ঢাকার টার্মিনাল-স্টেশনগুলোতে মানুষের ঢল

ঈদের আগে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শেষ হওয়ার পর থেকে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে রাজধানীর বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল ও রেল স্টেশনে।
বৃহস্পতিবার পেরিয়ে শুক্রবার সকাল থেকে রাজধানীর তিনটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর রেল স্টেশনে মানুষের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে।

এবার ঈদের সরকারি ছুটি ২৫ থেকে ২৭ জুন অর্থাৎ রোববার থেকে মঙ্গলবার। তার আগে দুদিন শুক্র আর শনিবার থাকায় কার্যত বৃহস্পতিবার বিকাল থেকেই শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা।

বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা সেতুতে যানজট দেখা গেলেও শুক্রবার ভোরে কমে এসেছিল। কিন্তু সকালে সেতুতে একটি ট্রাক বিকল হওয়ায় ফের লেগেছে জট।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজট পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি শেখ শরীফুল হাসান।

তিনি বেলা ১১টার দিকে বলেন, “মেঘনা ব্রিজের গোড়ায় এখন কমে হাফ কিলোমিটারের মতো জ্যাম আছে। এটাও কমে যাবে আশা করছি। আস্তে আস্তে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।”

মাওয়া মহাসড়কেও তেমন যানজট নেই বলে সায়েদাবাদ থেকে বরিশাল-খুলনা অঞ্চলগামী বাসগুলোর কাউন্টারকর্মীরা জানিয়েছেন।

উত্তরের পথে টাঙ্গাইলে মহাসড়কে গাড়িগুলোর গতি ধীর হওয়া ছাড়া আর তেমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। একইচিত্র মহাখালী থেকে ময়মনসিংহগামী বাসের ক্ষেত্রেও।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বিভিন্ন রুটের যানবাহনের ভিড় থাকলেও সকালে নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় তেমন যানজট দেখা যায়নি। মহাসড়কে ট্রাক, কভার্ড ভ্যান বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। সকালে ঢাকা বাইপাস সড়কে প্রচুর ট্রাক-কভার্ড ভ্যান চলতে দেখা গেছে।

সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালে ভিড় বাড়বে দুপুরের পর। দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চগুলো দুপুরের পর থেকে ঘাট ছাড়তে শুরু করবে।

বাস ছাড়ছে সময়ে, পথ নিয়ে শঙ্কা

টার্মিনালগুলো থেকে সকালে ঠিক সময়ে বাস ছেড়ে গেলেও রাস্তার যানজটের আশঙ্কা নিয়েই রওনা হয়েছেন যাত্রীরা।

গাবতলীর কয়েকজন কাউন্টার ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সকাল ৯টা পর্যন্ত তারা নির্ধারিত সময়ে বাসগুলো ছাড়তে পেরেছেন। তবে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলাচলে ধীরগতির কারণে পরে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এসআর ট্রাভেলেসের এজিএম টি আর প্লাবন বলেন, “আমাদের হাতে গাড়ি ছিল, সেগুলো সকাল ৯টা পর্যন্ত ঠিক সময়ে ছাড়তে পেরেছি। কিন্তু যানজটের কারণে গতকাল বিকালের দিকে যাওয়া গাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে। এরপর থেকে লেট হবে।”

তিনি বলেন, “আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, যমুনা ব্রিজ থেকে এদিকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত যানজট রয়েছে।”

রাস্তার যে যানজট সেটাকে স্বাভাবিক হিসাবে দেখছেন শ্যামলী পরিবহনের কল্যাণপুর কাউন্টারের ব্যবস্থাপক সেলিম শিকদার।

উত্তরবঙ্গমুখী বাসের এই কাউন্টার ব্যবস্থাপক বলেন, “ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজট যেটা আছে সেটা স্বাভাবিকই বলতে হবে। কালকের যাওয়া গাড়িগুলো অনেকটা ঠিক সময়ে ফিরে আসছে।

“রাস্তায় যে পরিস্থিতি আছে সেটা অন্যান্য সময়ের মতোই। রাস্তা একেবারে ক্লিয়ার না থাকলেও গাড়ি ভালোভাবে ফিরে আসছে। এটা বজায় থাকলে ঠিক সময়ে গাড়ি ছেড়ে যেতে পারবে।”

শ্যামলীর এই কাউন্টার থেকে নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, পাবনা রুটের গাড়ি ছাড়ে।

গাবতলী ও কল্যাণপুরের কাউন্টারগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, অগ্রিম টিকেটের যাত্রীরা সকাল থেকে ঠিক সময়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা করতে পেরেছেন। তবে অন্য কাউন্টারগুলোর সামনে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে অনেক।
ট্রেনের ছাদেও মানুষ

মঙ্গলবার সময়সূচি এলোমেলো হয়ে গেলেও পরদিনই সামলে ওঠেছিল রেলওয়ে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেও কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে ট্রেনগুলো মোটামুটি সময় ধরে ছাড়ছে।

যাত্রী সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিয়ম ভেঙে প্রায় সব ট্রেনের ছাদেই মানুষকে চড়তে দেখা গেছে।

কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, “সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ১৪টি ট্রেন ছেড়ে গেছে। অধিকাংশ ট্রেনে যাত্রীর প্রচণ্ড চাপ লক্ষ্য করা গেছে।”

এই সময় পর্যন্ত প্রায় সবগুলো ট্রেন নির্ধারিত সময়ে স্টেশন ছেড়ে যায় বলে তার দাবি; যদিও রংপুর এক্সপ্রেসকে নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পর ছাড়তে দেখা যায়।

তার আগে রংপুর এক্সপ্রেসের যাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরান আহমেদ বলেছিলেন, “আমাদের ট্রেন সকাল ৯টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা, ট্রেন প্লাটফর্মে এসেছে, কিন্তু প্রচণ্ড ভিড় দেখা যাচ্ছে। ভিড়ের কারণে ভোগান্তির আশঙ্কা করছি।”

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর উপ-পরিদর্শক (এসআই) সালাহ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, “গতকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুরের পর থেকে যাত্রী চাপ বেড়ে গেছে। এই চাপ সারা রাত ছিল, সকালের ট্রেনগুলোতে আরও বেড়েছে।”
একতা এক্সপ্রেসের যাত্রী মাদ্রাসা শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভোর বেলায় স্টেশনে এসেছি। ট্রেনগুলোতে ভিড় দেখা যাচ্ছে। যেভাবেই হোক বাড়ি যেতে হবে।”

তিনি একতা এক্সপ্রেসে করে সিরাজগঞ্জ নেমে তারপর বাসে করে বগুড়ায় গ্রামে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদ করতে যাচ্ছেন।

কমলাপুর রেলস্টেশনের আনসার কমান্ডার ইয়ার হোসেন বলেন, “ট্রেনগুলো সময়সূচি অনুসারেই ছেড়ে যাচ্ছে। তবে গত দুই দিনের চেয়ে আজ যাত্রীদের অনেক বেশি ভিড়।”

চাপ বেড়েছে সদরঘাটে

শুক্রবার সকালে সদরঘাটে লঞ্চ যাত্রীর চাপ দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা কমে যায়। দুপুরের পর আবার চাপ বাড়বে বলে ঘাট সংশ্লিষ্টরা জানান।

সাধারণত সকালে চাঁদপুরসহ নিকট গন্তব্যের লঞ্চগুলো ঢাকা ছেড়ে যায়। মাঝে বিরতির পর বিকালে শুরু হয় বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালীসহ দূর গন্তব্যের লঞ্চগুলোর যাত্রা।

বিআইডব্লিউটিএ’র পরিবহন পরিদর্শক (টিআই) হুমায়ূন কবির বলেন, ভোর থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত যাত্রীর চাপ ছিল।

সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৫টি লঞ্চ ছেড়ে যায় সদরঘাট থেকে। বৃহস্পতিবার সারাদিনে লঞ্চ ছেড়েছিল ৮২টি।

বরিশালগামী এমভি টিপু লঞ্চের কর্মী সুজন বলেন, “দুপুরের দিকে যাত্রী এমনিতেই কম থাকে। বিকালে যাত্রীর চাপে আপনারা (সাংবাদিক) পন্টুনে দাঁড়াতে পারবেন না।”

যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে ঘাটে পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. মওদুদ হাওলাদার।