আশিক উজ জোহা »

আমি একটা অদ্ভুত ব্যাংকের গ্রাহক। এই ব্যাংকের ট্যাগলাইন হল, “সার্ভিস ফার্স্ট” বা সেবাই প্রথম। সেই প্রথম গ্রেডের সেবার ব্যাপারে যে অভিজ্ঞতাগুলো গত কয়েক বছর ধরে হয়েছে সেগুলো আজকে পূর্ণতা পেয়েছে বা সেবার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে।
সেগুলোর কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো সবার সাথে শেয়ার করতেই এই বিরাট গরুর রচনা টাইপ লেখা লিখতে হল।

১. ২০১৩ সালের কোন এক সময় জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে চেক দিয়ে ৫০ হাজার টাকা উঠাই। ব্যাংক থেকে পাওয়া ঐ বান্ডিল আমি সরাসরি আমার কোম্পানির পেপারস প্রসেসিং এর জন্য আমাদের আইনজীবীকে দিলে সেখান থেকে আমাদের সামনেই একটা এক হাজার টাকার “জাল নোট” ফেরত আসে, যেটা আমাদের জন্য খুব লজ্জাজনক ব্যাপার ছিল।

২. ২০১৪ সালে তখন আমি ইল্যান্স মার্কেটপ্লেসে কাজ করতাম। একবার ব্যাংক ট্রান্সফার করলাম। প্রথমবার করছি বলে, খুব কম অ্যামাউন্ট দিলাম। মাত্র ২২৪ ডলার, টাকায় মোটামুটি ১৬ হাজারের মত। ব্যাংক আমাকে ধরলো। আমার মানি সেন্ডার কোম্পানি, কোন সোর্স থেকে টাকা আসছে তার প্রমাণ নেই ব্লা ব্লা। তখন ঐ শাখায় আমার পরিচিত বড়ভাই ছিলেন বলে, উনি আমার ইল্যান্স অ্যাকাউন্টের ফাইনানশিয়াল রিপোর্টের একটা প্রিন্ট দিয়ে টাকাটা ঐ যাত্রায় বের করার ব্যবস্থা করে দেন। টাকা পাওয়ার পর দেখলাম, ২৮ ডলার ওখান থেকে নাই। এর মধ্যে ৫ ডলার ইল্যান্সের চার্জ। বাকিটা স্টেটমেন্ট দেখে আমি জানতে চাইলাম যে ওটা কার পকেটে যাচ্ছে। সন্তোষজনক কোন উত্তর ছিল না। দুই দিন ঘুরে ১৯৬ ডলারের মূল্যের টাকা নিয়ে বিদায় নিলাম।

ফলাফলঃ এরপর কান ধরলাম, আর জীবনে কোন ব্যাংক ট্রান্সফার করাবো না ব্যাংকে। সকল টাকা এরপর থেকে কাজকর্মের পেমেন্ট ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন বা এই টাইপ সার্ভিস দিয়ে নিই।

৩. এ বছরের শুরুর দিকে পোড়া কপালের অংশ হিসাবে অস্ট্রেলিয়া থেকে এক ক্লায়েন্ট আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তার কোম্পানি অ্যাকাউন্ট থেকে অল্প কিছু টাকা পাঠায়। মাত্র ২০ হাজার টাকা। টাকা উঠাতে গেলে তখন বিভিন্ন রকম জেরা চলতে থাকে। আর অনলাইনে কিভাবে আমি এমনে টাকাপয়সা কামাই সেইটার অ্যানালাইসিস চলতে থাকে। এভাবে প্রথম দিন যায়, আমাকে বলা হয় ক্লায়েন্টের সাথে আমার কাজের চুক্তিপত্র নিয়ে যেতে। সেটা নিয়ে ক্লায়েন্টের সাথেও একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়, তাদেরকে দোষ দিয়ে লাভ কি। ছোট একটা প্রজেক্টের জন্য এতোগুলো পেপারওয়ার্ক করতে তার কিসের ঠ্যাকা। এরপর চুক্তিপত্র নিয়ে ব্যাংকে গেলে আবার শুরু হয় জেরা। একজন কর্মকর্তা আমাকে বলেন, আপনি যে চুক্তিপত্র দিয়েছেন সেটা ভ্যালিড না, এখানে আমাদের দেশি কোম্পানির মত জলছাপ লাগানো প্যাডে প্রিন্ট দেয়া হয়নাই (সেটা তাদের অফিসিয়াল প্যাডই ছিল)। আমি ধৈর্য হারিয়ে বললাম, তাহলে ২০ হাজার টাকার জন্য ইন্টারন্যাশনাল আইনজীবী দিয়ে চুক্তিনামা করিয়ে সেটা অস্ট্রেলিয়া থেকে সাইন করিয়ে নিয়ে আসি, কি বলেন ? অনেক এটা সেটার পর আমাকে ওনারা পরের দিন আসতে বলেন। পরের দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটা বড়সড় একটা ফর্ম পুরন করে আসার ৩ দিন পর ঐ সাধের ২০ হাজার টাকা আমার অ্যাকাউন্টে আসে। আচ্ছা, আগের মতই কিন্তু ৩০ ডলারের মত লাপাত্তা।

ফলাফলঃ এই হ্যারাসমেন্টের কারনে আমার পুরো ৩ টা কর্মদিবস নষ্ট হয়। মানসিকভাবেও খুবই আপসেট হয়ে পড়ি। চলতি একটা বড় প্রজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ ডেডলাইন মিস হয়। ১২ লক্ষ টাকার সেই চলতি প্রজেক্ট ক্যান্সেল হয়ে যায়। ওইসময় এই ধাক্কা নেয়ার অবস্থায় আমি ছিলাম না।

৪. এতদিন যেটার উপর ভরসা করতাম আজকে সেটাও শেষ। আজকে ব্যাংকে গেলাম ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন দিয়ে আসা একটা পেমেন্ট নিতে। এতকাল কখনো কোন সমস্যা হয়নি। এই একই ক্লায়েন্টের কাছ থেকে গত ৪ মাসে ৩টা সিমিলার অ্যামাঊন্টের এরকম পেমেন্ট এসেছে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন দিয়ে। আজকে আমার বিশিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মনে হইছে, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন দিয়ে শুধুমাত্র যাদের পরিবারের কেউ বিদেশে থাকে তারাই টাকা পাঠাতে পারবে, অন্য কেউ না। আমার মানি সেন্ডার একজন বিদেশি, তাই তার সাথে আমার এরকম বিজনেস পেমেন্ট ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন দিয়ে আমি নিতে পারবো না। ব্রাঞ্চের ম্যানেজারের সাথে কথা বললে, তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে অনেক রুলস রেগুলেশন দেখালেন। “প্রপার ব্যাংকিং চ্যানেল” দিয়ে টাকা নিতে উপদেশ দিলেন। আমি তার প্রপার ব্যাংকিং চ্যানেলের উপরে বর্ণিত অতীত অভিজ্ঞতা একটু শেয়ার করলে, আরও কিছু ব্লা ব্লা দেখিয়ে দিলেন। আমাকে ওনাদের প্রথম শ্রেণীর সার্ভিস সরূপ তাদের হেড অফিসে রেমিটেন্স বিভাগে একটু কথাও বললেন। এরপর আমাকে বলে দিলেন, অন্য ব্যাংকে চেষ্টা করতে এবং গুলশান যাইতে। সেখানে নাকি অনেক এক্সপার্ট আছে যারা এটা প্রসেস করতে পারবে।

এরপর ব্র্যাক ব্যাংকে গেলে সেখানে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন রিসিপ্টে আমার নামের আগে “Md.” নাই বলে ওনারা অপারগতা প্রকাশ করলেন। অথচ একই রকম পেমেন্ট আমি গতমাসেও নিয়েছি।

এরপর অন্য আরেকটা ব্যাংকে গেলে, ওনারা নিয়ম দেখালেও সেই নিয়মের মধ্যে থেকেই আমাকে যথেষ্ট হেল্প করেছেন এবং একটু সময় লাগলেও টাকাটা ক্লিয়ার করেছেন।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের দায় এখানে যতটা, তার চেয়েও বেশি দায় হল সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু মাথামোটা লোকজনের। ডিজিটাল বাংলাদেশ কথাটাকে গালির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পেছনে এরাই দায়ী। ব্যাংকে গেলে অবস্থাটা দেখলে মনে হয়, বাংলাদেশ হল বিরাট এক ধনী দেশ, এখানে কোন বাইরের রেমিটেন্স আসা অন্যায় । সেটা যদি আসে তবে আসতে হবে মালয়েশিয়া কিংবা সৌদি আরব থেকে। সত্যি কথা হল, একটা কারনেই চরম হতাশ লাগে। এতো কষ্ট করে যে টাকাগুলো ইনকাম করি, এবং তার প্রত্যেকটা পাইপয়সার হিসাব করে বছর বছর ট্যাক্স দিই সরকারকে। বিনিময়ে প্রত্যেকটা ধাপে নিজের পা পেছনে টেনে ধরার মত লোকজনের অভাব নেই। সেটা ব্যাংক হোক, কিংবা সরকারি অফিস। কষ্ট হলেও এখনও বিশ্বাস করতে চাই, দেশে থাকার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল। হতাশ হলেও আশা করতে চাই, পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। [লেখাটি লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া এবং অসম্পাদিত।]

লেখক : সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও উদ্যোক্তা

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »