বার্তাবাংলা ডেস্ক »

birth certificateইঞ্জিনিয়ার কল্যাণ মিত্র বড়ুয়া। সপরিবারে থাকেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। বাংলাদেশের অতিসাধারণ একটি বিষয় একটি পরিবারকে যে কীভাবে হয়রানিতে ফেলতে পারে, তা বোধহয় ইঞ্জিনিয়ার কল্যাণ বাবুর চেয়ে আর কেউ ভালো জানে না। আবারও বলছি, বিষয়টি খুব ছোট এবং সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ কাজে অতি সাধারণজ্ঞান নামের যে ‘কমনসেন্স’ দরকার ছিল, তা না খাটানোর কারণে ইউরোপের বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে অন্যরকম।

ঘটনার শুরু চট্টগ্রামের রাউজানের পূর্ব গুজারা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সর্বশেষ গন্তব্য ফ্রান্সের বাংলাদেশ দূতাবাস, ফ্রান্স। যা নিয়ে বলবো সেটির বিষয়ই তো বলা হলো না! আগেই বলেছি, এটি বাংলাদেশে মুড়ি-মুড়কির মতো! খুব সাধারণ জিনিস! হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। আর সেটির নাম ‘জন্মনিবন্ধন সনদ’ বা ‘বার্থ সার্টিফিকেট’।

কল্যাণ বাবুর তিন সন্তানের জন্য বাংলাদেশ থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ আনাতে হবে। কারণ অপ্রাপ্তবয়স্ক মাইগ্র্যান্টদের জন্য প্রতি পাঁচবছর অন্তর এটি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। সারা ইউরোপজুড়েই এটি নিয়ম। খুব কাছের আত্মীয় না থাকলে দূর পরবাসে বসে জন্মনিবন্ধন সনদ যোগাড় করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপারই বটে। রাউজান থেকে না হয় পারা গেলো, কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শক্ত লোহার গেট পার হওয়ার মতো লোক ‘ম্যানেজ’ করাও তো রীতিমতো দূরূহ।

অনেক কষ্টেসৃষ্টে আগস্ট মাসে এক ভাইয়ের মাধ্যমে সন্তানদের জন্মনিবন্ধন যোগাড় করালেন তিনি। কিন্তু সনদের অক্ষরগুলি বোঝার কোনো উপায়ই নেই। যা হোক, হয় তো কাজ হয়ে যাবে!

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ম মেনে তা আবার করাতে হলো নোটারি। সেখানে পড়লো দু’টি সিল। অথচ জন্মনিবন্ধনগুলি আসল কি নকল তা মন্ত্রণালয় খুব সহজেই নিবন্ধনের নাম্বার দেখে যাচাই করে নিতে পারে। কিন্তু সরকারি কাগজ হওয়ার পরও নোটারি বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়! যা-ই হোক, সনদ তিনটি যখন এলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, তখন সেখানকার সংশ্লিষ্টরাও যেন তাদের ‘কমনসেন্স’ হারিয়ে ফেললেন! এমনভাবে সিল মারলেন- সনদের সবচেয়ে যে মূল বিষয়, অর্থাৎ নাম্বার, তা-ই দেখা যাচ্ছে না! এরপর তা এলো ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাসে। তারাও কাগজের ‘নাকবরাবর’ মারলেন সিল! ট্রান্সলেটর কিছুই বুঝতে পারলেন না। শেষতক সনদগুলি আর কোনো কাজেই লাগানো গেলো না।

কিন্তু এই সনদ তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লাগবেই লাগবে। আবার শুরু হলো মিশন। প্রথমবার ৫-৭ হাজার টাকা খরচ করেও ব্যর্থ হলেন কল্যাণ বাবু। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের ‘কাজ’ করিয়ে দেওয়ারও একটি চক্র আছে। বাধ্য হয়ে তাদের শরণাপন্ন হতে হলো। কিন্তু বিধিবাম! দ্বিতীয়বারও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আর হাজার হাজার টাকা খরচ করে আনালেন তিন বাচ্চার জন্মসনদ। কিন্তু তথৈবচ! সিলের কালি যেন এবার আরও কড়া! আর তার বিপরীতে সনদের অক্ষরের কালি যেন এবার আরও মলিন! এছাড়া সনদের যে কনটেন্ট তা বোঝার তো কোনো জো-ই নেই! বেচারা কল্যাণ বাবু পড়লেন মহাঝামেলায়। ইউপি থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোথাও ফোন করা বাকি রাখলেন না। কিন্তু ‘জরুরি-জনগুরুত্বপূর্ণ’ কাজের চাপে তাদের তো এসব ঠুনকো বিষয় নিয়ে কথা বলার সময়ই নেই! বিষয়টি তারা অনুধাবন করতে পেরেছেন বলেও মালুম হয় না। সনদের ছাপার কোয়ালিটি আর সিলের বহর দেখে তিনি দূতাবাসকে অনুরোধ করেছিলেন পেছনে সিল মারতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! পাঁচ-পাঁচটি সিল মারলেন আর একটি স্বাক্ষর করলেন সনদের কনটেন্টের ওপরই!

পেশাগত কাজের সুবাদে ইঞ্জিনিয়ার কল্যাণ মিত্র বড়ুয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় বছর চারেক আগে। সবসময় দেশ-বিদেশের নানান বিষয় নিয়ে কথা হয়। সেদিনও তার এই ‘ছোট্ট’ অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়ে। সনদের স্ক্যান কপি আমাকে ই-মেইলও করলেন। কিছু মানুষের ‘কমনসেন্স’ আর ইউরোপে বসে তার কী যে হয়রানি হতে হচ্ছে তা বর্ণনা করলেন। আর প্রশ্ন রাখলেন অনেকগুলি; বাংলাদেশের তিনটা অফিসের একটা লোকও কি জানে না- সিলটা কোথায়, কীভাবে মারতে হয়? কমনসেন্সের কি এতটুকুনও নেই? কমনসেন্স অর্জনের জন্যে তো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও যাওয়া লাগে না। কিন্তু তারা তো এসবও পার করে এসেছেন! তাহলে ‘বাংলাদেশি কমনসেন্স’ই এমন? আমি কোনো জবাব দিতে পারিনি! আজ শুধু লিখলাম এই ‘ঠুনকো’ বিষয়টা। এমন ক’টা ঠুনকো ঘটনা আর আসে পত্রিকার পাতায়? সূত্র : বাংলানিউজ

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »