‘বাদ’ পড়ার গুঞ্জনে সমশেরের পদত্যাগ

বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: আগাম ইঙ্গিত না দিয়েই হঠাৎ করে দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সমশের মবিন চৌধুরী। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এ রকম এক নেতার পদত্যাগের কারণ কী তা নিয়ে তৈরি হয়েছে জল্পনা-কল্পনা। বিএনপির দলীয় সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক শৃঙ্খলা মেনে না চলা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না করা প্রভৃতি কারণে দলীয়ভাবে বিরূপ সময় পার করছিলেন সমশের মবিন। এ ছাড়া নতুন কমিটি থেকে বাদ পড়ার গুঞ্জন ছিল তার। এ সব কারণে অভিমানে দল ছেড়েছেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘বিএনপি কোনো নেতা জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এটাই দলের প্রথা। কিন্তু সমশের মবিন চৌধুরী চেয়ারপারসনের সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎ করেননি। এ কারণে তার প্রতি অনেক নেতার ক্ষোভ ছিল।’ এমনকি নেত্রীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করেননি মবিন। কী কারণে চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি তিনিই ভালো জানেন। তিনি বলেন, ‘জেল থেকে মুক্তির পর দলের ভারপাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সকল সিনিয়র নেতাকর্মীরা যদি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন তাহলে তিনি কেন পারেননি?’ প্রশ্ন রাখেন বিএনপির এ সিনিয়র নেতা। সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির এ নেতা জেল থেকে বের হওয়ার পর তার মধ্যে একটু একটু করে চেয়ারপারসনের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হতে থাকে। আর এ পদত্যাগ তারই বহিঃপ্রকাশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। সমশের মবিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক এক সহকর্মী জানান, দীর্ঘদিন বন্দি জীবন কাটানোর পর বেশকিছু দিন হলো জামিনে মুক্ত হন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এদিকে জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর খালেদা জিয়া তার কোনো খোঁজ-খবর নেননি। এ ব্যাপারে তার মধ্যে দীর্ঘদিন এক ধরনের কষ্ট লুকিয়ে ছিল।’ এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরেও তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন না। এ নিয়ে দলের একাদিক নেতার সঙ্গে হতাশার কথাও জানিয়েছেন বিএনপির এ নেতা। তিনি আশায় ছিলেন খালেদা জিয়া তাকে ডাকবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। তাকে ছাড়াই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন খালেদা জিয়া। দলের কাছ থেকে এমন অবহেলায় তিনি ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে পদত্যাগের বিষয়ে সমশের মবিন বলেন, ‘স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে অবসরে যাচ্ছি। মূলত শারীরিক কারণেই অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার বাম চোখে সমস্যা, চোখে অস্ত্রোপচার করতে হবে।এ ছাড়া প্রোস্টেডের সমস্যা আছে। রাজনীতি করতে হলে যে পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম ও সময় দেওয়া দরকার তা দিতে পারছি না।’ এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন যাওয়ার পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। তিনি দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না? এবার সেই জল্পনা-কল্পনার অবসান হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চেয়ারপারসনের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র। অতীতে কয়েকবার দল গোছানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এবার বিএনপিতে বড় পরিবর্তনই আনছেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। জানা গেছে, লন্ডন থেকে খালেদা জিয়া বড় চমক নিয়েই দেশে ফিরছেন। আর সেই পরিবর্তনে দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদ ও নির্বাহী কমিটি ভেঙে সাজানো হবে। এর মাধ্যমে ভারমুক্ত হচ্ছে দলটির মহাসচিবের পদটিও। এর মাধ্যমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হচ্ছে ভারমুক্ত। তাছাড়া দলে যোগ্য, নিষ্ঠাবান নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, নতুন সকল কমিটিতে নতুনদের গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রবীণদের মূল দায়িত্বে না রেখে তাদের কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করা হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নভেম্বরের ৫ অথবা ৬ তারিখে দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় সূত্র। গত ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডন যান তিনি। চেয়ারপারসনের প্রেস উইং কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আগামী মাসের ৫ অথবা ৬ তারিখে দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তবে আমি নিশ্চিত নয়। চেয়ারপারসন দেশে আশার পরেই মুলত বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে পরিবর্তন আনা হবে। এ ক্ষেত্রে কমিটির অন্তত ৬ জন সদস্য কমিটি থেকে বাদ পড়তে পারেন বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে দলটির স্থায়ী কমিটির একাদিক নেতা বার্ধক্যজনিত কারণে কমিটির বৈঠকে আসতে পারেন না। তার মধ্যে অন্যতম ড. আর এ গনি, এম এ শামসুল ইসলাম। এ ছাড়া নারী সদস্য বেগম সারওয়ারী রহমানকেও কমিটির বৈঠকে দেখা যায় না। অন্যদিকে দলটির অন্যতম সিনিয়র নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী একাত্তরে মানবতাবিরোধী কাজে জড়িত থাকার কারণে তার ফাঁসির রায় হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। তাদের জায়গায় আসবে নতুন মুখ। তবে তারা কারা এ ব্যাপারে তিনি জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর দলটি ৩৭ বছর অতিক্রম্য করলেও এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়েনি। ওয়ান-ইলিভেনের সময় থেকেই মুলত দলটির বিপর্যয় নেমে আসে। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কঠোর মনোভাব অন্যদিকে নিজেদের পাহার সমপরিমাণ ব্যর্থতা দলটিকে একপেশে করে রেখেছে। এ ব্যাপারে দলটির সিনিয়র নেতারা বলছেন, ‘সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকলেও দলের জনপ্রিয়তা এখনো একটুও কমেনি বরং বেড়েছে।’ দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশে পার্লামেন্টে গণতন্ত্র নেই। পৃথিবীর কোথাও বিরোধী দলবিহীন সংসদ এমনভাবে চলতে পারে না। এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য গড়তে বাধ্য করতে হবে। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের একাদিক কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের নামে হাজারো মামলা হয়েছে। এ রকম প্রতিকূল পরিবেশে দল পুনর্গঠনের কর্মযজ্ঞ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ বিষয় নয়। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সেই কাজটি করবে। আশা করি খালেদা জিয়া দেশে আসার পরেই তা সম্পন্ন হবে।’