অটিজমের সচেতনতা ও চিকিৎসা

অটিজম (Autism) বা অটিস্টিক শব্দটার সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু বিষয়টা সম্পর্কে কে কতটুকু জানে বা জানাটা কতটুকু স্বচ্ছ সে ব্যাপারে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। গ্রামে কিছুদিন পূর্বে কিংবা বলা যেতে পারে এখনও মনে করা হয় অটিস্টিক শিশুরা ও ব্যক্তিরা জিন বা ভুতের আছরের শিকার। কিংবা মনে করা হয় তারা পাগল। শুধু গ্রাম কেন শহরের অনেকের মাঝেও এরকম ধারণা অছে।

অটিজম সম্পর্কে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা তেমন নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে অটিস্টিক শিশুদের প্রতি অভিভাবক ও সমাজ হয়ে ওঠে বৈরি। অনাদর অবহেলায় বড় হয়ে ওঠে তারা পরিণত হয় সমাজের বোঝা হিসেবে।

অটিজম কি?

অটিজম কোন রোগ, বংশগত বা মানসিক রোগ নয়, এটা স্নায়ুগত বা মানসিক সমস্যা। এ সমস্যাকে ইংরেজিতে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার (neural development disorders) বলে। অটিজমকে সাধারণভাবে শিশুর মনোবিকাশগত জটিলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অটিজমের লক্ষণগুলো একদম শৈশব থেকেই, সাধারণত তিন বছর থেকে প্রকাশ পেতে থাকে। অটিজমে আক্রান্তরা সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। মানসিক সীমাবদ্ধতা ও একই কাজ বারবার করার প্রবণতা দেখা যায়।

অটিজম আক্রান্ত শিশু কারো সাথেই, সে সমবয়সী হোক কিংবা অন্য যে কোনো বয়সী কারো সাথে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। নাম ধরে ডাকলেও সাড়া দেয় না। এরা অনেকেই আকার ইঙ্গিতে কথা বলতে পছন্দ করে। এ ধরণের শিশু আপন মনে থাকতে পছন্দ করে। নিজের ইচ্ছে মত চলে। যখন যা করতে ইচ্ছে হয় তা করতে না পারলে এদের খিঁচুনি ভাব হয়। এরা কারো চোখের দিকে তাকায় না। কারো সাথে নিজের ব্যবহারের জিনিস পত্র শেয়ার করতে চায় না। কারো দিকে তাকিয়ে হাসে না কিংবা আদর করলেও ততটা সাড়া দেয় না। অনেকে আবার আদর ও পছন্দ করে না। সাধারণভাবে অটিষ্টিক শিশুরা একই কথা বারবার বলে এবং একই কাজ বার বার করতে পছন্দ করে। তবে অটিস্টিক সব শিশুই একই রকম আচরণ করে না।

কেন হয় অটিজম?

অটিজম মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বায়োলজি ও কেমিস্ট্রির ফলে সৃষ্ট একটি সমস্যা। ঠিক কী কারণে অটিজম সমস্যা হয় তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। কিছু বিষয়ের সমন্বয়ে অটিজম ঘটে থাকে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করে থাকেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জেনেটিক ফ্যাক্টর। অনেক সময় দেখা গেছে, অটিজমের ইতিহাস যে পরিবারের আছে সেই পরিবারের আরও অনেকরই কথা বলতে সমস্যা, অন্যান্য জেনেটিক্যাল সমস্যা ইত্যাদি পাওয়া যায়। গর্ভাবস্থায় খাদ্যাভ্যাস, বাচ্চার অন্ত্রের পরিবর্তনগত সমস্যা, মার্কারির (পারদ) বিষক্রিয়া, বাচ্চার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ পরিপাক করতে না পারা, টিকার প্রতিক্রিয়া ইত্যাদিও অটিজমের কারণ। এর বাইরে পরিবেশ দূষণ, রাসায়নিক মেশানো খাদ্যগ্রহণ – এসবও অটিজমের জন্য দায়ী৷

অটিজমের লক্ষণ

অটিজমের লক্ষণগুলো অনেক সময় ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে পরিলক্ষিত নাও হতে পারে। অনেক সময় ২৪ মাস থেকে ৬ বছরের মধ্যে পরিলক্ষিত হতে পারে। “The national institute of child health and human development” -এর চিহ্নিত লক্ষণগুলো হলো-

১. শিশুর বয়স ১২ মাস পেরিয়ে গেলেও যদি কোনো শব্দ না করে (যেমন কু কু বু বু ইত্যাদি)
২. বয়স ১২ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো কিছু পাওয়ার জন্য হাত বা দৃষ্টি দিয়ে দেখিয়ে না দেওয়া বা কোনো কিছু আঁকড়ে না ধরা।
৩. ১৬ মাস বয়সের মধ্যে কোনো একটি শব্দ না বলা।
৪. ২৪ মাস বয়সের মধ্যে দুটি শব্দ না বলা।
৫. আগে রপ্ত করা কোনো দক্ষতা যে কোনো সময় যে কোনো বয়সে কমে যাওয়া।

এই পাঁচটি লক্ষণ থাকলেই যে শিশু অটিজমের শিকার হবে তা নয় অটিজমের এই লক্ষণগুলো আরও ভালোভাবে নিউরোলজিস্ট, সাইকোলজিস্ট, ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিশু অটিজমের শিকার কিনা তা নির্ণয় করতে হবে।

অটিস্টিক শিশুদের বিকাশে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়/ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়। সামাজিক, ভাষাগত এবং আচরণগত। এ লক্ষণগুলো একেকজনের বেলায় একেকভাবে প্রকাশ পায়। ২টি অটিস্টিক শিশুর বেলায় লক্ষণের ব্যাপক হেরফের হতে পারে। অনেকের খুব অল্প বয়সে লক্ষণ দেখা দেয়। আবার কেউ কেউ প্রথম কয়েক মাস বা বছর স্বাভাবিক বিকাশ লাভ করে। তারপর হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়, গুটিয়ে যায় বা ভাষাজ্ঞান হারিয়ে ফেলে, যা আগে অর্জন করেছিল।

অটিস্টিকদের কিছু উল্লেখযোগ্য লক্ষণ নিম্নে দেয়া হলো-

(১) সামাজিক

ক) নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না,
খ) চোখে চোখ রাখে না বা কম রাখে,
গ) মাঝে মাঝে কথা শুনে না বলে মনে হয়,
ঘ) অটিস্টিক শিশুরা সাধারণত সমবয়সিদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে না,
ঙ) কিছু শিশু সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে অন্যের প্রতি কোন আগ্রহ দেখায় না।

(২) ভাষাগত

ক) দুই বছরের ও পরে কথা বলা শুরু করে,
খ) অতীতে দেখা শব্দ বা কথা ভুলে যায়,
গ) অস্বাভাবিক স্বর বা আওয়াজে কথা বলে,
ঘ) কখনো দেখা যায় একই শব্দ বারবার করে সে উচ্চারণ করে যাচ্ছে।

(৩) আচরণগতঃ

ক) একই আচরণ বারবার সে করতে থাকে। যেমন- হাত নাড়ানো, হাত দেখা, একইভাবে ঘোরা বিভিন্ন জিনিষ সারিবদ্ধভাবে সাজানো,
খ) তারা নিজস্ব রুটিন মেনে চলতে ভালবাসে। দৈনন্দিন কোন রুটিনের হেরফের হলে তারা অস্থির হয়ে যায়,
গ) কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ রেগে যায়, হাসে কাঁদে বা ভয় পায়। অনেক সময় নিজের শরীরে বা অপরকে কামড় দেয় বা আঘাত করে।

অটিস্টিক শিশুর স্বাস্থ্য ও আইকিউ

বেশির ভাগ অটিস্টিক শিশুর স্বাস্থ্য স্বাভাবিক থাকে। শতকরা ৭০ ভাগ অটিস্টিক শিশুর আই কিউ ৭০-এর নিচে থাকে। তবে আশার কথা হলো কিছু কিছু অটিস্টিক শিশু বেশ বুদ্ধিমান হয়। অনেক সময় দেখা যায় বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশু অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও পারদর্শী হয়ে থাকে।

অটিস্টিক শিশু জন্ম নিলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ সব অটিস্টিক শিশুর আইকিউ কম থাকে না। তবে এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সন্তান না নেয়াই ভাল, যেহেতু পরে আরেকটি অটিস্টিক শিশু জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা থাকে। অটিস্টিক শিশু জন্ম নিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসককে দেখিয়ে চিকিৎসা নিলে শিশুর মানসিক বিকাশ সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়। তা ছাড়া অটিস্টিক শিশুদের যেহেতু কেউ কেউ বেশ বুদ্ধিমান থাকে তাই যত্ন নিলে তারাও জীবনে ভাল করতে পারে।

অটিষ্টিক শিশুরা কি প্রতিবন্ধী?

অটিষ্টিক শিশুদের প্রতিবন্ধী বলা যাবে না, কেননা প্রতিবন্ধীত্ব অর্থ হল বিশেষ কোন বাধার বা প্রতিবন্ধকতায় কোন কাজ করতে না পারা।পরিবারে এমন কিছু শিশু দেখা যায় যাদের শারিরীক গঠন স্বাভাবিক নয়, হাত বা পা নাই। কানে শোনে না। ফলে কথা বলতে পারে না। অনেকে চোখে দেখে না বা কম দেখে। এটা হল প্রতিবন্ধীত্ব। যে এই প্রতিবন্ধীত্বের শিকার সে প্রতিবন্ধি। অন্যদিকে অটিস্টিক শিশুদের সাধারণত এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে না। এ ধরনের শিশুদের সাধারনত মানসিক ক্ষমতার বিকাশ বন্ধ হয় না।

অটিস্টিক শিশুর সাথে আচরণ কেমন হওয়া উচিত?

অটিজম হচ্ছে মস্তিষ্কের বিন্যাসগত সমস্যা । অটিজম শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে, যার ফলে শিশু শুধুমাত্র নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকে, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে । শিশু যখন শুধু নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকে তখন তার অন্যদের সাথে যোগাযোগ, সামাজিকতা, কথা বলা, আচরণ ও শেখা বাধাপ্রাপ্ত হয়।

তাই একটি অটিস্টিক শিশুর সাথে নিম্ন লিখিত আচরণ গুলো করা যায়

শিশুটিকে সহজ ভাবে গ্রহণ করুন ও শিশুর বর্তমান অবস্থা মেনে নিয়ে ধৈর্য্যশীল, সহমর্মী ও আন্তরিক হোন ।
শিশুর সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি করুন ।
শিশুর শেখার উপযোগী পরিবেশ তৈরিসহ সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
শিশুকে সহজ ভাষায় নির্দেশনা দিন এবং তাকে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করুন ।
শিশুকে তার দৈনন্দিন কাজ করতে সাহায্য করুন ।
কোন কাজ সে সঠিকভাবে করতে পারলে তাকে উৎসাহ দিন (আদর, চুমু, পিঠ চাপড়ে দেয়া প্রভৃতি)।

অটিজমের চিকিৎসা

অনেক অভিভাবকই অটিস্টিক শিশুর রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসাদানে ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন। সাধারণ মেডিকেল চিকিৎসা আর ওষুধ সেবনে অটিজম থেকে সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়। অটিজম চিকিৎসায় ওষুধের কোনো ভূমিকা নেই৷ এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ৷

অটিজম একটি মানসিক সমস্যা, তাই অভিভাবকদের প্রয়োজন অটিস্টিক শিশুকে একজন মনোবিদ বা মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া। সঠিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা পেলে অটিস্টিক শিশু সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে প্রতিটি অটিস্টিক শিশুই আলাদা হওয়ায় তাদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারটি একজনের চেয়ে আরেকজনেরটা আলাদা। যত আগে অটিজমের বিষয়টা উপলব্ধি করে চিকিৎসা শুরু করা যায় ততই ভাল৷ ৷ অটিস্টিক শিশু হয়তো আর সব সাধারণ শিশুর মতো সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক আচরণ করতে পারবে না। কিন্তু সাইকোথেরাপি বা স্পেশাল শিক্ষাদানের মাধ্যমে এসব শিশুকে ৮০-৯০ ভাগ পর্যন্ত সুস্থ করে তোলা সম্ভব। সঠিক পদ্ধতিতে এগোলে প্রতিটি অটিস্টিক শিশুই উন্নতি করে৷ এমনকি অনেকে সাধারণ স্কুলে যাওয়ার মতোও হয়ে ওঠে৷ চিকিৎসা গ্রহণ করে সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে বিয়ে ও সংসার করাও অনেকের পক্ষে সম্ভব।

অটিজম নিয়ে ভুল ধারণা

অনেকেই মনে করেন, অটিজম বংশগত রোগ। সম্পূর্ণভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক বাবা-মায়ের ঘরেও অটিস্টিক শিশু জন্মগ্রহণ করে থাকে। পরিবারের বা বংশের কেউ এই সমস্যায় আক্রান্ত না হলেও একটি শিশু অটিস্টিক হতে পারে। বাবা-মায়ের সঠিক পরিচর্যার অভাবে শিশু অটিস্টিক হয় এমন একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনেকের মাঝেই রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, একান্নবর্তী পরিবার অথবা একমাত্র সন্তান হওয়ার পরও অটিস্টিক শিশু হয়ে থাকে।

অটিস্টিক শিশুকে অনেকে পাগল, আলগা দোষ, বাবা-মায়ের অভিশাপ ইত্যাদি কুসংস্কারে সংজ্ঞায়িত করে থাকেন, যা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। এরূপ বিশ্বাসের ফলে অনেক সময় শিশুর ভুল চিকিৎসা হয়ে থাকে, যা শিশুর জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিছু কিছু শিশু জন্ম ও স্বভাবগতভাবেই একটু বেশি অস্থির, চঞ্চল, রাগী ও জেদি প্রকৃতির হয়ে থাকে। এতে করে শিশুটি অটিস্টিক শিশু হতে পারে এমনটা ভেবে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। অটিজমের বেশ কয়েকটি লক্ষণ শিশুর মধ্যে প্রকাশ পেলেই দেরি না করে প্রাথমিক অবস্থাতেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।