নারায়ণগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ নেন না কেউ!

সিদ্ধিরগঞ্জের চৌধুরীবাড়ির নারায়ণগঞ্জ সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কেউ ঘুষ নেন না, তবে নেন নির্ধারিত কমিশন। এ কমিশন নির্ধারণ করে দিয়েছেন সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার হাফিজা হাকিম রুমা। তবে তার কমিশন অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে বেশি। দলিল লেখক সমিতির নেতাদের ম্যানেজ বা সন্তুষ্ট করেই এ কমিশন নিচ্ছেন সাব-রেজিস্ট্রার। কমিশনের টাকা তিনি নিজে গ্রহণ করেন না। এ জন্য নিয়োগ করা হয়েছে টিটু নামে বহিরাগত এক ব্যক্তিকে। দুদক বা প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতেই এ কৌশল সাব রেজিস্ট্রারের। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায়ের ব্যাপারে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে জানতে চাইলে তিনি রাগান্বিত হন।

২০১৫ সালের ২৭ জুলাই সিদ্ধিরগঞ্জের চৌধুরীবাড়ির নারায়ণগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে বদলি হয়ে আসেন সদর সাব-রেজিস্ট্রার হাফিজা হাকিম রুমা। নারায়ণগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের পর তিনি কমিশনের হারে ‘ঘুষ’ নেয়ার প্রথা চালু করেন। তার বেঁধে দেয়া নিয়মানুযায়ী প্রতি সাফকবলা দলিল সম্পাদন করতে হলে প্রতি লাখে তিনি ৭শ’ টাকা করে কমিশন বাবদ নিয়ে থাকেন। যে কোনো দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে সেরেস্তা বাবদ দিতে হয় ১ হাজার টাকা করে। টিপসহি বাবদ দিতে হয় ১০০ টাকা, দলিল রসিদদাতাকে দিতে হয় ১০০ টাকা করে।

কমিশনের টাকা বা উৎকোচের টাকা নেয়ার জন্য তার নিয়োজিত বহিরাগত ব্যক্তি টিটুকে দিতে হয় ১০০ টাকা করে। কমিশন (সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বাইরে) রেজিস্ট্রি করাতে হলে সাব-রেজিস্ট্রারকে অতিরিক্ত দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জের বাইরে ঢাকা বা আশপাশের এলাকাতে দলিল করাতে হলে সাব-রেজিস্ট্রারকে কমিশন/উৎকোচ দিতে হয় ২০ হাজার টাকা।

ঘোষণাপত্র দলিলে পূর্বের সাব কবল দলিলের মূল্য দেখে প্রতি লাখে ৩ হাজার টাকা করে কমিশন নিয়ে থাকে সাব-রেজিস্ট্রার। দলিল উত্তোলনের সময় প্রতি দলিলে সাব-রেজিস্ট্রারকে দিতে হয় ১ হাজার টাকা থেকে দলিলের মূল্যানুযায়ী ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। আমমোক্তার দলিলে রেজিস্ট্রি করার সময় প্রতি দলিলে ৫ লাখ টাকা মূল্যের দলিলে সাব-রেজিস্ট্রারের কমিশন রয়েছে ৫ হাজার টাকা। ৫ লাখ টাকা মূল্যের ওপরে মূল্য হলে প্রতি লাখে ১ হাজার টাকা করে কমিশন নিয়ে থাকে সাব-রেজিস্ট্রার।

প্রতি নকল দলিলে আড়াইশ টাকা থেকে ৩শ’ টাকা করে কমিশন (ঘুষ) নির্ধারণ করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার হাফিজা হাকিম রুমা। এতে সাব-রেজিস্ট্রারের প্রতিদিন আয় হয়ে থাকে এক লাখ টাকার ওপর। পর্যায়ক্রমে তার অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অতিরিক্ত আয় হয়ে থাকে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে স্থানীয় সোনালী ব্যাংকে প্রতি লাখে ১১ হাজার টাকা জমা দিয়ে রেজিস্ট্রি করার সরকারি নিয়ম রয়েছে। এর বাইরে নকল দলিল ছাড়া সাব রেজিস্ট্রি অফিসে নগদ কোনো টাকা নেয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার হাফিজা হাকিম রুমা তার নির্ধারণ করে দেয়া কমিশন (ঘুষ) টিটুর মাধ্যমে নিয়ে থাকে।

দলিল রেজিস্ট্রি করার সময় পুরো টাকা কর্মচারী বাচ্চুর মাধ্যমে টিটুর কাছে রক্ষিত থাকে। পরবর্তীতে বিকেলে অফিস ছুটির পর সাব-রেজিস্ট্রারের কমিশনের পুরো হিসাব বুঝিয়ে দেন অফিসের কেরানি আবু মুছলিম। সাব-রেজিস্ট্রারের বেঁধে দেয়া নিয়ম অনুযায়ী কমিশনের অন্যান্য ভাগ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নারায়ণগঞ্জ সদর দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কলিমুল্লার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।

এ টাকা দিয়ে চলতি সালের মার্চ মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা খরচ করে দলিল লেখক সমিতির অধিকাংশ সদস্য তাদের পরিবারের সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বড় বহর নিয়ে চট্টগ্রাম ভ্রমণে যান। ওই ভ্রমণে সমিতির সদস্যদের ৩২ হাজার টাকা করে হাত খরচও দেয়া হয়। সাব-রেজিস্ট্রারের কমিশন ছাড়াও দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতারা দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকায় তারা সন্তুষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের ওপর।

তাই এ অফিসের অনিয়মগুলো তাদের কাছে বৈধ। অভিযোগ রয়েছে, উৎকোচ দিতে প্রতিবাদ করায় অনেকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে সাব-রেজিস্ট্রার হাফিজা হাকিম রুমার বিরুদ্ধে। ২০ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে অস্বীকার করায় মুক্তিযোদ্ধা আহমেদুল কবির চৌধুরীর জামাতা প্রবাসী সাখাওয়াত হোসেনের দলিল ১৮ অক্টোবর সাব-রেজিস্ট্রার হাফিজা হাকিম রুমা রেজিস্ট্রি করেননি খাজনা রশিদ ভুল হওয়ার অভিযোগ দেখিয়ে। বাধ্য হয়ে ১৯ অক্টোবর কশিমন বাবদ ২০ হাজার টাকা সাখাওয়াত হোসেন কেরানি আবু মুছলিমের মাধ্যমে টিটুর কাছে জমা দেয়ার পর ওই দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন সাব-রেজিস্ট্রার।

তার কমিশনের টাকা না দেয়ায় তিনি প্রবাসী সাখাওয়াত হোসেন ও তার শ্বশুর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদুল কবীর চৌধুরীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা আহমেদুল কবীর চৌধুরী। সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকার হাছিনা আক্তার জানায়, তার বাবা তার নামে আড়াই কাঠা জমি হেবা করে দেয়। কিন্তু ওই হেবা দলিলের রশিদ হারিয়ে যাওয়ায় তিনি থানায় জিডি করে জিডিকপিসহ আনুষঙ্গিক কাগজ নিয়ে দলিল উত্তোলন করতে যান হেবাকারী তার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু ওই অফিসের কর্মচারী সুনীতি (বর্তমানে বৈদ্যের বাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত) জানিয়ে দেন এ দলিল নিতে হলে ৫ হাজার টাকা দিতে হবে। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার ম্যাডাম ইশারা দিয়ে আমাকে বলে দিয়েছে ৫ হাজার টাকা নেয়ার জন্য।

সুনীতির দাবি করা ৫ হাজার টাকা দিতে অস্বীকার করলে দলিল দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে বাধ্য হয়ে এক দলিল লেখকের মধ্যস্থতায় আড়াই হাজার টাকা উৎকোচ দিয়ে হাছিনা আক্তার ওই দলিল হাতে পান। এ রেজিস্ট্রি অফিসের এক কর্মচারী জানায়, সাব-রেজিস্ট্রার ম্যাডাম টিটুর কাছ থেকে তার হিসাবের টাকা পুরোটা পাওয়ার সংকেত না পেলে দলিল সম্পাদন করতে আসা দাতা ও গ্রহীতার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। সাব রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে অফিসের কেরানি আবু মুছলিম জানায়, আমি কোনো টাকা নেই না। টাকা-পয়সা যা নেয়ার টিটু নিয়ে থাকে। এ ব্যাপারে কর্মচারী বাচ্চু জানায়, সাব-রেজিস্ট্রার ম্যাডামের নির্দেশে দলিল সম্পাদনের সময় টিপসহি দেয়ার সময় আমি টাকা নিয়ে টিটুর কাছে জমা দেই।