চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে

রাজধানীর হাতিরপুলে লন্ড্রির দোকান আছে মো. শাহীনের। সাত দিন তীব্র জ্বরে ভুগেছেন তিনি। শরীরের গিরায় গিরায় ছিল প্রচণ্ড ব্যথা। শাহীনের কথায়, ‘কেউ পিডাইলেও মনে হয় এত ব্যথা করে না।’ পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে জানতে পারেন তাঁর চিকুনগুনিয়া হয়েছে। জ্বর এখন কমে গেলেও ব্যথা কমেনি, শরীরও খুব দুর্বল।

গত এক মাসে ঢাকায় চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশ বেড়েছে। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। উপসর্গের দিক থেকে ডেঙ্গুর সঙ্গে এর বেশ মিল রয়েছে। দুই রোগেরই জীবাণুবাহী মশা এডিস। তবে ডেঙ্গু মূলত হেমোরেজিক জ্বর। এতে রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু চিকুনগুনিয়া তা নয়। চিকুনগুনিয়াতে মূলত শরীরের গিরা ও মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং ত্বকে লাল রঙের র‍্যাশ দেখা দেয়। এ রোগে জ্বরের তীব্রতা থাকে বেশি।

চিকুনগুনিয়া শব্দটি এসেছে পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কিমাকোন্দে ভাষা থেকে। এর অর্থ বাঁকা হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে একে ল্যাংড়া জ্বরও বলা হয়। কারণ, এতে আক্রান্ত রোগীর ঘাড়, পিঠ, মাজায় এত তীব্র ব্যথা হয় যে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও কষ্ট হয়। তখন কেউ কেউ খুঁড়িয়ে বা বাঁকা হয়ে হাঁটতে বাধ্য হন। চিকুনগুনিয়ার রোগী সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনে সেরে ওঠেন।

ফার্মগেটের মণিপুরিপাড়ায় থাকেন হালিমা খাতুন। তিনি পেশায় একজন গৃহকর্মী। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এখন কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর বাসায় আলো-বাতাস ঢোকে কম, কিছুটা স্যাঁতসেঁতে। মশা আছে বেশ। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে ১০৪ ডিগ্রি জ্বরে ভুগছেন। শরীরে র‍্যাশ হয়েছে। আর জয়েন্ট পেইন বা হাড়ের জোড়ায় ব্যথা তো আছেই। তাঁর কথায়, শরীরের ব্যথাই ভোগাচ্ছে বেশি।

চিকিৎসকেরা বলছেন, চিকুনগুনিয়া রোগের চিকিৎসায় প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ ছাড়া আর কোনো পথ্য নেই। জ্বর ও ব্যথা কমাতে এটি সাহায্য করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. শহিদুল বাশার বলেন, প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। প্রচুর পানীয় পান করতে হবে। ত্বকের র‍্যাশ ধীরে ধীরে কমে যাবে। ব্যথা ও র‍্যাশ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুঝুঁকি প্রায় নেই বলেই জানান তিনি।

ধানমন্ডি এলাকার ব্যবসায়ী শওকত ইসলামের জ্বর কমে গিয়েছিল চার-পাঁচ দিনেই। তবে ১৫ দিন পরও দুর্বলতা অনুভব করছিলেন তিনি।

দুর্বলতা প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিনের অধ্যাপক মো. শহিদুল বাশার বলেন, দুর্বলতা কাটাতে বেশি করে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। আক্রান্ত রোগী থেকে মশার মাধ্যমে যেন রোগ ছড়াতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ জন্য রোগীকে আলাদা রাখতে হবে। মশা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যথা বেশি হলে হাসপাতালে আনা যেতে পারে। তবে বাড়িতেই এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব। পর্যাপ্ত বিশ্রামে থাকতে হবে রোগীকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ছড়ায় বেশি। ঘরের মধ্যে এই মশা সাধারণত কামড়ায় না। বাইরে অন্ধকার স্থানে ভোর ও সন্ধ্যার দিকে বেশি কামড়ায়। চিকুনগুনিয়ার বিস্তার কমাতে হলে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।