ঝর্ণা মনি »

‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে/লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে/ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে কখন আসবে কবি?/শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে/রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন/….কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি/ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’ ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় ফাগুনের আগুন রাঙা বিকেলের ঐতিহাসিক সত্যকে এভাবেই চিত্রিত করেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। রক্তঝরা একাত্তরের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বাঙালির প্রবাদপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে জাতিকে শুনিয়েছিলেন বাঙালির ইতিহাসের অমর কবিতাখানি। ১৯ মিনিটের সুপাঠ্য অমর কাব্যটিই নিরস্ত্র বাঙালিকে করে তুলেছিলেন সশস্ত্র। বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি অনন্য সাধারণ দিনে অসাধারণ বাগ্মিতায় বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে পাকিস্তানিদের প্রতিহত করার।
পাকিস্তানি শাসকদের ২৩ বছরের শোষণে বিরুদ্ধে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জেগে ওঠা পুরো বাংলাকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, রাজনৈতিক কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ডাকে সেদিন সব পিছুটান ফেলে বাংলার মানুষ ছুটে আসে সে সময়ের রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার অদম্য নেশায় লাখো জনতা সেদিন অবাক চোখে দেখলো এক নতুন নেতাকে। অবাক বিশ্ববাসী দেখলো রাজনৈতিক কবিতার স্রষ্টাকে, চিরচেনা দামাল মুজিবের বাইরে অন্য এক মুজিবকে, যাঁকে তারা অভিহিত করল নতুন বিশেষণে। ৭ মার্চের পর বিশ্ব গণমাধ্যম শেখ মুজিবুর রহমানকে আখ্যায়িত করল ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ উপাধিতে। একাত্তরে বিশ্বের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘নিউজ উইক’র নিবন্ধ ‘দ্য পোয়েট অব পলিটিক্সে বলা হয়েছে, ‘৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি ভাষণ নয়, একটি অনন্য কবিতা। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি ‘রাজনীতির কবি হিসেবে স্বীকৃতি পান।’
একবার কিউবান নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘বন্ধু তুমি ওদের চেনো না, আমি চিনি, ওরা তোমাকে এবং তোমার দেশের সর্বনাশ করে ছাড়বে।’ ক্যাস্ট্রো সে সময় পাকিস্তানি আমলাতন্ত্রের কথা ইঙ্গিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু এর উত্তরে বলেছিলেন, ‘ক্যাস্ট্রো, আমি প্রতিহিংসা-প্রতিশোধে বিশ্বাসী নই। আমি রবীন্দ্রনাথের মানসে গড়া এক কোমল হৃদয়ের বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ আমাকে শিখিয়েছেন ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখো। আমি সে বিশ্বাস ও ভালোবাসা দিয়ে সব হৃদয়কে জয় করতে শিখেছি। আমি আমার মানুষকে ভালোবাসি।’ বঙ্গবন্ধুর এ বক্তব্যে দেশের মানুষের প্রতি তাঁর নিখাদ ভালোবাসাই প্রতীয়মান হয়। তাঁর শক্তি, দুর্বলতা, সাফল্য ও ব্যর্থতার মূল উৎসই ছিল দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। তিনি মানুষকে ভালোবেসেছিলেন বলেই কোটি জনতার বুকে আসন নিতে পেরেছিলেন। দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর এ ভালোবাসা, তাঁর কর্তব্যের প্রেরণা জুগিয়েছে দীর্ঘকালব্যাপী। কখনোবা ক্ষোভ, প্রত্যাশা আর দীপ্ত অঙ্গীকারে ফেটে পড়েছেন জ্বালাময়ী মিছিলের অগ্রভাগে, সুদীর্ঘ নির্যাতন সয়েছেন বদ্ধ কারাগারে। আবার বজ্রকণ্ঠের স্বরধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলেছেন জ্বালাময়ী মিছিলে।
বঙ্গবন্ধু এ জাতির আশা আকাক্সক্ষা ও আবেগ-চেতনাকে পরিপূর্ণভাবে ধারণ করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি রাজনৈতিক নেতা থেকে রাজনীতির কবিতে পরিণত হতে পেরেছিলেন। তিনি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েও মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার জয়গান গেয়ে গেছেন। শুধু ভালোবাসাই নয়, বঙ্গবন্ধু ছিলেন নিঃশঙ্ক চিত্তের অধিকারী। তাই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকে অকথ্য অত্যাচার সয়েও তিনি নত হননি। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ একবার মরে, বারবার মরে না। আর সে জন্যই হয়তো ছয় ফুট বাই দুই ইঞ্চির দীর্ঘাঙ্গী দেহের মোটা চশমার ফাঁক গলিয়ে অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ বিশ্বকে শুনিয়েছে বেঁচে থাকার মন্ত্র ‘যতবারই হত্যা করো, দারুণ সূর্য হবো, লিখবো নতুন ইতিহাস।’
অবশ্য যে মুজিবকে হত্যা করতে পারেনি পাকিস্তানের কসাইরা, সেই মুজিবকেই স্বাধীন বাংলাদেশে হত্যা করেছে কিছু বিপথগামী ও উচ্চাভিলাষী সৈন্য। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট ঝাঁঝরা হয়ে যায় বাংলার হৃদয়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে রক্তের স্্েরাতের ধারা মিশে কেন্দ্রীয় কারাগারে। পাথর সময়ে থমকে যায় বাংলাদেশ। থমকে যায় ইতিহাস। ‘বাঙালি, একটি ফিনিক্সপাখি’ শিরোনামের কবিতায় কবি আখতারুজ্জামান আজাদ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে বলেছেন বাঙালি জাতির সপরিবারের হত্যা। কবি বলেন, ‘আমরা বাহান্নতে মরেছি দলে দলে/আমরা একাত্তরে মরেছি ঝাঁকে ঝাঁকে/ আমরা পঁচাত্তরে মরেছি সপরিবারে।’ তবুও মাথা না নোয়ানো বাঙালি দৃঢ়প্রতিজ্ঞবদ্ধ হয়, পিতৃহত্যার বদলা নেয়ার। শোক পরিণত হয় শক্তিতে। ফলে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট তাঁকে বাঙালির কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেনি। তাঁর স্বপ্ন তাঁর কর্মচেতনা মিশে আছে বাঙালির আবেগ ও চেতনায়। জাতির দুর্যোগে-দুর্দিনে দুর্জয় সাহস, তাঁর নীতি, আদর্শ এ জাতিকে চিরকাল সামনে এগিয়ে চলার শক্তি জোগাবে। আর সে জন্যই ঘাতক দলের ইতিহাস বিকৃতির ইতিহাস আর সত্যকে চাপা দেয়ার দুষ্কর্মের বেড়াজাল ছিন্ন করে জাতির পিতা হত্যার তিন দশক পর ‘সত্যম, সুন্দরম, শিবম’-এর মতোই জাতির হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। যে বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিল, ইতিহাস থেকে জাতির পিতাকে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতে আবারো তিনি স্বমহিমায় দীপ্তমান। বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা আর লাখো শহীদের রক্তে রাঙানো দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হয় জাতি। প্রাণের স্লোগান ‘জয়বাংলা’র চেতনায় উদ্ভাসিত বাঙালি হৃদয়। কালের খেয়ায় ভেসে ইতিহাসের পুনরুদ্ধারে বঙ্গবন্ধু আবার প্রতিষ্ঠিত হন বাঙালি হৃদয়ে। আজ বাঙালির প্রেরণা, শক্তি ও সাহসের নাম বঙ্গবন্ধু, যাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গীকারে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »