শাহিনুর রহমান শাহিন »

কেউ যদি প্রশ্ন করে স্বর্গরাজ্যে কী অাছে, আর তা দেখতেই বা কেমন? নিশ্চয় আপনি দুচোখ বন্ধ করে এক বাক্যে বলবেন এই যে, আমার চারিদিকে ছায়াবীথি, সবুজের সমারোহ, গাছে-গাছে কোকিল, শালিক, টিয়া, ময়না ইত্যাদি নানা বৈচিত্র্যময় পাখির কলকাকলি আর নৃত্য, যেদিকে তাকাই শুধু সবুজে ঘেরা অরণ্য, পথিকের নিরলস ছুটে চলা। কিংবা থাকতে পারে রাস্তার দুধারে কাঁঠবিড়াল, শেয়াল, গুইঁসাপ, বেজির মনমাতানো খেলা… এগুলোর সমন্বয়েই আমার স্বর্গরাজ্য।

স্বর্গরাজ্যে দেখার তো আর শেষ নাই। চিরসবুজ বাংলাদেশের বুকে রয়েছে দেখার মতো অনেক দৃষ্টিনন্দন জায়গা। যেখানে গেলে আপনি পাবেন প্রকৃতির আলতো ছোঁয়া। যে ছোঁয়া আপনাকে করে তুলবে পুলকিত, উল্লসিত। নিবিড় প্রকৃতির ভালবাসার টানে হারিয়ে যেতে পারেন দূরদূরান্তে, অসম্ভব তো কিছু না!

বাংলাদেশের বুকে এমনি এক সবুজের সমারোহ, হাজারো মানুষের মন জয় করে নিয়েছে তার অবিরাম সৌন্দর্যের বারতা দিয়ে। বলছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, ঐতিহ্যের ধারক, বাহক দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। এই যে, এতোক্ষণ ধরে স্বর্গরাজ্যের কথা শুনলেন, আসুন না এবার একনজর দেখে যান।

একটি স্বর্গ দেখতে চান তবে চলে আসুন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রায় সাতশ (৬৯৭.৫৬) একর জায়গার উপর স্থাপিত দেশের নয়নাভিরাম এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। যা আপনাকে দেবে স্বর্গেও অনুভূতি। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেই যাত্রা শুরু করার পর থেকে থেমে নেই আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Jahangirnagar University picture৪৫ বছরে পা দিয়ে আজ দুরন্ত গতিতে ছুটে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শিক্ষা ক্ষেত্রে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। কি গবেষক, গবেষণা বিজ্ঞানাগার, কি বিজ্ঞানী, কি শিল্পী — প্রকৌশলী সব কিছু তৈরির কারখানাই জাহাঙ্গীরনগর। এতকিছুর মাঝে লুকিয়ে আছে আরও একটি অবাক করার মতো বিষয়, আর তা হলো এর সবুজে ঘেরা অরণ্যে। শহরের ইট-পাথরের দেয়াল থেকে অদূরে অবস্থান এই সবুজের লীলাভূমির। পড়ালেখা, কর্মজীবন থেকে একটু হাফঁ ছেড়ে বাঁচতে বিভিন্ন সময় এখানে ভ্রমণে আসে বিদেশী শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা। তাদেরকে কোমল পরশ বুলিয়ে মায়ামমতায় আপন করে নেয় এই সুন্দর ক্যাম্পাস।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি পরিচয় জানতে চান তবে একে পরিচয় করে দিতে হবে ‘সবুজের লীলাভূমি’ হিসেবে। প্রায় পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে এমন কোন  জায়গা নেই যেখানে গাছপালা নেই। দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবাস বলা হয় এটিকে। বাংলাদেশের এমন কোন গাছ নেই যা এখানে পাবেন না। রয়েছে বিদেশি অনেক গাছও। প্রধান গেট ডেইরি গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে নানারকম আম, কাঁঠাল, বকুল, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, ক্যাশপিয়া, বরই, কদম, ইত্যাদি সবুজ গাছ। যতই ভেতরে আসবেন ততই দেখতে পাবেন কি অপরূপ আকরে সেজেছে এর প্রকৃতি। আপনার হৃদয় এক পলকে কেড়ে নেবে। সবকিছু মিলিয়ে অপরূপ সৌন্দর্যে সেজেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

অতিথি এসেছে, অতিথি এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। শীত এসে গেছে আর অতিথিরাও চলে এসেছে। বুঝলেন নাতো, বলছি বাংলাদেশের অন্যতম শীতকালীন পাখির অভয়ারণ্য বিদেশি পাখির কথা। বলা হয় বিদেশি পাখির প্রিয় আবাসভূমি এই জাহাঙ্গীরনগরের ক্যাম্পাস।

Jahangirnagar University photoসুদূর সাইবেরিয়া থেকে প্রতিবছর অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর যেন বিদেশি পাখির মিলনমেলা। এসময় প্রায় ১৮টি জলাশয় পাখির কিচিরমিচিরে আপনাকে মুগ্ধ করে রাখবে। এ পাখি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চলে আসে হাজারো দর্শনার্থী। ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসের সুইমিং পুল সংলগ্ন জলাশয়ে এসেছে একঝাঁক অতিথি পাখি।

তারপর চোখে পড়বে ফুলের সমারোহ। শত শত প্রকারের দেশি ও বিদেশি ফুলে আছন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গন। রাস্তা হাঁটতে দুধারে দেখবেন ফুল আর ফুল, ফুঁটে আছে গাঁদা, গোলাপ, জবা, বকুল, হাসনাহেনা, বেলি ঠিক তেমনই নজর কাড়বে জলাশয়ে সদ্য ফোঁটা শাপলা আর লাল, নীলপদ্ম।

চলার পথে ছাতিম ফুলের গন্ধে আপনি কোন এক অন্য জগতের সন্ধান পেতে পারেন। প্রতিটি আবাসিক হল, অনুষদের পাশে রয়েছে ফুলের বাগান। সারাবছর সেই বাগানে কোন না কোন ফুল ফুটে আছে। বাহারি রকমের ফুলের সুবাস আপনার খারাপ মনকে এক নিমিষে ভাল করে দিতে পারে। বোটানিক্যাল গার্ডেনে পাবেন বিদেশি বহু রকম ফুল ও ঔষধি গাছের দেখা।

এতকিছু শুনেও কি ঘরে চুপ করে বসে থাকবেন? প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, সবুজের সমারোহ, অতিথি পাখির কিচিরমিচির, গুঁইসাপ, বেজির খেলা দেখতে চাইলে আর দেরি নয়, চলে আসুন এক্ষুণি…

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »