জাহিদ আল আমীন »

রক্তাক্ত গুলশান! আক্রান্ত বাংলাদেশ। শংকিত, স্তম্ভিত গোটা জাতি।তবে এই আতংক আর আশংকা শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়াসহ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। যার প্রভাব মারাত্বক ও সুদূর প্রসারী। প্যারিস, ব্রাসেলস, ইস্তাম্বুলের পরে বাংলাদেশেও প্রায় একই ধরণের পৈশাচিক হামলার ঘটনা ঘটলেও এর কারণ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট আপাত দৃষ্টিতে ঢাকার হামলা একটু ভিন্নতর মনে হচ্ছে। সন্ত্রাসী গোষ্টী আইএস এর দাবী সত্য হলে, তারা বাংলাদেশে প্রথমবারের ব্যাপক ও বিধ্বংসী কোন সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করলো। বাংলাদেশের জন্যও  পূর্বপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত আত্নঘাতী এই হামলার অভিজ্ঞতা প্রথম।

zahid al amin

জাহিদ আল আমীন

নারকীয় এ ঘটনার পোষ্টমর্টেম করার সময় এখনও আসেনি। তবে সিঁদুরে মেঘ বাংলার আকাশে বহুদিন ধরেই দেখা দিচ্ছিল। বিজলির চমকের মতো নৃশংস ও আদিম কায়দায় একের পর এক ব্লগার হত্যার পরই দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিচ্ছিল ইসলামিক স্টেট। বাংলাদেশ সরকার সেইসব দাবি মানতে না চাইলেও বারবারই নিজেদের উপস্থিতির ঘোষণা করেছে আইএসের মুখপত্র দাবিক বা আমাক। তবে সবচাইতে বিস্ফোরক তথ্য ছিলো দাবিকের দ্বাদশ সংখ্যা। বাংলাদেশ যে আইসিসের রেডারে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে এই ম্যাগাজিনটি থেকেই। সেখানে দ্য রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল ( THE REVIVAL OF JIHAD IN BENGAL) শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিলো। সঙ্গে শেখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ ওরফে তামিম চৌধুরী নামে বাংলাদেশের আইসিস প্রধানের দীর্ঘ সাক্ষাত্কার। কানাডার প্রবাসী বাঙালি তামিম চৌধুরী বাংলাদেশে অবস্থান আইসিসের সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বলে ওই ম্যাগাজিনে দাবি করা হয়েছে। ইরাক এবং সিরিয়ায লড়াই চালিয়ে যাওয়া ইসলামিক স্টেট কেন রণাঙ্গন হিসেবে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশকে? সেই প্রশ্নেরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলো আইসিসের বাংলাদেশ অঞ্চলের তথাকথিত সেই আমীর। তাঁর মতে, ভারতের পশ্চিম দিকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। তাই জিহাদকে বিশ্বায়িত করতেই ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। দাবিকের প্রতিবেদনে স্পষ্ট,  ভারত ও মায়ানমারসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় আক্রমণ চালাতে আইসিস বাংলাদেশকেই ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। একসময় আলকায়দার যোগসূত্রে পুষ্ট জেএমবির, আনসারুল্লা বাংলা টীমের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এক্ষেত্রে বাংলাদেশে আইসিসের রিক্রুটমেন্ট সেল হিসেবে কাজ করেছে। যার ফলে স্থানীয় জঙ্গিদের হাত ধরেই বড়সর হামলা পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো বলে হচ্ছে ইসলামিকস্টেট৷ ঢাকার কূটনৈতিক কেন্দ্রে রেঁস্তোরায় হামলা সেই গ্র্যান্ড ডিজাইনেরই অঙ্গ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে

মহাভারতের এই প্রবাদটি ছিলো সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদর অবতার শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব এবং বেড়ে ওঠা সম্পর্কে তৎকালীন জ্যোতিষেরা রাজা কংসকে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- সেটারই অপভ্রংশ।

তবে এই কথাটির ভাবার্থ এবং তাৎপর্য নেতিবাচকভাবেই কম বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের জঙ্গীদের বেলাতে প্রবাদটি যেন মোক্ষম। এটা তো সত্য যে এইসব জঙ্গীরা আমাদের মাঝেই জন্ম নিয়েছে, এই দেশের আলো-বাতাসেই বেড়ে উঠেছে, ওরা আমাদের কারো ভাই, বন্ধু, সন্তান। এমন একটা নিষ্ঠুর গোষ্ঠীই ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়েছে। আবার ওরাই হত্যা করছে আমাদের কারো না কারো ভাই, বন্ধু, বাবা-মাকেই। এ কেমন নৃশংসতা!

শান্তির ধর্ম ইসলামকে বুঝে অথবা ভুলভাবে ব্যাখা করে এই গোষ্ঠীটি সাধারণ, নিরপরাধ মানুষদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় জবাই করে মারছে, আাবার সেই হত্যাকান্ডকেও ধর্মের সাথে মিলিয়ে-মিশিয়ে একাকার করার চেস্টা করছে। আর পরোক্ষে হলেও একটা বিশাল জনগোষ্ঠী এদের প্রতি এখনও সহানুভূতিশীল। এটাই সবচেয়ে বেশি আশংকার। এখান থেকে বেরিয়ে আসা হয়তো এতোটা সহজ নাও হতে পারে।

বাংলাদেশের জঙ্গীবাদ ও এর বিস্তার সম্পর্কে বুঝতে হলে সবার আগে বুঝতে হবে বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যাগুরু মুসলমানদের হৃদয় এবং এখানকার মাটি ও মানুষের গতি প্রকৃতি। তেম বুঝতে হবে, তেমনিভাবে এখানকার ভু-রাজনৈতিক অবস্থারও চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এসব বিষয়গুলো ফুৎকার দিয়ে উড়িয়ে দিলে আপাত স্বস্তি মিললেও আখেরে আমাদের পস্তাতেই হবে।

বাংঙ্গালি মুসলমানদের চিন্তা চেতনা ও হৃদয় বুঝতে নির্মোহ দার্শনিক আহমদ সফার চেয়ে ভালো আর কী বিকল্প থাকতে পারে । স্পষ্টভাষী ছফা লিখেছিলেন, বাঙালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসা ভাবে অনেক কিছুই জানার ভান করে আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সঙ্কুচিত। বাঙালী মুসলমানের মন এখনো একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা এ-কথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না। যেহেতু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রসারমান যান্ত্রিক কৃৎকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশলাভ করছে এবং তার একাংশ সুফলগুলোও ভোগ করছে, ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এঁচড়েপাকা শিশুর মতো। অনেক কিছুরই সে সংবাদ জানে, কিন্তু কোনো কিছুকে চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপন করতে জানে না। যখনই কোনো ব্যবস্থার মধ্যে কোনরকম অসংগতি দেখা দেয়, গোঁজামিল দিয়েই আনন্দ পায় এবং এই গোঁজামিল দিতে পারাটাকে রীতিমত প্রতিভাবানের কর্ম বলে মনে করে। শিশুর মতো যা কিছু হাতের কাছে, চোখের সামনে আসে, তাই নিয়েই সে সন্তুষ্ট। দূরদর্শিতা তার একেবারেই নেই, কেননা একমাত্র চিন্তাশীল মনই আগামীকাল কি ঘটবে সে বিষয়ে চিন্তা করতে জানে। বাঙালী মুসলমান বিমূর্তভাবে চিন্তা করতেই জানে না এবং জানে না এই কথাটি ঢেকে রাখার যাবতীয় প্রয়াসকে তার কৃষ্টি-কালচার বলে পরিচিত করতে কুণ্ঠিত হয় না।

FB_IMG_1467485831247আমরা নিজেদের সংঙ্গে যদি আর প্রতারণা না করি, যদি দার্শনিক ছফার এই উক্তিসমূহকে সত্য বলে মানতে আপত্তি না করি, তাহলে আমাদের সমস্যা বহুলাংশে সমাধান করা সম্ভব।

যেকোন প্রকারেই হোক আমাদের রাজনীতিবীদগণ জঙ্গীবাদের গুরুত্ব বুঝতে সম্পুর্ণরূপে ব্যর্থ্য হয়েছেন। তাই কখনো জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করেছেন কখনো বা বেমালুম চেপে গেছেন অথবা ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেছেন। নিজেদের সীমাব্ধতাকে কখনো বাংলাদেশের কয়েকশত বছরের সংখ্যালঘু ধর্মপ্রাণ সহজ সরল, নিরীহ ধরণের অল্পশিক্ষিত মুসলমান একথা অনস্বীকার্য যে, বিশ্বের কোথাও কোন সন্ত্রাসী বা গেরিলা গোষ্ঠী একাশ্রেণীর জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া টিকে থাকতে পারেনা। সেটা যেমন শ্রীলংকার তামিলদের বেলায় সত্য, তেমনি নেপাল-ভারতের মাওবাদী, পশ্চিম আফ্রিকার কসাইগোষ্ঠী বোকো হারাম, সোমালিয়ার আল সাবাব, আফগানিস্তানে ঘাটি গেড়ে বসা দুর্ধর্ষ আলকায়েদা অথবা আজকের পৃথিবীর ত্রাস ইসলামিক স্টেইট তথা আইএস বা আইসিস।

পরিতাপের বিষয় হলো বাংলাদেশের একশ্রেনীর মানুষ বুঝে বা না বুঝে তাদের হৃদয়ে এই ঘৃণ্য সন্ত্রাসীদের জন্য একধরণের মমত্ববোধ বা করুণা লালন করে। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগে পরস্পরকে ঘায়েল করতে জংগী তকমা পরানোর চর্চা তো রীতিমতো শিল্পে পরিণত হয়েছে। কোন একটা ঘটনা ঘটলেই, সেটা সরকার ও বিরোধী পক্ষের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের কান পর্যন্ত পৌছানো বাকী। তারপরই শুরু হয়ে যায় ‘ব্লেম গেমিং’।

ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের স্প্যানিশ রেষ্টুরেণ্ট হৌলি আর্টিজানে গত শুক্র-শনিবারের নারকীয় ঘটনার পরেও দেশের যেসব বেকুবরা পরিস্থিতির গভীরতা অনুধাবন করতে পারছে না, তাঁরা আগামীকাল বুঝবেন, আগামীকাল না বুঝলেও পরশু বুঝবেন অথবা হয়তো তার পরের দিন নিজেই এই নির্মমতার শিকার হতে হতে বুঝতে পারবেন, তখন হয়তো অনেক দেরী হয়ে যাবে। ফেরার কোন পথ থাকবেনা।

কেন এমন সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো?

আমাদের পাপের পাল্লা নানা কারণে অনেক বেশি ভারী হয়ে উঠেছে।রোম যেমন একদিনে তৈরি হয়নি, তেমনি আজকের পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের ভেতরকার পরিস্থিতি যেমন এর জন্য দায়ী, তেমনি সুযোগ সন্ধানী কাছের বা দূরের পরাশক্তিও এরজন্য কম দায়ী নয়।

বাস্তবতা হলো, এখন আর অস্বীকার করার কোন রকমের সুযোগ নেই। বিরোধী দলের কাজ, বিচ্ছিন্ন ঘটনা, এসব বলে পার পাওয়ার কোন রাস্থা খোলা নেই।

ধর্মীয় কারণে বাংলাদেশের জঙ্গীবাদ পরিস্থিতির এমন অবনতি হয়েছে, একথাটি পপুলারলি প্রকাশ ও প্রচার করা হলেও এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না যে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্বব্যাপী জঙ্গী নেটওয়ার্ককে সম্প্রসারণের ভয়াবহ চক্রান্তই বর্তমান জঙ্গি তৎপরতার রসদ যুগিয়েছে।

artisanসরকার বারবারই দাবি করে আসছে, দেশে আইএস বা আল-কায়েদা নেই। এখানে যারা হামলা করছে, তারা দেশীয় জঙ্গি। সে কারণেই ভয়টা বেশি। তাঁদের শিকড় কি এতটাই গভীর যে সরকারের ভাষায় জিরো টলারেন্স দেখানোর পর তারা আরও ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হলো। ২০০১-২০০৬ এর বিএনপি আমলে সংঘটিত জঙ্গি হামলার ব্যাপারে বলা হতো তাতে সরকারের মদদ ছিল। কিন্তু এখন কী দোহাই দেবেন ক্ষমতাসীনেরা? বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াত আছে—এ রকম স্থানে জঙ্গি হামলা হতে পারে বলে বিদেশি কূটনীতিকেরা অনেক আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু  সরকার কি জঙ্গী নির্মূলে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে?

২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে শাহবাগ আন্দোলনে এবং এরপরে জামায়তের নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীর রায়, তার প্রতিবাদের জনতার বিক্ষোভ এবং সেটাকে জামাত-শিবিরের নাম দিয়ে ইচ্ছেমতো গুলি করে পাখীর মতো মানুষ মারার ঘটনাটি ছিলো একটি টাংর্নি পয়েন্ট।

এরপরে নাস্তিক ব্লগার রাজীব হত্যা এবং রাজীবকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ বানিয়ে, সরকার প্রধানসহ সকলের – রাজীবের রাজনৈতিকায়ন এবং আমার দেশ মারফত রাজীবের চরম নোংরা ঘৃণ্য লেখাগুলোকে, পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশ করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া। শুধুমাত্র, বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করার জন্যে যে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন মাহমুদুর রহমান, তার দায় বাংলাদেশকে আরো অনেক বছর বইতে হবে। অপরদিকে শাহবাগের যেসব বীর পুঙ্গবরা রাজীবের মত পারভার্ট পর্ণগ্রাফিক লেখককে হিরো বানিয়েছিলো এবং বাংলাদেশের অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত জনগণের মাঝে ব্লগার মানে, আল্লাহ, রাসুলকে নিয়ে পর্ণ লেখার ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত করেছিলো, তারা ইতোমধ্যেই বর্জিত হয়েছে।

এরপরে হেফাজতের সমাবেশ ও মতিঝিলে যৌথবাহিনীর গণহত্যা। শাহবাগের মুখোমুখি দাড়িয়ে যাওয়া ‘নাস্তিক’ বিরোধী হোফজত গোষ্ঠী যেভাবে নাস্তিক হত্যার পক্ষে দেশব্যপী স্লোগান তুলেছে এবং ফতোয়া দিয়ে জনমত তৈরি করেছে যা জঙ্গী ধারণাকে অঅরও গভীরে প্রোথিত করেছে। দেশের অল্পশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং প্রতিক্রিয়াশীল মুসলমানদের একটা বড় অংশ সন্ত্রাসের এবং খুনের প্রতি মনোভাবকে গড়ে তুলেছে।

সর্বশেষ, ২০১৪ এর একদলীয় নির্বাচন এবং গণতন্ত্রহীন গত দু’বছরের সীমাহীন স্বেচ্ছাচার, প্রতিবেশি রাষ্ট্রের আগ্রাসন, দেশের স্বার্থ বিক্রি করে ক্ষমতা কুক্ষীগত করে রাখার অপচেস্টা আর ক্ষমতাসীনদর অনিয়ম, পর্বতসম দুর্ণীতি ও প্রতিপক্ষ দমনে স্টীমরোলার চালানো। সরকার যখন বিরোধীপক্ষ দমনে ব্যস্ত কিছু বিদেশী শক্তি, যারা ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে আগ্রহী, তারাও সুযোগ খুঁজছিলো কিছু একটা করার। ফলে সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ‘হাতের পাঁচ’ আইএসকে খুব সহজেই বাংলাদেশে ইমপোর্ট করতে বা রাস্তা দেখিয়ে দিতে শতভাগ সফল হয়েছে।

বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদে দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক চক্রান্ত

অন্তত দেড় দশক ধরেই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশকে নিয়ে পরিকল্পিত-সংঘবদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সর্বমুখী ক্রুসেড শুরু হয়। শুরুটা যদিও পশ্চিমা মিডিয়ার মাধ্যমে ঘটেছিল। তবে এর মূল অনুঘটক ছিলো কাছের ও দূরের কতিপয় রাষ্ট্রশক্তি।বাংলাদেশকে নিয়ে সেই সময়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় যেসকল ‘কোকুন অব টেরর’ কাহিনী লেখা হয়, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ঐসব আজগুবি প্রচারণায় হতবাক হয়েছিল। বাংলাদেশের মিডিয়া, গোয়েন্দা সংস্থা যেসব জঙ্গি তৎপরতার খবর পায়নি, ঐসব পশ্চিমা মিডিয়ায় তা প্রচারিত হয়েছে। বাংলাদেশ যদি জঙ্গিদের ‘অভয়ারণ্য’ হয়ে থাকে এবং বাংলাদেশের মাদরাসাগুলো যদি ‘জঙ্গিবাদের প্রজনন ক্ষেত্র’ হয়ে থাকলে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিলেই পারতো। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরণের কোন পদক্ষেপের কোন নজীর নেই। জঙ্গিবাদীদের ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলার নাটের গুরুদের চিহ্নিত কখনো চিহ্নিত করা হয়নি। বরং নানা ভাবে রাস্ট্র তাদেরকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েছে।

‘Bangladesh : The Next Afganistan?’-বইয়ের লেখক- গবেষক-হিরন্ময় কারলেকার এবং তার সহযোগী সুমিত গাঙ্গুলি হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশের জঙ্গীবাদ নিয়ে ২০০২ সালে এক গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। হিরন্ময় কারলেকার তার বইয়ের অধিকাংশ Reference নিয়েছেন ‘ডেইলি স্টার’, ‘প্রথম আলো’ থেকে। প্রকাশিত কোন রিপোর্ট, ছবি এবং ভিডিও চিত্র যেখানে আদালতও অপরাধ প্রমাণের অকাট্য দলিল হিসেবে স্বীকার করে না, সেখানে হিরন্ময় কারলেকার ডেইলি স্টার-প্রথম আলো শাহরিয়ার কবীর এবং কিছু বিদেশী ভাড়াটে সাংবাদিকের জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত মনগড়া কাহিনী অবলম্বন করে ভুয়া থিসিস তৈরি করে বাংলাদেশকে ‘পরবর্তী আফগানিস্তান’ হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন।

৯/১১-এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ প্রসারিত করে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে জঙ্গি বানিয়ে নব্য ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাববলয় তৈরির যে আন্তর্জাতিক নীলনকশা প্রণীত হয়েছে, তাকে যায়নবাদী নীলনকশায় পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে আটলন্টিক ও ভারত মহাসাগরের দুই পারের দুই পরাশক্তি।

এ প্রসঙ্গে‘নিউজ উইকে’ প্রকাশিত সুমিত গাঙ্গুলির এই উক্তিটি বেশ প্রণিধানযোগ্য: তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে বলেছিলেন : “If we get a grip on radicals in Afganistan and Pakistan, then they will land in Bangladeshs’… Its like squezing a baloons.”_ যদি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের জঙ্গিদের কব্জা করা যায়, তাহলে তারা এসে হাজির হবে বাংলাদেশে… এটা যেন বেলুন টেপাটেপির মতো ব্যাপার। অর্থাৎ সন্ত্রাসী-জঙ্গি তালেবানদের পিছু ধাওয়া করে ইন্দো-মার্কিন-যায়নবাদী চক্র-আফগানিস্তান-পাকিস্তান থেকে তাদের বাংলাদেশের জালে ঢোকানোর পরিকল্পনা করেছে। এ যেন শিয়াল ধাওয়া করে পাতাজালে ঢুকিয়ে শিকার করার আদিম বর্বরতার পুনরাবৃত্তি; (Newsweek, 5 Feb.07)|

জঙ্গিবাদ প্রমোট এবং কাউন্টার জঙ্গিবাদী এ্যাকশন পরিচালনার পুরো বিষয়ই মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা কর্মসূচির অংশ। বিন লাদেনের সম্পর্কও ছিল সিআইএ ও পেন্টাগনের সামরিক স্ট্র্যাটেজিস্টদের সাথে। ইহুদিবাদী তাত্ত্বিকরা জঙ্গিবাদের ‘বাইবেল’ হিসেবে পরিচিত স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন’ সভ্যতা ও প্রগতির শত্রু হিসেবে ইসলাম ও মুসলমানদের টার্গেট করার পর পেন্টাগন বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রসমূহের প্রতিরক্ষাবাহিনী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহকে জঙ্গিবাদ বানানো ও জঙ্গিদমনে একক ফর্মূলা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে জঙ্গিবাদ ইস্যু সর্বাত্মকভাবে ব্যবহার করে আসছে।

গুলশানে সন্ত্রাসী হামলার সময়ে অন্তত দু’টি রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের তৎপরতা এবং সহযোগিতার জন্য নানা ধরনের তোড়জোড় দেখে গত দুই দশক যাবৎ বাংলাদেশের মাটিকে জংগীদের জন্য উর্বর করার জন্য তাদের সম্পৃক্ততার কথা কেনো জানি বারবার করে মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে।

বাংলাদেশের কাউন্টার টেরোরিজম ও বাস্তবতা

গুলশানের সন্ত্রাসী ঘটনায় গোয়েন্দা বিভাগের এসি রবিউল এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন যেভাবে বোমার আঘাতে সহজ শিকার হলেন, আর টিঙটিঙে একদল তালপাতার সেপাই সদৃশ কনেস্টবল গুলি খেয়ে পড়ে গেলো, তাতে করে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে ন্যুনতম ধারণাও যে নেই, এটাই প্রমাণ করে। যারা হাত, পা, চোখ বেধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ সন্ত্রাসীদেরকে বিচার বহির্ভূতভাবে

হত্যা করে বীরের মতো প্রেসরিলিজ লিখে সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়, তাদের পারফর্মেন্স এর চেয়ে যে ভালো হবে না, সেটা সহজেই অনুমেয়। সন্ত্রাস নির্মূলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহ ও এর যথাযথ ব্যবহারের জন্য নামকা ওয়াস্তে কোন দফতর নয়, বরং বিশেষায়িত কাউন্টার টেরোরিজম ফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তথ্য ও গবেষণা সেল গঠন ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। সন্ত্রাস নির্মূলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাস নির্মূল জোটে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবী।

আমাদের শিশুতোষ মিডিয়া

শুক্রবার যখন গুলশানে সন্ত্রাসী হামলা চলছিলো, সারাদেশ তখন ভয়ে-বিস্ময়ে হতবাক, তখন বাংলদেশ টেলিভিশন প্রচার করছিলো রবীন্দ্র সংগীত। হায়! এমন আমরা কাঠের ঢেকি যদি হয় রাষ্ট্রের প্রধান গণমাধ্যম, কীভাবে এসব বস্তা পচা মাল জঙ্গীবাদের মোকাবেলায় কাজ করবে। আর বেসরকারী গণমাধ্যম! বিডিআর বিদ্রোহের সময়ে আমাদের গণমাধ্যম ন্যাক্কারজনকভাবে তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছিলো। তার ধারাবাহিকতায় ছোট বড় একের পর এক ক্ষমাহীন ভুল করেই চলছে। গত তিন দশকে দেখতে দেখতে বেশ বড় পরিসরের একটি শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে বাংলাদেশে, কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই মিডিয়াকে সঠিক পথে গাইড করার মতো কোন সুষ্ঠু নীতিমালা নেই, নেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার কোন জায়গা। ফলে বালখিল্যতা, স্বেচ্ছাচারিতা, আর অপেশাদারিত্বের তীর্থ হয়ে উঠেছে আমাদের গণমাধ্যম। সন্ত্রাস নিমূলে, সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমকে প্রস্তুত হতে হবে সবার আগে। কিন্তু এই পথ ভুলো বেপরোয়া গণমাধ্যমকে কে ঘুম থেকে ডেকে তুলবে?

জঙ্গিবাদ ও রাজনীতিবিদদের প্রস্তুতি

আমাদের কোনভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক পর্যায়ের লড়াই। সংক্রমণের ন্যায়, মহামারীর ন্যায় ক্রমশ: ছড়িয়ে পড়ছে নানান প্রান্তে। তবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য অভিন্ন থাকলেও প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

তাই আজান শোনার পরে এশার নামাজ ক্বাজা করে কেন মানুষ খুন করতে গেল, কিংবা রোজা না রেখে কেন খুনোখুনি করছে, এমন সস্তা দরের কূ-তর্ক করে কোন লাভ নেই। কোন তদন্ত, প্রমান ছাড়াই কাউকে দায়ী করে দেয়ার মতো শিশুতোষ প্রতিক্রিয়ার জন্যও একটা সময়ে আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে দাবী করেছেন যে, আমরা সব কয়টা জঙ্গীকে শেষ করেছি, আপাত দৃষ্টিতে এই দাবীর কথাটি অসার ও ফলাফল শুণ্য বলে মনে হয়েছে।যারা মনে করে, মরলে শহীদ হয়ে বেহেস্তে যাবে, তাদেরকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে থামানোর চেষ্টা যে ভুল সিদ্ধান্ত, সেটা না বুঝতে পারা হচ্ছে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। যখন হামলার ঘটনা ঘটছিলো, ঠিক তখনই বিএনপি নেত্রীর পক্ষ থেকে তার নিরাপত্তার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানানো হলো। অন্যান্য রাজনীতিবিদগণ হয়তো টিভির সামনে কিংবা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

এক সময়কার সেই জঙ্গী জঙ্গী খেলাটা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার উপক্রম। তবে এখনও নাটাইয়ের সূতোটি ছিড়ে যায়নি। এখন ইচ্ছে করলে ঘৃণার বাষ্প ছড়িয়ে এদের আরো বেশি করে শহীদ হতে অনুপ্রানিত করতে পারি, অথবা ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করে সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে দীর্ঘ মেয়াদি কাজ শুরু করতে হবে। রাজনীতিবীদদেরকেই এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালক করতে হবে।

আগামীকাল সকালে যদি টিভির স্ক্রলে এমন কোন সংবাদ দেখি, বেগম খালেদা জিয়া তার ধুনক ভাঙ্গা পণ ভঙ্গ করে স্বউদ্যোগে গণভবনে গিয়ে হাজির হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রাজ সিংহাসন ছেড়ে সকল অতীত ভুলে গিয়ে খালেদা জিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে, তারপর দুজনে এক সোফায় বসে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রাস্ট্রের পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে বসে গেলো। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সহাস্য বদনে হাতহালি দিয়ে সাদরে সমর্থণ জানাচ্ছে। আর মীর জাফর ইনু, মিনুরা ইদুরের মতো পেছনের দরজা দিয়ে নিরবে সটকে পড়তে শুরু করছে, কতোইনা ভালো হতো। আমাদের দু:খিনী বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে যে ঘনকালো মেঘের ঘনঘটা, হয়তো রক্ষা পেতো।

রক্তাক্ত শুক্রবারের হৌলী আর্টিজান সন্ত্রাসী ঘটনা গোটা জাতির জন্য ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত এর বিকট ঘণ্টা বাজিয়ে গেলো। হয়তো এখনও কিছুটা সময় আছে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার পথে যাত্রা থামিয়ে বাংলাদেশের স্বাভাবিক ও কাঙ্খিত গন্তব্যে ফিরে আসবে।

  • জাহিদ আল আমীন, সাংবাদিক ও গবেষক। ই-মেইল: zahidcu@gmail.com

[নিবন্ধটির মতামত সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে বার্তাবাংলা’র সম্পাদকীয় নীতির কোনো সম্পর্ক নেই।]

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »