ভারতে নতুন সেনাপ্রধান নিয়ে বিতর্ক

জ্যেষ্ঠ দুজন সেনা কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিপিন রাওয়াতকে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ দেওয়ায় ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে শনিবার সেনাবাহিনীর উপপ্রধান রাওয়াতকে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ দেয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বর তার দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার কথা।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্রাভিন বকশি এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান পিএম হারিজের সেনাবাহিনীতে চাকরির বয়স রাওয়াতের চেয়ে বেশি।

ভারতে সাধারণত জ্যেষ্ঠ জেনারেলকেই সেনাপ্রধান করা হয়।

সর্বশেষ ৩৩ বছর আগে ১৯৮৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সর্বশেষ সেনাপ্রধান নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করেছিলেন বলে এনডিটিভির ভাষ্য। তখন প্রথা ভেঙে জেনারেল এস কে সিনহাকে এড়িয়ে জেনারেল এ এস বৈদ্যকে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল।

রাওয়াতকে সেনাপ্রধান নিয়োগের সমালোচনা করে বিরোধী কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট বলছে, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ এই নিয়োগ দিয়েছে নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার।

একে ‘প্রতিষ্ঠান নিয়ে খেলা’ আখ্যা দিয়ে কংগ্রেস নেতা মনীষ তিওয়ারি রোববার বলেন, সরকার সেনাবাহিনীতে রাজনীতি করছে।

‘হুজুগের বশে’ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা ‘বিস্ময়কর’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যা দাবি করে প্রধান বিরোধী দলের এই নেতা বলেন, “সেনাবাহিনীকে কেন শীর্ষ পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় ‘রক্তক্ষরণের’ মধ্য দিয়ে যেতে হবে? যদি তা করা হয় তাহলে তার কারণ জনম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।”

সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিপিআই নেতা ডি রাজা বলেন, “সেনাবাহিনীতে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, আগেই বিচার বিভাগে নিয়োগ বিতর্কিত হয়েছে, সিভিসি, সিবিআই পরিচালক এবং কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনে নিয়োগ-শীর্ষ পর্যায়ের সব নিয়োগই খুব বিতর্কিত হচ্ছে।”

এ বিষয়ে বিজেপির ন্যাশনাল সেক্রেটারি শ্রীকান্ত শর্মা বলেছেন, সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ পাঁচজন কর্মকর্তার মধ্য থেকে নতুন সেনাপ্রধানকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যিনি সব দিক দিয়ে দক্ষ।

বিপিন রাওয়াতের নিয়োগকে নেতিবাচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক’ চেহারা দিয়ে কংগ্রেস ধারাবাহিক নির্বাচনী ব্যর্থতার ‘হতাশার’ বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে বলে সমালোচনা করেন ভারতের ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা।

বিষয়টি নিয়ে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যেও নানা মত দেখা দিয়েছে।

এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী এনডিটিভিকে বলেন, সেনাপ্রধানের যে ধরনের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন বিপিন রাওয়াতের তা আছে বলে তিনি মনে করেন না।

“এই নিয়োগ পুরো সেনাবাহিনীতে কী প্রভাব ফেলবে সেটা নিয়ে আমি হতাশ ও উদ্বিগ্ন।”

তিনি বলেন, “যদিও সেনাপ্রধান নিয়োগ দেওয়ার অধিকার শুধু সরকারের তারপরও এই সিদ্ধান্ত বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের সূচনা করেছে, যা সেনাবাহিনীর মধ্যে বড় ধরনের বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে।”

তার সঙ্গে দ্বিমত জানিয়ে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল সৈয়দ আতা হাসনাইন বলেন, “আমি শুধু সর্বোচ্চ পদ থেকে সেনাপ্রধান বেছে নেওয়ার পক্ষে। এটা নিয়ে রাজনীতির কিছু নেই। ভারতীয় সেনাবাহিনী রাজনীতির ঊর্ধ্বে।”

এই বিতর্কের বিষয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কিছু বলা হয়নি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেনা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনডিটিভি বলছে, উত্তরে পুনর্গঠিত সেনাবাহিনী, পশ্চিম থেকে ধারাবাহিক সন্ত্রাসবাদ ও ‘প্রক্সি ওয়ার’ এবং উত্তরপূর্বের পরিস্থিতি-সব মিলিয়ে অপারেশনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে দরকার।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাওয়াত সংঘাতময় এলাকাগুলোতে অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন এবং গত তিন দশক ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছেন তিনি।

পাকিস্তানের সঙ্গে লাইন অব কন্ট্রোল (এলওসি), চীনের সঙ্গে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) এবং উত্তরপূর্ব ভারতসহ অনেক এলাকায় রাওয়াত বিভিন্ন ‘অপারেশনাল’ দায়িত্ব সামলেছেন। বিদ্রোহী দমন অভিযানেও ১০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

দক্ষিণাঞ্চলীয় আর্মি কমান্ডের জিওসি হিসেবে পশ্চিম সীমান্তকে (পাকিস্তান) গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা সাজান বিপিন রাওয়াত। অন্য দুটি বাহিনীকেও এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি।

এছাড়া সৈনিকদের প্রতি আচরণ, সমবেদনা এবং সুশীল সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যও পরিচিতি রয়েছে তার।