মুহুর্মুহু গুলি-বোমা বিস্ফোরণের শব্দ

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা ৩০ ঘণ্টা ঘিরে রাখার পর সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত অভিযান শুরুর পাঁচ ঘণ্টা পর মুহুর্মুহু গুলির শব্দ পাওয়া গেছে।
ওই দুটি ভবনে শনিবার সকাল ৯টায় সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন অভিযান শুরু করে, যেখানে এক জঙ্গি দম্পতি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এলাকাটি ঘিরে রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত অভিযান শুরুর আগে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপস্থিত সংবাদকর্মীসহ সবাইকে এক কিলোমিটার দূরে সরে যেতে বলা হয়।

দুপুর ২টার আগ পর্যন্ত দুই বার গুলির শব্দ পাওয়া গেলেও দুপুর ২টা থেকে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ২টা ৭ ও ২টা ১০ মিনিটে দুটি বোমা বিস্ফোরণের শব্দও পাওয়া যায়। বিকট শব্দ শুনে বাইরে অবস্থানরত পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো গ্রেনেড হতে পারে।

দুপুর ১২টা পর্যন্ত অর্ধ শতাধিক ব্যক্তিকে বের করে আনা হয় ভেতর থেকে, যারা বৃহস্পতিবার থেকে সেখানে আটকা পড়েন। দুপুর ২টার আগে মোট ৭৬ জনকে বের করে আনা হয়। তাদের কাছের একটি ভবনে জড়ো করে রাখা হয়েছে।

ওই দুই বাড়ির মধ্যে পাঁচতলা ভবনটিতে ৩০টি ফ্ল্যাটে সমান সংখ্যক পরিবারের বসবাস। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মধ্যে বাকি পরিবারগুলো কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েন।

২টায় গুলি-বোমার আওয়াজ শোনার আগে একটি অ্যাম্বুলেন্সকে পুলিশ বেষ্টনি অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকতে দেখা গেছে।

ভেতরের অবস্থা বিষয়ে আর কিছু জানা যায়নি। সেনাবাহিনী কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও সাংবাদিকদের কিছু বলেননি।

টান টান উত্তেজনার মধ্যে একটি দিন ও একটি রাত পার করে চূড়ান্ত অভিযান শুরুর আগে শনিবার সকালে বন্ধ করে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ। ফায়ার ব্রিগেডের দুটি গাড়ি রাতেই ঘটনাস্থলে এনে রাখা হয়েছিল। সকালে সাঁজোয়া যান ও অ্যাম্বুলেন্স দেখা যায়।

অভিযানের খবর সরাসরি সম্প্রচার না করতে আইএসপিআরের পক্ষ থেকে সংবাদ মাধ্যমকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সেনাবাহিনী এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’; এর আগে ঘটনাস্থলে কাজ করে আসা সোয়াট এই অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন স্প্রিং রেইন’।

বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি দুটি ঘিরে চূড়ান্ত অভিযান শুরুর আধা ঘণ্টা পর সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, “সেনাবাহিনী এই অভিযান চালাচ্ছে। সোয়াট শুধু সহায়তা করছে।”

আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদুল হাসান বলেন, “সিলেটে জঙ্গি আস্তানায় অপারেশন টোয়াইলাইট পরিচালনা করছে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন।”

শিববাড়ি পাঠানপাড়া এলাকায় এক ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন পাঁচতলা ও চারতলা পাশাপাশি দুটি ভবন ঘিরে বৃহস্পতিবার রাত ৩টা থেকে এই অভিযানের সূচনা।

দুটি ভবনের একটিতে জঙ্গিদের অবস্থানের তথ্য পেয়ে সিলেট নগর পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা এলাকাটি ঘিরে ফেললে শুরু হয় বোমাবাজি ও গুলি। শুক্রবার বিকালে ঢাকা থেকে এসে পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় সোয়াটের একটি দল।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলামও মধ্যরাতের পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান।

সেনাবাহিনীর একটি প্যারা-কমান্ডো দল রাতে ঘটনাস্থলে যায়। সকালে আরেকটি দল যাওয়ার পর অভিযানের নেতৃত্বে হাতবদল হয়।

ওই দুই বাড়ির মধ্যে পাঁচ তলা ভবনের নিচতলার একটি বাসায় জঙ্গিরা আস্তানা গেড়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ওই আস্তানায় অন্তত একজন নারী ও একজন পুরুষ জঙ্গি রয়েছেন বলে তারা ধারণা করছেন। কাউছার আলী ও মর্জিনা বেগম নামে ওই দুইজন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন কয়েক মাস আগে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার দুপুরে হ্যান্ড মাইকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও জঙ্গিরা তাতে সাড়া দেয়নি। বরং জানালা ফাঁক করে তারা পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি সোয়াট পাঠাতে বলে।

দুই সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এক বাড়ি ঘিরে চালানো অভিযানের মত সিলেটেও জেনারেটর বসিয়ে ঘটনাস্থল আলোকিত করে রাখা হয় সারা রাত। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এনে রাখাসহ অন্যান্য প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে দেখা যায়।

একজন সোয়াট সদস্য বলেন, বাসার ভেতরে জঙ্গিরা শক্তিশালী বোমা রেখেছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। এ কারণেই চূড়ান্ত অভিযানে যাওয়ার আগে সময় নেওয়া হয়।