বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা, অপহরণ : আলীকদম-থানচি সড়কের পাশে জঙ্গল

জঙ্গলের দখলে দেশের সর্বোচ্চ আলীকদম-থানচি পর্যটন সড়ক। প্রতিনিয়তই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। এছাড়াও পর্যটন খ্যাত এই সড়কটির দুপাশের পরিবেশ জঙ্গলের কারণে অনেকটা ভুতুড়ে রূপ ধারণ করার অপহরণ খুনসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আলীকদম-থানচি সড়ক সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮শ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এ সড়কটির অবস্থান দেশের দক্ষিণ-পূর্বের জেলা বান্দরবানের আলীকদম ও থানচি উপজেলার মধ্যে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ ও ১৭ নির্মাণ প্রকৌশলী ব্যাটালিয়নের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯৯১ সালে ৮০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে সড়ক নির্মাণ কাজ হাতে নেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির নির্মাণকাজ ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে সমাপ্ত হয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সড়কটির অব্যবস্থাপনার ফলে গত ১৪ অক্টোবর দুটি মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন আহত হয়েছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে আরো একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছে। ৭ মার্চ ২০১৫ তারিখ সেনাবাহিনীর ডাম্পার উল্টে ২ জন নিহত ৪ জন আহত হয়েছে। ২ নভেম্বর ২০১৩ তারিখ ওই সড়কের ১০ কিলো এলাকায় চাঁদের গাড়ি উল্টে গিয়ে ১ ব্যবসায়ী নিহত ও আরো ৩ জন গুরুতর আহত হয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখ অপর একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখ পিকআপ উল্টে আহত হয়েছে ৪ জন।

এছাড়াও সড়কের দুপাশে ঘন জঙ্গলের কারণে সড়কের আশপাশের এলাকায় ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে এলাকাটি খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ১৯ এপ্রিল ২০১৬ তারিখ আলীকদমে ৩ ব্যবসায়ী অপহরণ করে নির্মমভাবে খুন করেছে সন্ত্রাসীরা। অপহরণের দুদিন পর তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যক্তিরা। এর আগে একই বছরের প্রথম দিকে ১ জন বাঙালি কৃষক ও ২ জন উপজাতি সন্ত্রাসী আহত হয়েছে।

স্থানীয়রা মনে করেন, এই সড়কটিকে ঘিরে ওই এলাকায় পর্যটনের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। দেশের সর্বোচ্চ এবং এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়ক হিসেবে এটিকে যদি সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করা হয় তাহলে এটি দার্জিলিংকেও হার মানাবে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় জমবে এখানে। পর্যটকদের আগমনের ফলে এলাকার আদি শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করবে। সুতরাং এখনই সরকারকে এ সড়কটির উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি আলীকদম-থানচি দুই উপজেলার বাসিন্দাদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে থানচি-চিম্বুকের প্রকল্প কর্মকর্তা মেজর হুমায়ুন বলেন, গত আগস্ট মাসে আমরা সড়কটি সড়ক ও জনপথ বিভাগকে হস্তান্তর করেছি। তারপর সড়ক ও জনপথের কোনো লোকজন একবারের জন্যও এদিকে আসেনি। ১৮ ফুট চওড়া রাস্তাটি জঙ্গলে ঢেকে বর্তমানে ৬ ফুটে চলে এসেছে। যার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে গেছে। গত কয়েক মাসের মধ্যে ৪/৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

অপরদিকে বান্দরবান সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি একাধিকবার প্রসঙ্গ এড়ানোর চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রকৌশলী বিভাগে বর্তমানে লোকজনের স্বল্পতা রয়েছে, তবুও আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অর্থ বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করব। তিনি আরো বলেন, সেনাবাহিনী আমাদের রাস্তাটা পরিষ্কার করে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা আমাদের রাস্তাটি পরিষ্কার করে হস্তান্তর করেনি।

থানচির দুর্গম রেমক্রির জুমচাষি লুইপা মুরুং ও কেউচিং মুরুং জানান, নবনির্মিত সড়কটি চালু হলে বনজ দ্রব্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, জুমে উৎপাদিত ধান, তুলা, সরিষা, মিষ্টিকুমড়া, জুমকুমড়া, ধানিয়া মরিচ, মারফা, চিনার ও তিলসহ হরেক রকম কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে এবং তারা আর্থিকভাবে দ্রুত স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে বলে মতপ্রকাশ করেছেন।

তাছাড়াও বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। এতে এসব মানুষের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলো পাবে।

আলীকদম উপজেলার সদর ইউপি চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন বলেন, পাহাড়ের দুর্গম এলাকাগুলোর সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। এখন আর পিছিয়ে পড়া কোনো অঞ্চল নয় এ দুই উপজেলার পাড়া-গ্রামগুলো। তিনি বলেন, ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ থানচি-আলীকদম পাহাড়ি সড়কপথ নির্মিত হওয়ায় এলাকার প্রায় ৮০ হাজার পাহাড়ি মানুষের স্বপ্নপূরণ হলো। সড়ক নির্মাণের ফলে দুই উপজেলার সাধারণ লোকজনের জীবনযাত্রায় নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। এ সড়কের জিরোপয়েন্ট থেকে মাঝখানে অবস্থিত অন্যতম পর্যটন স্পট ‘ডিমপাহাড়’। এ ডিমপাহাড়কে সাজানো গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করবে। সবুজ পাহাড়ের মাঝখানে উঁচু-নিচু আঁকাবাঁকা এ সড়কপথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেই দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও দেখার সুযোগ পাবেন।