বার্তাবাংলা ডেস্ক »

monoar hosenমনোয়ার হোসেন :: আমাদের এই বঙ্গদেশে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি কার কথা বলে? এরা কারা? এদের পূর্ব-পুরুষ কোন সমাজভূক্ত? এইসব সহজ প্রশ্নগুলির উত্তর সহজভাবে পাওয়া সহজ না। এদের চরিত্র এক এক সময় এক এক রকম। এদের চরিত্র বোঝা খুব মুশকিল। গ্রামীণ এলাকায় বুদ্ধিজীবী বলে আলাদা কোন শ্রেণির খোঁজ পাওয়া যায় না ঠিকই তবে তাদের চরিত্রের মতোন এক শ্রেণির মানুষকে দেখা যায়। এরা কেউ মাতবর বা মণ্ডল, পরামানিক, চৌধুরী, শেখ বা মোল্লাহসহ আরও নানা পদের ক্ষমতাশীল শ্রেণি বা বংশের তলে লুকিয়ে আছে। এরা হয় ভূস্বামী, না হয় শিক্ষিত চাকুরিজীবী বা ব্যবসায়ী শ্রেণি। এদের টাকার গন্ধ তীব্র। এরা কোন কায়িক শ্রমের সাথে জড়িত থাকে। এদের ক্ষমতার বলির পাঠা হন সহজ সরল জনগণ।

বর্তমানের রাজনৈতিক ডামাডোলে সম্পৃক্ত হয়ে এসব শ্রেণির ব্যক্তিই ক্ষমতাশালী খুরের ন্যায় ধারালো হয়ে উঠছেন। আমরা দেখছি। এরাই গণমানুষের চৌকাঠের ছাল-চামড়া রক্ষণাবেক্ষণ করে, ধোলাইও করে কখনও সখনও। এদের মধ্যে যারা একটু জ্ঞানীভাবের অধিকারী হিসেবে বিবেচিত হন, এদেরকেই সাধারণ আমপাবলিকে বলে ব্রিটিশ, মানে বুদ্ধির অধিকারী, লোকে তাঁদের কথা শোনের ও মানেন।
শ্রেণিবিভক্ত নাগরিক সমাজের অধিবাসিও এই শ্রেণির আদমিকে বুদ্ধিজীবী বলে ঠাওরায়, এরাই আবার সুশীল, বিভিন্ন মধ্যরাতের টকশোতে এরা গলা ফাটিয়ে দেশ উদ্ধার করেন, সব জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলেন। কিন্তু এদের পর্যবেক্ষণে সব শ্রেণির সার্বিক অবস্থার চিত্র ফুটে ওঠে না। এদের অধিকাংশই শাসকের মাথায় ছাতা ধরে দাড়িয়ে থাকে। নুন খায়। গুণ গায়। এরা তিলকে তাল বানিয়ে বাহবা কুড়াতে থাকে।

বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ভেতরও কেউ কেউ প্রভুত্বের অধিকারি আবার কেউ কেউ প্রভুধীন, অনেকটা দাসের মতো আচরণ করে। বুদ্ধিজীবী শ্রেণির প্রভুত্ব ও অধীনতার সম্পর্ককে খালি চোখে দেখা খুব মুশকিল, ঠাহর করা যায় না। বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সম্পর্কের মধ্যেও নানাবিধ বিরোধীতার বীজভাণ্ডার আছে, একটুখানি ঠুনকো আঘাত দিলেই হয়ত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে টুকরো টুকরো বীজ ও তার দেহসম্ভার।

বুদ্ধিজীবীগণ বর্তমানে যে নাগরিক সমাজের অধীন কায়িক শ্রম ছাড়াই ননির ভেতর ডুবু ডুবু হয়ে ঘি দিয়ে কৈ ভেজে কৈয়ের ঘিয়ে লুটুপুটু খাইতেছে তাহাদের ওই লুটুপুটু আচরণের ভেতর দিয়ে বন্দুকের নল নয় দূরবীন দিয়ে দেখলে দেখা যায় কে প্রভু আর কে ওই প্রভুধীন। এদের আচরণের ভেতরও কৃষকচেতনা ও আধাসামন্ত প্রভুর চেতনা জ্বলজ্বল করে। এই শ্রেণি পরনির্ভর। শাহবাগ গণজাগরণে এদের মুখোশ খুলে পড়ছে।

আধাসমান্ত প্রভুধীন কৃষকসমাজের মধ্য থেকে উঠে আসা মুখোশ খুলে পড়া বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মধ্যেও কৃষকচেতনার টুকরো টাকরা রশ্মি এখন আর নেই বললেই চলে। এরা আধাসামন্ত কৃষকসমাজের লোকমানসের নানারকম উপাদানেই তৈরি, এসব বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মধ্যে এখন তীব্র ভাবে লক্ষ্য করা যায় সামন্তপ্রভুর চেহারা ও ক্ষমতার লোভ, এরা আর গণমানুষের প্রধান শক্তি যেই স্বাভাবিক নীতিবোধ, ন্যায়-অন্যায় বোধ তা থেকে বিচ্যুত। এরা এখন শাসক শ্রেণির পদতলে স্বপ্নাচ্ছন্ন। উক্ত বিচ্যুত বুদ্ধিজীবীগণেরও নীতিবোধ আছে তা কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বা যুক্তিশীলতার রীতি-নীতি দ্বারা বেষ্টিত না, জনমানসের সহজ-সরল জীবন শৈলীর সাথেও সম্পর্কযুক্ত না। এদের অবস্থান পুরোপুরি গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে।

উক্ত মুখোশ খুলে পড়া বুদ্ধিজীবীদের থেকে ভাগ হয়ে যাওয়া কিছু বুদ্ধজীবী এখনও আছে যাদের সাথে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার গভীর একটা সম্পর্ক জড়িত। এই সম্পর্ক প্রাত্যহিক জীবনযাপনের ফলে সৃষ্ট, এর প্রবাহমান স্রোতের গতিপথে পরিবর্তন ঘটলেও তা দীর্ঘতর মানবসম্পর্কের ছায়াতলে স্বাভাবিক ন্যায় ও অন্যায় চিহ্নিত করতে পারে। গণমানুষের আকাঙ্ক্ষায় ফাটল ধরাতে যদি কোন অদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাহলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অহিংস ও সহিংস প্রতিরোধের পন্থা জন্ম দিতে সক্ষম এরাও। এইসব বুদ্ধিজীবীরাও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছে গণজাগরণে সামিল হয়ে অহিংস পন্থায়। এদেরকে লাল সালাম।

মনোয়ার হোসেন : বার্তাবাংলার বিশেষ প্রতিনিধি ও লেখক

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »