সমস্যায় জর্জরিত পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার সেবার কথা বিবেচনা করে ১৯৯৮ সালে সৌদি সরকারের অর্থায়নে পেকুয়ায় ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালটি ৩১ শয্যা বিশিষ্ট। প্রতিষ্ঠার তিন-চার বছরের মধ্যে এ হাসপাতালে যারা চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তারা এখনো বহাল রয়েছেন। হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সসহ অন্যান্য ৫৯টি পদের মধ্যে ৪৭টি পদে জনবল রয়েছে। এলাকাবাসী ও রোগীদের অভিযোগ চিকিৎসকরা তাদের বেশির ভাগই নিজেদের বাসা ও প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

ডাক্তারদের জন্য হাসপাতালে আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তো দূরের কথা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিজেও হাসপাতালের আবাসিকে থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে হাসপাতালে গিয়ে সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতাল থেকে রোগীদের বিনামূল্যের ওষুধ ঠিকমতো দেয়া হয় না বলেও গুরুতর অভিযোগ এলাকাবাসীর। ডাক্তার ওষুধ প্রেসক্রাইভ দেয়ার পর রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়। হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটর ব্যবস্থা না থাকায় রাতে যখন বিদ্যুৎ থাকে না তখন পুরো হাসপাতালটি ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়। নিজস্ব কোনো ল্যাব না থাকায় রোগীদের বিভিন্ন রোগ পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তারদের পছন্দের প্রাইভেট ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়। ওই সব ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে কমিশন নেয় চিকিৎসকরা। অপরদিকে বাইর থেকে পরীক্ষা করিয়ে আসতে আসতে রোগীদের জীবনের অবস্থা আরো সঙ্কটাপন্ন হয়ে যায়। রোগীদের নি¤œমানের খাবার সরবারহ করা হয়, তাই রোগীরা বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে খাবার আনেন। রোগীদের সঙ্গে নার্সদের সম্পর্ক অনেক তফাৎ। নার্সরা রোগীদের সেবা দেয়ার পরির্বতে মালিক কর্মচারীর ভূমিকায় অবর্তীণ হন। হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ফলে বিশেষ করে মহিলারা এবং হাসপাতালে আগত রোগীরা রাতের বেলায় তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে চরম আতঙ্কে থাকেন। উপজেলার শীলখালী ইউনিয়নের সবুজ পাড়া থেকে আড়াই বছর বয়সের বাচ্চা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন শাহ আলম। তার ছেলের শ্বাস কষ্টের রোগ রয়েছে। হাসপাতালে বাচ্চাকে ভর্তি করানোর পর ডাক্তার আর তার ছেলেকে দেখতে আসেনি। শুধু সকালে একবার এসে দেখে যায়। দিনের পর সারারাত চলে গেলেও ডাক্তারের দেখা মেলে না একবারো। শাহ আলম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, খেটে খাওয়া মানুষ আজ দুইদিন যাবৎ হাসপাতালে পড়ে আছি ছেলের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর ডাক্তার একবার দেখেই শেষ। আর দেখতে আসেননি। তিনি আরো বলেন, বাচ্চার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। ডাক্তার ডাকতে গেলে বলেন ডাক্তার জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত রয়েছেন আপনি নার্সকে দেখান। নার্সের কাছে গেলে চিকিৎসা তো দূরের কথা ভালো ব্যবহারও পাওয়া যায় না। রোকসানা বেগম উপজেলা সদরের বাইম্যাখালী থেকে ডায়রিয়া আক্রান্ত এক বছর বয়সী বাচ্চাকে নিয়ে আসেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। কিন্তু আসার দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তিনি জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের দেখা পাননি। জরুরি বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত চিকিৎসক তখন খেলা দেখা নিয়ে ব্যস্ত। পরবর্তীতে তিনি ফিরে যাওয়ার সময় জরুরি বিভাগের পিয়ন ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার ছেলেকে দেখান। উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের পালাকাটা এলাকা থেকে স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান আবুল খায়ের। তিনি বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই। ফলে বহির্বিভাগের রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালে যে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা পাওয়ার কথা তা আমরা পাচ্ছি না। হাসপাতালের ভেতরে অনেক গরম। বিদ্যুৎ থাকলেও ফ্যানগুলো দুর্বল হওয়ার কারণে গরম কোনোভাবে কাটছে না। তিনি আরো বলেন, সরকারি হাসপাতালে সব আছে নেই শুধু রক্ষণাবেক্ষণ আর সংস্কার। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মুজিবুর রহমান নিজেও হাসপাতালের আবাসিক ভবনে রাত্রে থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি রাত্রে পার্শ্ববর্তী পেকুয়া বাজারে তার নিজস্ব প্রাইভেট ক্লিনিকে থাকেন। আর সকাল-বিকেল এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত তিনি সেখানেই রোগী দেখেন। ফলে সব সময় হাসপাতালটি ডাক্তারশূন্য থাকে। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার সংকট এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা না থাকার কারণে দিনের পর দিন মানুষ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সচ্ছল পরিবারের কোনো রোগী চিকিৎসা নিতে আসে না। শুধু খেটে খাওয়া দিন মজুর, নি¤œ আয়ের অসচ্ছল পরিবারের লোকজন চিকিৎসা নামের সোনার হরিণকে খুঁজতে আসে। উপজেলাতে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়ার জন্য জরুরি বিভাগে থাকে না পর্যাপ্ত চিকিৎসক। এছাড়াও হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য কোনো ল্যাব না থাকাতে জরুরি বিভাগের রোগীদের বিভিন্ন প্রাইভেট ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়। এতে ডাক্তারদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ পছন্দের ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে বলা হয় অন্যথায় রিপোর্টে ভালো কিছু আসে নাই বলে রিপোর্ট দেখে না। রোগী যখন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসার জন্য যায় তখন রোগীর অবস্থা থাকে আশঙ্কাজনক। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালের যোগসাজশ রয়েছে। সে সব প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক সরকারি হাসপাতালের খোদ টিএইসও এবং আরএমও। তারা অধিকাংশ সময় জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের এখানে ভালো পরীক্ষার জন্য যন্ত্রাংশ, ডাক্তার নেই বলে তাদের প্রাইভেট হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। চিকিৎসকরা তাদের জরুরি সেবা না দিয়ে বলেন, আগে যে পরীক্ষাগুলো দিয়েছি সেগুলো করিয়ে আনেন। রিপোর্ট দেখে তারপর চিকিৎসা শুরু করব। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রাংশ। ফলে রোগীদের প্রতিনিয়ত পোহাতে হচ্ছে যন্ত্রণা। আরো অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের রোগীদের সরকারিভাবে যে খাবার দেয়া হয় তা নি¤œমানের। খাবার তৈরি করার সময় তরকারিতে নি¤œ মানের মসলা, পামওয়েল তেল ব্যবহার, কম দামি চালের ভাত রান্না করা হয় বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন পেকুয়া উপজেলা শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকার চলে। আর সরকার সে টাকায় জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গুটি কয়েক চিকিৎসক জনগণকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। উপজেলা স্বাস্থ্য পরিচালনা কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাই যদি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখতেন তাহলে হাসপাতালের এ করুণ অবস্থা হতো না বলেও জানান তিনি। পেকুয়া-চকরিয়ার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নানা সমস্যা সম্পর্কে বলেন, আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে হাসপাতালের ডাক্তারের শূন্য পদ, এ্যাম্বুলেন্স, জেনারেটরসহ নানা সমস্যার কথা উল্লেখ্য করে একটি আবেদন দিয়েছি। খুব শিগগিরই এসব খাতে বরাদ্দ আসবে। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী সভায় তিনি উপস্থিত হয়ে এসব বিষয় খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বার্তাবাংলা রিপোর্ট