাথে আবেগ ঠোঁট থেকে নাভিতে বা আরো নিচে চলে আসে ধারাবাহিক!আবেগের মেঘ ঘণ হয়ে কখনো কখনো জল ও হয়ে ঝরে পড়ে।সেই জলের আবেগে নাকি মনের টানে সেই প্রেম হয়ে গেলো মরণ গিট্টুর মতো।

দুই পরিবার এই প্রেমের কাহিনী জেনে গেলো।যেহেতু আত্মীয় তারা পরস্পর সেহেতু প্রথমে হালকা নিষেধ আর একটু বকা ঝকাকে সেই গিট্টু খোলার জন্য দুই পরিবার চেস্টা করলো। কিন্তু যেই সুতায় এই গিট্টু সেটা কি আর এই হালকা চাপে খুলবার বস্তু? বরং ভুল-ভাল টানাটানিতে গিট্টু আরো শক্ত হয়ে গেলো।

সোনিয়ার মোবাইল সিজ করা হলো।সাথে লুকিয়ে কথা বলা আর প্রেম করার অপরাধে তাকে শারিরীক ভাবে লাঞ্ছনার শিকার হতে হলো। এদিকে সামিরের পরিবার সোজা বলে দিয়েছে;এই প্রেম কিছুতেই মেনে নেয়া যাবেনা। একবার আত্মীয়তা যেখানে সেখানে নতুন করে আর কিছু করা যাবেনা। কথা বলা বন্ধ হওয়াতে সামিরের মনে আগুন লেগে গেলো। সেই আগুন নেভানোর আর কোন উপায় না পেয়ে,এইদিকে সে ঘুমের বড়ি খেয়ে হাসপাতালে গেলো।

এই খবর কি করে যেন সোনিয়ার কানে চলে গেল।সোনিয়া তো বসে থাকার পাত্রি না। সেও বাথরুমে ঢুকে হারপিক খেয়ে প্রেমের প্রতিদান দিলো। দুইটা ছেলেমেয়েকে নিয়ে দুই পরিবার আর বন্ধুদের টানাটানি।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সামির মাঠে এসে বন্ধুদের মাঝে করে বসলো আরেক কান্ড।আবেগে সে কাঁদতে কাঁদতে এক বন্ধুর গায়ে পিশাব পর্যন্ত করে দিলো। তাকে সবাই ধরে বাসায় দিয়ে আসলো।এতো বড় একটা ছেলের এই কান্ড দেখে সামিরের মা অস্থির হয়ে গেলো। এর মধ্যে কিছুদিন পার হয়ে গেলো।সবাইকে অবাক করে দিয়ে সামির আর সোনিয়া বিয়ে করে ফেলল কেমন করে যেন।এরপর বছর দুয়েক ভালো চলার পর সামিরের অতি নারী প্রিতী সোনিয়ার চোখে পড়লো। সেই থেকেই সংসারে দুজনের মাঝে নানান ঝামেলা লেগেই থাকতো। আজও সামিরের মনে সেই রকম একটা ঝগড়ার রেশ।

দিন সাতেক পরে অফিস ম্যানেজ করে সোনিয়াকে বাপের বাড়ী থেকে আনতে গেলো সামির।সেখানে গিয়ে তার সাথে পরিচয় হয়ে গেলো পাশের বাড়ির এক সুন্দরী শালিকার সাথে।আপাতত ফেসবুক আইডি বিনিময় হয়ে গেলো।পরের দিন বৌ বাচ্চা নিয়ে একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে করে সামির তাদের সুখের নীড়ের দিকে যাত্রা শুরু করলো।বাসের টিকেট অনুযায়ী বৌ বাচ্চা একটা জোড়া সিটে আর সামির পিছনের দিকে একটা সিঙ্গেল সিটে। কিছুক্ষন গাড়ী চলার পর সোনিয়া আর তার ছেলেটা ঘুমে অচেতন হয়ে গেলো।

সামির পিছনের সিটে বসে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে।ফাকা রাস্তায় গাড়ি চলছে ঘুম পাওয়া গতিতে।সামির সেই নতুন পরিচিতা সুন্দরী শালিকার সাথে ফেসবুক চ্যাটে মগ্ন হয়ে গেলো।বিধাতা এইবার আবার মুচকি হাসলেন।কবি বলেছেন-ভালোবাসা মরে যায়, মুগ্ধতা মরে না…।।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »