মোস্তাফা জব্বার »

বাংলাদেশের একটি প্রযুক্তি বিপ্লব তিরিশ বছরে পা দিয়েছে। একে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করার কোনো কারণ আমার কাছে মনে হচ্ছে না। যদিও দেশের অর্ধেক মানুষের বয়সই তিরিশ বছর নয় বা কোটি কোটি মানুষের জন্মই ১৯৮৭ সালে হয়নি এবং তাদের স্মৃতিতে তিরিশ বছর আগের অবস্থাটি উপস্থাপন করা একটি কঠিনতম কাজ। তথাপি কম্পিউটারে বাংলা পত্রিকা আনন্দপত্র প্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণটিকে আমি ভুলে থাকতে পারি না। সেই বছরের ১৬ মে আনন্দপত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট গৌরবের সময়টিকে স্মৃতিচারণ হিসেবেও আমাদের স্মরণে আনা প্রয়োজন। একেবারে সাদামাটাভাবে ১৯৮৭ সালের ১৬ মে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক আনন্দপত্রের ৩০তম জন্মদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমি তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী আনোয়ার জাহিদ, তৎকালীর বাংলা প্রযুক্তিবিদ সৈয়দ মাইনুল হাসান এবং আনন্দপত্রের সঙ্গে যুক্ত সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি স্মরণ করছি আনন্দপত্র প্রকাশের মূল প্রযুক্তির উদ্ভাবক গৌতম সেন ও স্বাতী বন্দোপাধ্যায়কে যাদের প্রযুক্তিকে সৈয়দ মাইনুল হাসান আমাদের প্রয়োজনীয় লাগসই করে দিয়েছিলেন বলেই আনন্দপত্র প্রকাশিত হতে পেরেছিল। একই সঙ্গে আমি খোন্দকার আলী আশরাফ, তৌহিদুল আনোয়ারসহ দেশের কাগজের পত্রিকা জগতের অসংখ্য মানুষের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি যে, তাদের আস্থার জন্য আনন্দপত্র থেকে পুরো দেশের মুদ্রণ ও প্রকাশনা কম্পিউটারের যুগে প্রবেশ করতে পারে। একই সঙ্গে আমি কম্পিউটার ব্যবহার করে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা দৈনিক আজাদ, দৈনিক দেশ, দৈনিক করতোয়া ও দৈনিক বাংলার বাণীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে আনন্দপত্রের হাত ধরে বিজয় বাংলা সফটওয়্যার ও কি-বোর্ডের জন্মের বিকাশের, উদ্ভাবন ও গবেষণার পাশাপাশি কোটি কোটি ব্যবহারকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বাংলাদেশের প্রযুক্তি বিপ্লবে ডিজিটাল বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো অনুষঙ্গ এত বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।
যারা এখন ইন্টারনেটের যুগে বাস করেন এবং ফেসবুক মানে রোমান হরফে বাংলা লেখা বা এসএমএস বলতেই পুরোই রোমান হরফ বলে গণ্য করেন বা যারা রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লিখে নিজেকে ধন্য মনে করেন তাদের কাছে ২৯ বছর আগে ১৬ মে সিসার হরফ ছেড়ে কম্পিউটারে কম্পোজ করা একটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করার কোনো গুরুত্ব নাও থাকতে পারে। সেটির প্রকাশও আমি দেখেছি। এই সময়কালে কাগু-ছাগু থেকে এমন কোনো গালি নেই যা আমি খাইনি। এমনকি আমার প্রযুক্তি অন্য কেউ ব্যবহার করায় তাকে সেটি ব্যবহার না করার অনুরোধ করে নিজে, বাপ-দাদা-চৌদ্দ গোষ্ঠীতো বটেই আমাকে যারা সমর্থন করেছেন তাদেরও গালি খেয়েছি। আমি এদের দায়ী করি না। কারণ তারা যেমন করে ১৯৮৭ সাল দেখেনি তেমনি করে মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষা ও বঙ্গলিপির মধুরতা অনুভব করতে পারেনি। আমাদের মাঝে এখন যেমন বাংলা ছেড়ে পালানোর সময় বিরাজ করছে তেমনি করে মা ও মাতৃভাষাকেও ছাড়ার সময় য়েছে। আমরা এখন এতটা নিচে নেমেছি যে, গর্ভবতী স্ত্রীকে আমেরিকা নিয়ে গিয়ে সন্তানের নাগরিকত্ব জন্ম সূত্রে আমেরিকান বলে নিশ্চিত করার চেষ্টাও করছি। ফলে যাদের দেশের প্রতি দরদ নেই তাদের মায়ের ভাষার প্রতি দরদ থাকার কোনো কারণ নেই।
সবাই জানেন ১৬ মে ১৯৮৭ তারিখে বাংলা সাপ্তাহিক আনন্দপত্র প্রকাশ করে আমি কম্পিউটার দিয়ে বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করার যুগে প্রবেশ করি। তখন আমরা সৈয়দ মাইনুল হাসানের মাইনুল লিপি ব্যবহার করেছিলাম। মুনীর কি-বোর্ডকে অনুসরণ করে ৪ স্তরের কি-বোর্ড বানিয়েছিলাম যার নাম ছিল জব্বার-আমার বাবার নামে নাম। কিন্তু কি-বোর্ডটির সমস্যা ছিল ১৮৮টি বোতাম মুখস্থ রেখে বাংলা টাইপ করতে হতো। বিজয়ের জন্মের পেছনে প্রযুক্তিগত প্রধান কারণ এটি। টাইপ রাইটার, সিসার কম্পোজ বা ফটোটাইপ সেটারে বাংলা লিখতে গিয়ে অনুভব করেছি যে, রোমান কি-বোর্ড দিয়ে অবিকৃতভাবে বাংলা বর্ণমালা তৈরি করা সত্যি সত্যি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। হাজার বছরের বাংলা ভাষার ইতিহাসে এই সংকট মোকাবেলায় বাংলা অক্ষর কমানো, যুক্তাক্ষর বর্জন, অর্ধবর্ণ ব্যবহার এবং রোমান বা আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগগুলোর অন্যতম একটি কারণ ছিল বাংলা যুক্তবর্ণ। আমি স্বপ্ন দেখতাম, কবে, কেমন করে এই যুক্তবর্ণের শেকল থেকে মুক্তি পাব। বিজয় সৃষ্টি করে সেই শেকলটা আমি ভেঙেছি।
বাংলার ছাত্র বলে কিনা জানি না, এটি আমার মাথায় পুরো ১৯৮৭-৮৮ সাল জুড়েই ঘুরপাক খাচ্ছিল। যেহেতু আমি নিজে ‘জব্বার’ কি-বোর্ড বানিয়েছিলাম সেহেতু যুক্তাক্ষর তৈরির গিøফগুলো সম্পর্কে আমার ধারণা খুব স্পষ্ট ছিল। কিন্তু আমি চাইছিলাম এমন একটি উপায়, যার সাহায্যে আমি ব্যবহারকারীকে ডক-বোর্ড যুক্তাক্ষরের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। সেই ভাবনা থেকেই ‘বিজয়’ ডক-বোর্ডের নকশা তৈরি করতে থাকি। পুরো বছরজুড়ে মোহাম্মদপুরের ৪২ সি কাজী নজরুল ইসলাম রোডের দোতলার বাসায় কত রাত যে আমি পায়চারি করে কাটিয়েছি তা মনে করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোনোমতেই কম্পিউটারের সীমাবদ্ধ বোতামের মাঝে সব বাংলা বর্ণের ঠাঁই করতে পারছিলাম না। তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, এমন একটা কিছু আমি অবশ্যই খুঁজে পাব- আমার মাথায় এমন কিছু আসবে যার ফলে যুক্তাক্ষর নিয়ে কাউকে ভাবতে হবে না। তবে আমার সমস্যাও ছিল অনেক। আমি বাংলা ভাষা ও লিপি জানি, কম্পিউটারের ভাষা বা প্রোগ্রামিং জানি না। কেমন করে কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম কাজ করে এবং তাতে ডক-বোর্ড ইন্টারফেস কেমন করে তৈরি করা যায় তার কোনো ধারণাই আমার ছিল না। এছাড়া বাংলাদেশে মেকিন্টোস কম্পিউটারের জন্য প্রোগ্রামার পাওয়া যেত না। ভারতের রাবা কন্টেলের অরুণ নাথ তখন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি অরুণকে জানালাম, আমি মেকিন্টোসের জন্য বাংলা ডক-বোর্ড ড্রাইভার বানাতে চাই। আমার হাতে ফন্ট আছে কিন্তু ফন্ট দিয়ে বাংলা লিখতে কি-বোর্ডের চার স্তর ব্যবহার করতে হয়। আমি চার স্তর চাই না, স্বাভাবিক দুই স্তর চাই। অরুণ আমাকে দিল্লি আসার বুদ্ধি দিলেন। সেখানে পরিচয় করিয়ে দিলেন, কুতুব হোটেলের কম্পাউন্ডের ভেতরেরই ডি-২ ফ্লাটে রাবা কন্টেলে কর্মরত প্রোগ্রামার দেবেন্দ্র জোশীর সঙ্গে। বেঁটে খাটো জোশী এবং তার সঙ্গে কর্মরত আরো কয়েকজন সহকর্মী তখন ম্যাকিন্টোসে ভারতীয় ভাষার ডক-বোর্ড ড্রাইভার এবং ফন্ট নিয়ে কাজ করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল দেবনাগরী ভাষাকে কম্পিউটারে প্রয়োগ করা। পাঞ্জাবি, গুজরাটি, তামিল, তেলেগু এবং মালয়ালমও তাদের তালিকায় ছিল। তবে বাংলা তাদের কাজের তালিকায় ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে তখন ম্যাকের বাজার খুব ছোট। রাহুল কমার্স নামে তাদের যে ডিলার কলকাতায় ছিল, তারা তাদের বঙ্কিম ফন্ট নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু আমি সুনন্দা ফন্টের পাশাপাশি বাংলা ডক-বোর্ড ড্রাইভার নিয়েও ব্যস্ত ছিলাম। ডিসেম্বর মাসের শুরুতে (১৯৮৮ সন) জোশীর সঙ্গে কুতুব হোটেলের ডি-২ ফ্লাটে কাজ করা শুরু করে আমি অনুভব করলাম যে, আমার স্বপ্ন সফল করা যেতে পারে। জোশী বাংলা জানতেন না কিন্তু হিন্দি খুব ভালো জানতেন। ফলে আমি যখন তাকে হসন্ত (জোশী বলত হলন্ত) ব্যবহার করে যুক্তাক্ষর তৈরির কথা বললাম, জোশী তখন আমাকে আমার ফন্ট ফাইলটি (সুনন্দা ফন্টটি থেকে আমি তন্বী সুনন্দা ফন্ট বানাই) সাজিয়ে নিতে পরামর্শ দেন। জোশী তখন আমাকে এটিও জানান যে, ফন্টে কোডের ব্যবহার বাড়ালেও কোনো অসুবিধা হবে না। আমি ১৮৮ অক্ষরের সংখ্যা বাড়িয়ে ২২০টি অক্ষর দিয়ে তন্বী সুনন্দা ফন্ট বানাই। আসকি কোডের যেসব জায়গায় কন্ট্রোল কি আছে সেগুলো ছাড়া ব্যবহার করা যায় এমন সব কোডই আমি ব্যবহার করলাম। একটি যুক্তাক্ষরের তালিকাও আমি বানাই। আমার সঙ্গে বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয় বইটি ছিল। বইটি দিল্লি যাওয়ার পথে কলকাতায় কিনেছিলাম। তালিকাটি সেই মোতাবেক করা হয়। প্রতিটি যুক্তাক্ষর এবং তার কি কম্বিনেশন ও গিøফ চার্ট তৈরি করা হয়। যতদূর মনে আছে, কুতুব হোটেলের ছয় তলায় ৫২২ নম্বর রুমে বসে সাদা কাগজ আর পেন্সিল দিয়ে বারবার কাটাছেঁড়া করে দুটি তালিকা প্রস্তুত করি আমি। একই সঙ্গে প্রস্তুত করি বিজয় ডক-বোর্ড কোন নিয়মে কাজ করবে তার নিয়মাবলি। সে জন্য বিজয় ডক-বোর্ড প্রস্তুতের আগে আমাকে ভাবতে হয় অনেক কিছু।
বিজয় ডক-বোর্ড সেই সময়ে বিদ্যমান সব কি-বোর্ডের মৌলিক ধারণা থেকে স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। বিজয়ের জন্মের সময় শহীদলিপি ও আবহ ডক-বোর্ড ছাড়া টাইপরাইটারের মুনীর ডক-বোর্ড প্রচলিত ছিল। শহীদলিপি ও আবহ ডক-বোর্ড আমার পছন্দ হয়নি। কম্পিউটারের অন্য ডক-বোর্ড শহীদলিপিও চারস্তরের এবং বিজ্ঞানসম্মত নয়। টাইপরাইটারে প্রচলিত মুনীর ডক-বোর্ডটি ওই যন্ত্রের জন্য গ্রাফিক্যালি সব বর্ণ তৈরি করতে পারলেও মুনীর চৌধুরীর পৌনঃপৌনিকতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও কম্পিউটারের জন্য উপযোগী নয়। এতে কেবল যে গিøফকে ডক-বোর্ডের বোতামে বসানো হয়েছে এবং বিন্দু ও মাত্রা সহযোগে বর্ণমালা তৈরি করার উপায় তৈরি করা হয়েছে তাই নয়, এর সংখ্যা, চিহ্ন ইত্যাদিও সঠিকভাবে স্থাপিত নয়। কম্পিউটারের জন্য আমার তৈরি করা জব্বার ডক-বোর্ডভিত্তিক এবং চার স্তরের বিধায় সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে বিজয় ডক-বোর্ড বিন্যস্ত করার সময় বিজ্ঞানসম্মত কিছু বিষয়কে মাথায় রাখা হয়েছে। এর মাঝে প্রধানতম বিষয়টি হলো হসন্ত ব্যবহার করে যুক্তাক্ষর ও স্বরবর্ণ তৈরি, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে জোড় ইত্যাদি।
কুতুব হোটেলের ৫২২ নম্বর ঘরে বসেই যখন শেষ নকশাগুলো সম্পন্ন করা হয়, তখন গভীর রাত। দিল্লির শহরতলীর নীরব ওই হোটেলে কান পাতলে আমার শ্বাসের আওয়াজও আমি শুনতে পেতাম। চারপাশে জনবসতি নেই বলে গাড়িঘোড়াও চলে না। কাজ শেষ করে ফেলায় প্রায় সারা রাত উত্তেজনায় ঘুম হয়নি। আমার যদি সেই সময়ে মোবাইল ফোন থাকত তবে আমি অবশ্যই জোশীকে গভীর রাতেই জাগাতাম। আমার টেনশন ছিল, আমার লেআউট, যুক্তাক্ষরের সর্বশেষ তালিকা এবং ডক-বোর্ডের নিয়মাবলি কাজ করবে তো? যদি ‘না’ করে তবে আবার চেষ্টা করা যাবে। কিন্তু যদি করে তবে সেই আনন্দ আমি কোথায় রাখব?
সম্ভবত শেষ রাতে শুয়ে পড়েছিলাম এবং ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরে ডি-২ তে গিয়ে জোশীকে প্রস্তুতই পেয়েছিলাম। জোশী আগের দিনই বাংলা ডক-বোর্ডের জন্য মূল প্রোগ্রামিং তৈরি করে রেখেছিল। আমার কাছ থেকে ডক-বোর্ডের লেআউট, বাংলা অক্ষরের কোড নং, লাতিন হরফের কোড নং এবং যুক্তাক্ষর তৈরির সিকুয়েন্স ও তার কোডগুলো একের পর এক বসিয়ে গেলেন। ডি-২ অ্যাপার্টমেন্টে বসে ঘণ্টা তিনেকের মাঝেই আমার তালিকার কাজ শেষ হলো। জোশী প্রোগ্রামটি কম্পাইল করলেন নশনফ নামে। আমিই তাকে বলেছিলাম, এর নাম হবে বিজয় ডক-বোর্ড। সামনেই ছিল ১৬ই ডিসেম্বর। সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওই দিনে এই ডক-বোর্ডটি আমি প্রকাশ করব। স্বল্পভাষী জোশী মাত্র তিন কিলোবাইটের ওই প্রোগ্রামটি আমাকে দেখালেন। আমি আমার আসল নামের গোলামের জি অক্ষরটিকে লিংক বা হসন্ত হিসেবে রাখলাম। ইচ্ছে করলে এর বদলে এইচ বোতামটিকেও লিঙ্ক হিসেবে রাখা যেত। বাংলা ডক-বোর্ড ও ইংরেজির মাঝে টোগল কি হিসেবে রাখলাম কন্ট্রোল অপশন-বি। ‘বি’ দিয়ে বিজয় এবং বাংলা- দুটিই বোঝায়।
বিজয় ডক-বোর্ডটি যুক্ত করে বিজয় সফটওয়্যারের প্রোগ্রামিং শেষে নশনফ ফাইলটি জোশী তার ম্যাকের সিস্টেম ফোল্ডারে কপি করে দিয়ে আমাকে বললেন, পরীক্ষা করে দেখ। আমি তন্বী সুনন্দা ফন্ট এবং এর ১৪ পয়েন্ট সাইজ বাছাই করে কন্ট্রোল+অপশন বি টাইপ করে প্রথমেই ইংরেজি এইচ বোতামে চাপ দিই। ম্যাকের (সম্ভবত ম্যাক টু) পর্দায় বাংলা ব হরফ দেখা যায়। এরপর আমি ইংরেজি জে, জি এবং জে টাইপ করি। ক-এর পর হসন্ত এবং এরপর ক্ক হতে দেখে আমি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠি- জোশী বিজয় কাজ করছে। জোশীর কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। একটা নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে জোশী বললেন, সবগুলো কম্বিনেশন চেক করো। আমার পেন্সিলে তৈরি করা ডক-বোর্ড লেআউট এবং যুক্তাক্ষরের তালিকা আমি একের পর এক পরীক্ষা করি। বেশ সময় নেয় তাতে। সম্ভবত দুপুরের খাবার সময় পার হয়ে যায়। কিন্তু আমার পেটে কোনো ক্ষুধা লেগেছিল বলে মনে নেই। পরীক্ষা শেষে বিস্ময়করভাবে আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে, আমার তালিকা, ডক-বোর্ড লেআউট বা জোশীর কোডিংয়ের কোথাও সামান্য চুল পরিমাণ ত্রুটি ছিল না। সেদিন আমি যে এনকোডিং করেছিলাম এখনো তা (কিছুটা বদলে) ম্যাক ওএস ৯.২ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। সেদিন যে ডক-বোর্ড তৈরি করেছিলাম তাই এখনো ব্যবহৃত হয়। তবে কম্পিউটার সোর্সের পারফেক্ট ডক-বোর্ডের লেআউটে ভুল করে ৎ নিচে ও ঃ উপরে ছাপা হয়। ফলে ডক-বোর্ড বদলাতে হয়- যা এখন বিজয় কি-বোর্ডে বজায় রয়েছে। তবে পরে চেক করে দেখেছি দু-একটি যুক্তাক্ষর প্রথম তালিকায় ছিল না। ভø, স্ক¬ এমন দুটি যুক্তাক্ষর আমি পরে যুক্ত করেছি।
তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, ওই দিন পৃথিবীতে আমার চাইতে সুখী মানুষ আর একটিও ছিল না। সারা দুনিয়ার সব আনন্দ একত্রিত করেও আমাকে ওই দিনের চেয়ে আনন্দিত করা সম্ভব হবে না। আমার মনে আছে, দিল্লির এই এলাকাটি আমার ভালো লাগত না। রুক্ষ মরু অঞ্চলের মতো অজানা কাঁটা জাতীয় গাছে ভরা কুতুব হোটেলের চারপাশটাও আমার তেমন পছন্দ ছিল না। সবুজ দেশের মানুষের কাছে এমন মরু টাইপের অঞ্চল ভালো না লাগারই কথা। তবে হোটেলের রুম থেকে পুরোটাই সবুজ দেখা যেত। দালানকোঠা চোখেই পড়ত না। আমি কুতুব হোটেলের আশপাশে হাঁটতাম না। হোটেল কম্পাউন্ডটা খুব সুন্দর বাড়ির মতো। বরং ওটা আমি পছন্দ করতাম। যতবারই আমি কুতুব হোটেলে থেকেছি (ওই সময়ে অনেক বার) ততবারই কেনাকাটা করতে হলে চলে যেতাম চাঁদনী চক বা এসি মার্কেট এলাকায়। কিন্তু সেদিন বিকেলে বালুময় কুতুব মিনার এলাকাটি মনে হলো ঘন সবুজ নরম মাটিতে মাখানো বাংলার মাটি। বালিতে পা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে মনে হয়েছে সবুজ দুর্বাঘাসের কার্পেটে ভর দিয়ে হাঁটছি, আর আমার জুতা ডেবে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে অদূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কুতুব মিনারের চুড়োটার দিকে চোখ পড়তেই মনে হয়েছে, ওখানে উঠে দাঁড়ালে কি ঢাকা দেখা যাবে? ওখান থেকে ডাক দিলে কি রিনকি, তন্বী শুনবে? হেলেন, রাব্বানী বা কিবরিয়া কি পাবে আমার গলার আওয়াজ? যদি তখনই হামিদকে দেখিয়ে দিতে পারতাম, ওর ডিজাইন করা হরফকে আমি কত সুন্দর করে সাজিয়ে ফেলেছি? বন্ধু জালালের চিকচিক করা চোখটা খুশিতে কত সুন্দর হয়ে উঠবে তা কি ওই মিনারের ওপর দাঁড়িয়ে দেখা যাবে? আমার মনে পড়ছিল, খুব কাছাকাছিই হজরত নিজামউদ্দিনের মাজার। একবার ভেবেছিলাম, বাবার মাজারের কথা স্মরণ করতে ওখানে যাব? মা ও সানুর কথাও মনে পড়েছিল। কিন্তু সেদিনের সেই আনন্দ ভাগ করার কেউ ছিল না দিল্লিতে। তবে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমার স্বপ্নের এই বিজয় অবশ্যই বিশ্ব জয় করবে। এত বছর পর পরিমাপ করতে পারছি না সেই স্বপ্ন কতটা সফল হলো। তবে এটুকু বুঝি বিজয় আমাকে বিশ্বজুড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের মাঝে পরিচিত করেছে। এটিই এই জীবনের বড় পাওনা। বস্তুত ১৬ মে ১৬ থেকে যে যাত্রা তারই পরিপূর্ণতার নাম ১৬ ডিসেম্বর। প্রায় ১৯ মাসের অবিরাম লড়াইয়ের নাম বিজয়। আমি স্মরণ করতে পারি যখন দেশ, ইত্তেফাকের মতো পত্রিকাগুলোতে এই প্রযুক্তি দেয়া শুরু করি তখন সিসার হরফের শ্রমিকরা মোস্তাফা জব্বারের কল্লা চাই স্লোগান দিয়েছে। তবে তারাই আবার কম্পিউটার শিখে কম্পিউটার অপারেটর হয়ে মোস্তাফা জব্বার জিন্দাবাদ স্লোগানও দিয়েছে।
সেই সময়ের স্মৃতি যেটুক স্মরণ করতে পারছি তার একটি বড় অর্জন ছিল কম্পিউটারের সঙ্গে অতি সাধারণ মানুষদের সম্পৃক্ত করা। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ যারা জীবনে কখনো কম্পিউটার দেখেনি তারা দেশের সব পত্রিকা, সাময়িকী, বই প্রকাশনায় এমন এক সময় তৈরি করেছে যা আজকালের বাংলা পত্র-পত্রিকাম বইপত্র ও সাময়িকীগুলো দেখলে অনুভব করা যায়। আজ ১৬ মের কথা কেউ স্মরণ করুন বা না করুন বাংলাদেশের মিডিয়ার ডিজিটাল বিপ্লবের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে কারো পক্ষেই অস্বীকার করা সম্ভব হবেনা। সেই বিপ্লবের জন্য একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ হাতে নিয়ে দাবানল তৈরি করার জন্য নিজের কাছে সন্তুষ্টিটাও কম নয়।
আজকে যখন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ বা ডিজিটাল যুগের কথা বলছি তার ভেতটাও ১৬ই মে ১৯৮৭ তেই নির্মিত হয়েছিল। একটি ছোট বীজ সেদিন প্রোথিত হয়েছিল বলেই আজ ডিজিটাল বাংলাদেশ নামক বৃক্ষটি এত বিশাল দৃশ্যমান হচ্ছে।
মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, লেখক, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »