বার্তাবাংলা ডেস্ক »

প্রতিকূল বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়া, সন্ত্রাসী হামলার আতঙ্ক। তবু থামল না বার্লিনে বিশ্ব-সংস্কৃতির মহা মিছিল। বার্লিনের রাস্তায় এত মানুষের ঢল সচরাচর দেখা যায় না। সেই ঘটনাই ঘটল বিশ্ব-সংস্কৃতির মহাযাত্রার ২২ বছর পূর্তির দিন। জার্মানিতে বসবাসরত নানা জাতি, সম্প্রদায় ও জার্মান সংস্কৃতিকে এক পথে বেঁধে দেওয়ার প্রয়াসেই এই আয়োজন।

ইউরোপে এই মুহূর্তে নানা সন্ত্রাসী হামলা আর জনবহুল আয়োজনে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও সাধারণ মানুষেরা রাস্তায় নেমে এর প্রতিবাদ করছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন। লন্ডন ব্রিজে সন্ত্রাসী হামলার এক দিন পর এই বিশাল অনুষ্ঠানে এক হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য এলাকাজুড়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। যখন সর্বত্র ধর্ম, বর্ণ ও আন্তসাংস্কৃতিক সম্পর্কের সংকট চলছে এবং বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান ঘটছে, তখন বার্লিনের এই মহা মিছিল এই সব বৈষম্যেরই প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ।
জার্মান ভাষায় এর পোশাকি নাম ‘কার্নিভ্যাল ডের কুলটুর’। দক্ষিণ এশিয়া তথা বাঙালি জাতিসত্তার অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ধারণাকে বার্লিনের এই সংস্কৃতির মহাযাত্রায় তুলে ধরতেই প্রবাসী বাঙালিরা দীর্ঘ দিন থেকেই এই মহাযাত্রার অন্যতম শরিক। আর এবারের যাত্রায় বাঙালিদের মূল বিষয় ছিল ‘বহু জাতি-ধর্মের বাংলাদেশ’। সেই ২০০২ সাল থেকেই প্রবাসী বাঙালিরা বার্লিনের বিশ্ব-সংস্কৃতির মহাযাত্রার সঙ্গী হয়েছেন।
বিশ্ব-সংস্কৃতির এই মহা মিছিলে নেমে এসেছে যেন সারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা জাতির ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি। কী নেই এই মহা মিছিলে! যেমন আছে দক্ষিণ ইউরোপের ব্রাজিল, পেরু, বলিভিয়ার অংশগ্রহণকারীরা, আছে আফ্রিকার নানা দেশ, আছে ক্যারিবীয় দেশের প্রতিনিধিরা, আছে এশিয়ার নানা দেশের সাংস্কৃতিক দল। সব থেকে বড় কথা, এই বিশ্ব মহা মিছিলে ছিল বাংলাদেশ আর বাঙালিদের সঙ্গে ছিল শুভানুধ্যায়ী জার্মানরা। বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ায় প্রতিবছরের মতো এবারও বার্লিন শহরের প্রাণকেন্দ্র ক্রয়েজবার্গের হারমান স্কয়ার থেকে ছয় কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে যেন বিশ্ব-সংস্কৃতির মেলা বসেছিল। সেই ১৯৯৫ সাল থেকেই এই মিছিলে অংশ নিয়ে আসছে জার্মানিতে বসবাসরত অভিবাসী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
৪ মে ২০১৭ বার্লিনের আকাশ ছিল বৃষ্টিস্নাত। তাপমাত্রা ছিল ১৭ সেলসিয়াস। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের বর্ণাঢ্য জমকালো পোশাক আর গান-বাজনার তালে বার্লিন হয়ে উঠেছিল ছন্দময় আর বর্ণিল।
প্রথম দিকে দক্ষিণ এশিয়া ফোরাম আর বিগত পাঁচ বছর থেকে বার্লিনের বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক ফোরামের উদ্যোগে সাফল্যের সঙ্গে বিশ্ব-সংস্কৃতির মহাযাত্রার সঙ্গী হয়েছেন প্রবাসীরা। জার্মানিতে এত বিশাল মানুষের উপস্থিতিতে এই ধরনের অনুষ্ঠান বিরল। এই বছরও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১৪ লাখ মানুষ হাজির হয়েছিলেন এই আন্তসাংস্কৃতিক মহাযাত্রার আয়োজন দেখতে। নানা সংস্কৃতির ৫৮টি দলের প্রায় চার হাজার অংশগ্রহণকারী তাদের স্ব স্ব সংস্কৃতি স্বকীয়তা নিয়ে আবারও জয় করল বার্লিনের রাজপথ।
প্রতিবছরের মতো এবারও বার্লিন এবং জার্মানির অন্য শহরগুলো থেকে আসা বাঙালিরা বার্লিনের রাস্তা কাঁপালেন। সামনে ছিল বিশাল ক্যানভাসে পালকি করে নববধূ বহন করার ছবি আর নানা ধরনের হস্তশিল্পের সমাহার। আর তার ঠিক পেছনে বাংলাদেশের নানা জাতিসত্তার প্রতীক হয়ে থাকা বর-বধূর পোশাকে ১০ জন ছেলেমেয়ে। সঙ্গে মেয়েরা শাড়ি পরে, কপালে টিপ দিয়ে, খোঁপায় নানা রঙের ফুল গুঁজে, আর ছেলেরা লুঙ্গি-ফতুয়া ও মাথায় গামছা বেঁধে যখন কার্নিভ্যালের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন রাস্তার দুপাশে লাখো মানুষ করতালি দিয়ে আর চিৎকার করে সমস্বরে তাদের অভিনন্দন জানায়।
এই কার্নিভালকে নিয়ে বার্লিনে বসবাসকারী বাঙালিদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা বাঙালিদের উৎসাহ কম ছিল না। বিশ্ব-সংস্কৃতির এই মহা মিছিলে বাংলাদেশে নানা ধর্ম আর জাতিসত্তার পোশাকে বর-বধূ সেজেছিলেন অপূর্ব, আনা, অনিন্দ্য, তন্বী, রাবেয়া, কৌশিক, সারা, সুকী, রাসেল আর রাধিতা।
সঙ্গে আরও ছিলেন নুরী, লিপি, হেলেন, শাহেদা, নদী, জেসী, লিমন, শারুল, পৃথিবী, নিশু, পিয়া, গেরেলমা, সানজিদা, মিশাইলা, মিরিয়াম, উলরিখে ও নীলা। উৎসবের অনাবিল আনন্দে সবাই খুশি।
এই কার্নিভ্যালে বার্লিনে বাঙালিদের সংগঠন বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক ফোরামের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব পালন করেছেন বার্লিনপ্রবাসী খালেদ নোমান নমি, সৈয়দ বাবুল, মাসুদ হোসেন, মামুন আহসান খান, মিলন আল মামুন, লুৎফুল খান, মকসুদুল হক ও রতন। তাঁরা জানালেন, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি ও বাংলাদেশে বসবাসকারী নানা জাতি-সম্প্রদায়ের অবস্থানকে বিদেশে তুলে ধরতেই আমাদের এই প্রয়াস।
আশা রইবে, প্রবাসী এই সব বন্ধুর প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতেও বার্লিনের রাস্তায় বাঙালি সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য আরও উজ্জ্বল হবে। আর বার্লিনের পথে গ্রন্থিত হবে নানা জাত আর সংস্কৃতির মিলন মেলায়।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »