সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূ‍লীয় অঞ্চলে বিপজ্জনক জাহাজ ভাঙা শিল্প

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপক‚লীয় অঞ্চলে বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা ‘শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড’ বা জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে তেমনি এ অঞ্চলে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণের জন্য অনেকাংশে দায়ী। বাংলাদেশে রডের বিশাল চাহিদা রয়েছে। সেই রড প্রস্তুত করার জন্য বিপুল পরিমাণ লোহার প্রয়োজন হয়। তার অনেকটাই জোগান দেয় এ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। আর এ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ঘিরে কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থানও জড়িত। কিন্তু সুষ্ঠু পরিবেশগত প্রক্রিয়া মেনে, দুর্ঘটনা রোধ করে , শ্রমিক স্বার্থ ও স্বাস্থ্যসহ অন্য বিষয় মেনে এ শিল্পটিকে দেশের অন্য আর ১০টি উপকারী অর্থকরী শিল্পের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কারোই তেমন কোনো গরজ দেখা যায়নি। এর ফলে প্রতিবছরই এসব ইয়ার্ডে সনাতনী পদ্ধতিতে জাহাজ কাটতে গিয়ে বিস্ফোরণ, বিষাক্ত গ্যাসে দমবন্ধ হয়ে, লোহার পাত পড়ে প্রাণ হারায় অনেকে মানুষ। আর এ ছাড়া শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সারসহ নানা ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি তো আছেই। পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেক শ্রমিক। ধ্বংস হয়েছে ওই এলাকার দীর্ঘ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, দূষিত হচ্ছে বঙ্গোপসাগর, হারিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতির মাছসহ জলজপ্রাণী। পরিবেশবাদীদের মতে, ভয়ংকর এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে এই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। কিন্তু জাহাজ ভাঙা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা রোধ, পরিবেশ দূষণ এসব নিয়ে কথা বললেই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকপক্ষ সমস্বরে তাদের ভাষায় ‘কিছু এনজিও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও শিপ ব্রেকিং শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে’র গন্ধ খোঁজেন। সম্প্রতি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকরা শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে জাহাজ কাটার অনুমতিপত্রকেই তাদের সর্বোচ্চ ‘ফরমান’ হিসেবে দেখিয়ে অন্যসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে।

সবকিছুই চলে ‘ম্যানেজ’ প্রত্রিয়ায় : অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘এমটি প্রডিউসর’ নামে একটি অয়েল ট্যাংকার নিয়ে ব্যাপক আলোচনার-সমালোচনার পর বাংলাদেশের এ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড আবার যেন আলোচনায় চলে আসে। অভিযোগ রয়েছে ওই জাহাজটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেই বাংলাদেশে সীতাকুণ্ডের একটি ইয়ার্ডে কাটা হচ্ছে। চট্টগ্রামের অন্যতম এক শিল্পপতির মালিকানাধীন এই জাহাজটিতে তেজস্ক্রিয়তা ও ক্ষতিকর বর্জ্য রয়েছে এমন অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী কয়েকটি সংগঠন। এ নিয়ে ইতোমধ্যে গত ২ নভেম্বর ভোরের কাগজসহ আরো কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এরপর ওই জাহাজে তেজস্ক্রিয়তা ও ক্ষতিকর বর্জ্য রয়েছে কিনা তা তদন্তের জন্য বিভিন্ন সরকারি বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। যারা ইতোমধ্যেই ইয়ার্ডে গিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছেন এবং অল্প কিছু দিনের মধ্যেই এ ব্যাপারে রিপোর্ট দেবেন বলে জানা গেছে।
তবে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেল, এখানে সবকিছুই চলে ম্যানেজ প্রক্রিয়ায়। এ ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় যারা রাজি থাকেন না তাদের জন্য অনেক ধরনের দুর্ভোগ-সমস্যাও তৈরি হয় বলে জানা গেছে। অথচ পরিত্যক্ত জাহাজ কাটার ক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে পরিবেশ আইন অনুযায়ী। কিন্তু এসবের খোড়াই কেয়ার করেন জাহাজ ভাঙা মালিকরা। তারা শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে জাহাজ কাটার অনুমতি নিয়েই অন্য কাউকে পাত্তা না দিয়ে জাহাজ ভাঙা শুরু করে দেন। চট্টগ্রামে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এ প্রতিবেদককে বলেছেন, এটি আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। যেসব ইয়ার্ড মালিক আইন মানবেন না তাদের বিরুদ্ধে পরিবশে অধিদপ্তর থেকে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বেশি জাহাজ এখন ইয়ার্ডে : চট্টগ্রামের ৬০টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ বছরই এসেছে ১৯০টি পুরাতন পরিত্যক্ত জাহাজ। কয়েক দিন আগ পর্যন্ত মাত্র ১২টি জাহাজের পরিবশেগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছিল। তার মানে জাহাজ মালিকদের অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা অনেক বেশি এ ক্ষেত্রে তা সহজেই অনুমান করা যায়। যদিও পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক রয়েছে পরিবেশ আইনে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়েই মূলত মালিকরা আর কারো তোয়াক্কা না করে জাহাজ কেটে অধিক পরিমাণ লাভ করতে পারাতে তারা বেশি পরিমাণে ঝুঁকে পড়েছেন এদিকে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলাধীন মাদাম বিবির হাট, কুমিরা, ভাটিয়ারি, সোনাইছড়ি, জাহানাবাদ, কদমরসূল, বাঁশবাড়িয়া উপক‚লজুড়ে চালু থাকা ৬০টি ইয়ার্ডে এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কাটার জন্য এসেছে ১৯০টি পরিত্যক্ত জাহাজ। এর মধ্যে মাত্র ১২টি জাহাজের জন্য মালিকরা পরিবেশ ছাড়পত্রের আবেদন করেছেন বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যালয়ের পরিদর্শক হারুনুর রশিদ খানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জলসীমায় পরিত্যক্ত জাহাজ আসার পর বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রতিবেদন দিলে শিল্প মন্ত্রণালয় তা কাটার অনুমতি দেয়। এরপর ইয়ার্ডে থাকা জাহাজ কাটা শুরুর আগে ‘বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজ ভাঙা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১১’ এর ১৯ (১) বিধি অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হয়। পরিত্যক্ত জাহাজের রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া এবং বর্জ্য, বিশেষ করে অ্যাজবেস্টস, গ্যাসহোল, লুব্রিক্যান্ট ওয়েলসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত বিবরণ ওই ছাড়পত্রের আবেদনে উল্লেখ করতে হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, পরিবেশ ছাড়পত্রের আবেদন না করেই অধিকাংশ জাহাজের কোনোটি পুরোপুরি, কোনোটির ২০ থেকে ৮০ শতাংশ কেটে ফেলা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ইয়ার্ড মালিকরা শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে ভাঙার অনুমতি পেলে আর পরিবেশ ছাড়পত্রের তোয়াক্কা করেন না। অথচ আমদের পক্ষ থেকে ইয়ার্ড মালিকদের জাহাজ ভাঙার আগে নিয়ম মেনে ছাড়পত্রের আবেদন করতে চিঠি দেয়া হয়। অবশ্য এর মধ্যে কিছু কিছু ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে আবেদনপত্র জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি : চট্টগ্রামে জাহাজ ভাঙার কাজটি প্রথম থেকেই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে। উন্নত বিশ্বে যেখানে পরিবেশবান্ধব উপায়ে জাহাজ ভাঙা হচ্ছে, সেখানে এ দেশে জাহাজ ভাঙা হচ্ছে সনাতনী বিচিং পদ্ধতিতে। এটি মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত। তবে বিচিং পদ্ধতিতে জাহাজ ভাঙাতে খরচ হয় অনেক কম। এ পদ্ধতিতে জোয়ারের সময় জাহাজে থাকা দূষিত পদার্থ সহজেই সমুদ্রের পানিতে মিশে যায়। কিছু কিছু ইয়ার্ড মালিক বেশি লাভের লোভে কম দামে কিনে আনে ‘ডার্টি শিপ’ বা বিপজ্জনক জাহাজ। গ্যাস ফ্রি করা ছাড়া এসব জাহাজ কাটার ফলে ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব জাহাজ থেকে নির্গত বর্জ্য, সব ধরনের পেট্রোলিয়াম ও বিষাক্ত তেল বঙ্গোপসাগরের মৎস্য সম্পদের ক্ষতিসহ মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। দূষণের কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে জাহাজ ভাঙা শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
কয়েকটি গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, জাহাজে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ সিসা, পারদ, ক্রোমাইটস ইত্যাদি বায়ু ও পানি দূষণ করছে। এ ছাড়া জাহাজে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান এসবেস্টস নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৫০ ভাগ বেশি থাকে। এখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জেলেরা। পানি দূষণে মাছ কমে গেছে। পানির তীব্র গন্ধে মাছেরা তাদের আবাস পরিবর্তন করেছে। জাহাজ ভাঙার কারণে ধ্বংস হচ্ছে এখানকার জীববৈচিত্র্য। শুধু তাই নয় এ অঞ্চলের সমুদ্র উপক‚লে ছিল প্রচুর ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট যা ঝড়-জলোচ্ছ¡াস ও ঘূর্ণিঝড় থেকে এলাকার জনপদকে রক্ষা করতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেসব ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ধ্বংস করেছেন এসব শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকরা।

এভাবে জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত অঞ্চল থেকে মাটি সরে আসায় ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। জাহাজ ভাঙার পরিবেশগত সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শব্দ দূষণ ও কম্পন। এ শিল্পের বৈশিষ্ট্য বা ধরনই বলে দেয় এখানে শব্দ দূষণ ও কম্পন নিয়মিত ঘটনা। প্রতিনিয়ত লোহার প্লেটগুলো কাটা, লোড-আনলোড এবং জাহাজের কাটা অংশ তীরে টেনে আনার সময় শব্দ দূষণ সৃষ্টি করে প্রতিনিয়ত। যা এ এলাকার বাসিন্দারদের জন্য নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে।

শব্দ দূষণে শিশু ও বৃদ্ধরা প্রায়ই আতঙ্কিত হন। ব্যাহত করে স্কুল-কলেজের পাঠদান। শব্দ দূষণের আরেকটি বড় সমস্যা হলো পর্দা (লোহার বিশাল আকৃতির পাত) পড়া। কম্পন ও বিস্ফোরণজনিত কারণে এলাকা কেঁপে উঠে। প্রায়ই শিপ ইয়ার্ডে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হয়। এ শব্দে ভূকম্পন সৃষ্টি হয় এবং সৃষ্টি করে আতঙ্ক। স্থানীয় সমাজ উন্নয়ন সংগঠন ইপসা এক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, এখানে প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয়ার জন্য জাহাজ ভাঙার দূষণ বহুলাংশে দায়ী। ইপসার সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মুহাম্মদ আলী শাহীন ভোরের কাগজকে বলেছেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে শিপ ব্রেকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তাই সুপরিকল্পিত নীতিমালার মধ্য দিয়ে পরিবেশ সম্মতভাবে-শ্রমবান্ধব শিল্প তৈরি হোক। কিন্তু তা কোনো অবস্থাতেই শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘন ও পরিবেশ দূষণ করে নয়।

গড়ে উঠেছে একটি বিশাল সিন্ডিকেট চক্র : সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপক‚লে বৈধ-অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কতৃত্ব-দখল-বেদখল, আধিপত্য বজায় রাখার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে ব্যবসায়ী-প্রশাসন-রাজনীতিবিদ-সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ ও সাংবাদিক নামধারীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু সিন্ডিকেট চক্র ঠিকই থাকে, হয়তো রঙ বদলায় মাত্র।

অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন সময়ে যেসব দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহত হয়, ইয়ার্ডের মালিকরা প্রায় সময় এসব দুর্ঘটনা আড়ালের চেষ্টা করেন। গোপন করেন নিহত ও আহত হওয়ার প্রকৃত তথ্য। সুযোগ বুঝে শ্রমিকের মৃতদেহ গায়েব করতেও দ্বিধা করেন না তারা। দুই-তিন একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠে এক-একটি শিপইয়ার্ড। বিশাল এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে থাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে বাইরের সাধারণ মানুষের তা জানার কোনো সুযোগ থাকে না। তবে জাহাজ কাটার সময় ট্যাংকার বিস্ফোরণ, জাহাজে আগুন ধরে দুর্ঘটনা ঘটলে আশপাশের লোকজন দুর্ঘটনা সম্পর্কে কিছুটা তথ্য নানাভাবে জানতে পারে। কোনো সংবাদকর্মীও যদি কোনো শিপ ইয়ার্ডে প্রবেশ করার জন্য শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের কাছে অনুমতি চান তাহলে তার জন্য নানা ধরনের ধানাই-পানাই চলতে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা খুব কঠিন হয়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে প্রচার রয়েছে, সীতাকুণ্ডে ১ লাশ ৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ কোনো দুর্ঘটনায় কোনো শ্রমিক মারা গেলে তার মৃতদেহ গোপন করার জন্য পুলিশ-স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক হোমড়া-চোমরাদের জন্য এই টাকা বরাদ্দ রাখতে হয়। তবে তথ্য গোপনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সম্প্রতি বিতর্কিত অয়েল ট্যাংকার ‘এমটি প্রডিউসর’ এর আমদানিকারক শিল্পপতি ইয়াছিন আলী। তিনি ভোরের কাগজের এ প্রতিবেদকের কাছে বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, ‘দুর্ঘটনা কোথায় হয় না? সড়কে-মহাসড়কে দুর্ঘটনা হয় না? ফ্যাক্টরিতে দুর্ঘটনা হয় না? সেখানে মানুষ মারা যায় না? তাহলে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডেও দুর্ঘটনা ঘটে, মানুষ আহত-নিহত হয় স্বাভাবিকভাবে, এটিকে গোপন করার কোনো কারণ আছে বলে তো মনে হয় না। তিনি বাংলাদেশে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ব্যবসা নিয়ে দেশি-বিদেশি কিছু এনজিও অপপ্রচার ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।

মৃত্যু-পঙ্গুত্বের মিছিল বাড়ছেই : গুজরাট আর চট্টগ্রামের পার্থক্য : জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে শ্রমিক কর্মচারী প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন যাদের অধিকাংশই দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে আসেন। চাকরির নেই কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা, নেই কোনো বাসস্থানের ঠিকানা, পুষ্টিকর খাবার তো দূরের কথা, পেটভরে খাবারের ব্যবস্থা করতেই তাদের নাভিশ্বাস ওঠে প্রতিনিয়ত। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলী শাহীন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, গত ২০ বছরে কমপক্ষে ৭০০ অধিক শ্রমিক মারা গেছেন, গুরুতর আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ হাজার। আবার অনেকে এখানে কাজ করতে এসে বিভিণœ রোগাক্রান্ত হয়ে পরবর্তী সময়ে মারা গেছেন, কিন্তু তাদের হিসেব তো আমরা কেউ করিনি।

এ ছাড়া জাহাজের বিভিন্ন রাসায়নিক বিষাক্ত তরল পদার্থের সংস্পর্শে থাকতে থাকতে শ্রমিকরা ক্যান্সারসহ মারাত্মক সব রোগে আক্রান্ত হয়েও মারা যাচ্ছে। দুর্ঘটনার বাইরে বিষাক্ত উপাদানের কারণে সৃষ্ট অসুখে মারা যাওয়া শ্রমিকদের পরিসংখ্যান পুরোপুরি অজানা। চট্টগ্রামের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে কর্মরত অবস্থায় নিহত-আহত শ্রমিকদের পরিবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না। দেয়া হয় না আহতদের জন্য চিকিৎসা সুবিধাও। শ্রম আদালতে মামলা করে কেউ কেউ কিছু ক্ষতিপূরণ আদায়ে সক্ষম হলেও বেশির ভাগ শ্রমিক মামলা-সংক্রান্ত ঝামেলায় যেতে চায় না।

বর্তমানে বিশ্বে জাহাজ ভাঙা শিল্পে ভারতের অবস্থান প্রথম। ভারত সরকার গুজরাট মেরিটাইম বোর্ড (জিএমবি) নামের একটি বিশেষ পরিষদ গঠন করেছে যেটি সব জাহাজ ভাঙা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এই বোর্ড কে দুটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, একটি হলো শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা এবং শ্রমিকদের জন্য আবাসন, গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপ লাইন স্থাপন। ১৯৯০ সালের পূর্বে জিএমবি ওই জাহাজ আমদানিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল তখন বোর্ড নিজেই জাহাজ ক্রয় করে শিপ ব্রেকারদের নিকট বিক্রয় করতো। ৯০ এর পরে বোর্ড জাহাজ ক্রয়ে আর প্রত্যক্ষ ভূমিক রাখে না। এখন শিপ ব্রেকাররা নিজেরাই বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জাহাজ ক্রয় করে থাকে।

ভারতে ২০০৩ এর শেষের দিক হতে শ্রমিকদের জন্য একটি ট্রেনিং এবং ওয়েলফেয়ার সেন্টার গঠন করা হয়েছে। এখানে শ্রমিকদেরকে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। এই ট্রেনিং সেন্টারে তিন ধরনের ট্রেনিং দেয়া হয়। এসব ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিকরা পূর্বসতর্কতা পেয়ে থাকে। ভারতের প্রায় সব শিপ ইয়ার্ডে শ্রমিকদের জীবন বিমা করা আছে। এর ফলে যে কোনো দুর্ঘটনার পরে আহত বা নিহত হলে তারা একটি ভালো পরিমাণের ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকে।

শ্রমিক আহত হলে শিপ ইয়ার্ড মালিক সব চিকিৎসা সহযোগিতা করে থাকে। নিহত হলে শ্রমিকদের পরিবারকে ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। ভারতের শিপ ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকদের হেলমেট, বুট, মোটা কাপড়, চশমা প্রভৃতি ব্যবহারের জন্য কিছু নিয়মনীতি আছে। এ ছাড়া ভারতের সুপ্রিম কোর্ট শিপ ইয়ার্ডে সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীদের প্রবেশের জন্য একটি রুল জারি করেছে।
অ্যালাং এ শ্রমিকদের জন্য হেলথ কার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে, যেটির মাধ্যমে তারা সহজেই স্বাস্থ্য সেবা পেতে পারে।

এ ছাড়া অ্যালাং শিপ ইয়ার্ড এলাকার পাশেই কয়েকটি হাসপাতাল রয়েছে। গুজরাটে ভাঙার জন্য আমদানিকৃত জাহাজের বর্জ্য ও বিষাক্ত দ্রব্যাদি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষ ধরনের ইয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। জাহাজের বর্জ্যগুলো এ ইয়ার্ডে নিয়ে এসে বিশাল আকৃতির গর্তের মধ্যে পুঁতে ফেলা হয়। এর ফলে সমুদ্রের পানি দূষণ হতে রক্ষা পায়। তৈলবাহী জাহাজগুলোতে অপেক্ষাকৃত অধিক বিষাক্ত বর্জ্য থাকায় ভারতের শিপ ইয়ার্ডে ওয়েল টেংকার ভাঙা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অ্যালাং ভাঙার জন্য শুধু যাত্রীবাহী জাহাজ আমদানি করা হয়। এসব সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশে প্রয়োগ ব্যয়সাধ্য বা কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়, সরকারের সদিচ্ছা বা অতি মুনাফা অর্জনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। অতি দ্রুত পদক্ষেপ দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে কারণ শিপ ব্রেকিং বন্ধ হলে স্তব্ধ হয়ে যাবে উন্নয়ন ও নির্মাণ কর্মকাণ্ড লৌহজাত দ্রব্যের স্বল্পতায়।১৯৮৩ সালে এলাং-এ প্রথম জাহাজ ‘এমভি কোটা ত

আইন পড়ে আছে গ্যাঁড়াকলে! : ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, দূষণ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার অভাবের কারণে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নেতিবাচক শিরোনাম হওয়ায় গত বছর ‘বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন’ শিরোনামে একটি আইন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মন্ত্রিসভা। সেই খসড়া এখনো বিল আকারে সংসদে ওঠেনি বলে জানা গেছে।

এ আইনের আওতায় ‘জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড’ গঠনের খসড়ায় বলা হয়, বোর্ড ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমতি দেবে, রিসাইক্লিং ফ্যাসালিটি প্ল্যান তৈরি করবে। শ্রমিক নিরাপত্তা ও স্বার্থ সংরক্ষণ, দূষণ রোধ ও পরিবেশের বিষয়গুলো দেখবে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মান নিশ্চিত করতে পরিবেক্ষণ করবে। পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য জাহাজ আমদানিতে মিথ্যা তথ্য দিলে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা, বা ৬ মাসের কারাদণ্ড; বোর্ডের অনুমতি ছাড়া ইয়ার্ড নির্মাণ করলে ১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা, বা এক বছরের কারাদণ্ড এবং বোর্ডের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় কেউ যদি ‘যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া’ সহযোগিতা না করে, সে ক্ষেত্রে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা ৬ মাসের কারাদণ্ডের কথা বলা হয় খসড়া আইনে।

কিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জন্য পরিবেশ-সংক্রান্ত ছাড়পত্রের বিষয়ে নানামুখী বক্তব্যের ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মাসুদ করিম জানিয়েছেন, বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজ ভাঙ্গা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুযায়ী পরিত্যক্ত জাহাজ ভাঙার আগে ইয়ার্ড মালিককে অবশ্যই পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। আমরা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি।

এর মধ্যে কয়েকটি ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য নতুন করে আবেদন করেছে বলেও জানান তিনি। তবে বিশিষ্ট শিপ ব্রেকার্স ইয়াছিন আলী বলেছেন, যেহেতু বিষয়টি এখন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং সেই মন্ত্রণালয় জাহাজ কাটার জন্য অনুমতি দিচ্ছে সে ক্ষেত্রে আবার নতুন করে পরিবেশ ছাড়পত্রের প্রয়োজন রয়েছে কী? তা ছাড়া জাহাজ পরিদর্শনের সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধিও থাকেন। তাদের সমন্বিত প্রতিবেদনের পর এটি শিল্প মন্ত্রণালয় কাটার অনুমতি দেয়। সুতরাং আলাদা করে পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।