মালয়েশিয়াতেও মানব পাচারকারীদের বন্দিশিবিরের সন্ধান

বার্তাবাংলা ডেস্ক :: থাইল্যান্ডের মতো মালয়েশিয়াতেও মানব পাচারকারীদের বন্দিশিবিরের সন্ধান পাওয়া গেছে। আর সংখ্যায় তা অনেক বেশি।

গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় গভীর জঙ্গলে কমপক্ষে ছয়টি বন্দিশিবির এবং সেখানকার কবর থেকে ৩২ জন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীর দেহাবশেষ ও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। তারপর থেকে এ অভিযোগ উঠেছে।

চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে বঙ্গোপসাগর দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছে ২৫ হাজার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা। এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ—তথ্য এএফপি, রয়টার্স, ইউএনবি, মালয়েশিয়া ক্রোনিকল, জাকার্তা পোস্ট ও দ্য স্টারের।

গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডে উদ্বাস্তুদের সহায়তায় নিয়োজিত সংগঠন ‘রোহিঙ্গা ক্লাবের’ সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল কালাম অভিযোগ করেন, পাচারের শিকার রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া সীমান্তে যেসব বন্দিশিবির রয়েছে, সেখানে ৮০ ভাগই মালয়েশিয়ার ভেতরে। পাচারকারী চক্রের সঙ্গে অনেক মালয়েশীয় সরাসরি জড়িত। বন্দিশিবিরের একেকটিতে রয়েছেন ৫০০ থেকে ১০০০ অভিবাসী।

আবদুল কালাম বলেন, গত ১০বছরে এ পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে। সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে প্রায় ৫০টি বন্দিশিবির। এসব শিবিরে অভিবাসীদের খাবার ও পানির সংকটে ফেলে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়।

তিনি আরো বলেন, ‘মিয়ানমারের জনগণকে বলেছি মালয়েশিয়া না আসতে। কেননা, তারা অপহরণ ও পাচারকারীদের মারধরের শিকার হতে পারেন। কিন্তু তারা এ কথা বিশ্বাস করেনি।’

মালয়েশিয়ায় বন্দিশিবির থাকার এ অভিযোগের ব্যাপারে থাইল্যান্ডের চতুর্থ আর্মি রিজিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্রাকান চোলেয়ুথ নির্দিষ্ট করে দেশটিকে অভিযুক্ত না করলেও বলেন, সীমান্তে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যে বিশেষ অভিযান চলছে, তাতে প্রতিবেশী দেশগুলো সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে বলে তার সরকার আশা করে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন: চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর দিয়ে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের উদ্দেশে অবৈধভাবে পাড়ি জমিয়েছে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা। এ সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। গতমাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় সংস্থাটি।

২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে সাগরপথে পাচার হওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।

জাতিসংঘের ওই সংস্থার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাচারকারীদের কবল থেকে বাঁচা লোকজনের তথ্য অনুযায়ী আমরা ধারণা করি, এ বছরের প্রথম তিন মাসে সাগরে ক্ষুধা, পানিশূন্যতা ও নৌকায় থাকা দালালদের নির্যাতনে ৩০০ জন মারা গেছেন।

বিবিসিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী: ইউএনএইচসিআরের ওই প্রতিবেদনের ওপর গতকাল বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। সাক্ষাৎকারে প্রতিবেদনের তথ্য মানতে রাজি হননি তিনি।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দাবির, সমুদ্রপথে মানব পাচারের ঘটনা অনেক কমে এসেছে। এরপরও এখন বাংলাদেশ সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি দেশের ভেতরে অভিযান চালানো হচ্ছে।

এদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, সমুদ্রপথে মানবপাচার বন্ধে এবার থাইল্যান্ড, মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়ে অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ দূতাবাসের বিবৃতি: ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে গতকাল পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাইদা মুনা তাসনিম গত বৃহস্পতিবার রাতে শংখলা প্রদেশে গেছেন। ১ মে এখানকার একটি গণকবরের কাছ থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া দুই ‘বাংলাদেশির’ সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছেন তিনি।

১০০ রোহিঙ্গা অভিবাসী উদ্ধার: থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শংখলা প্রদেশের একটি পার্বত্য এলাকায় ‘মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে আসা’ শতাধিক রোহিঙ্গা অভিবাসীকে পাওয়া গেছে বলে গতকাল জানিয়েছে থাই পুলিশ।

পুলিশ বলছে, সন্দেহভাজন পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় ১১১ জন অভিবাসীকে জঙ্গলে এভাবে ফেলে গেছে।

সহযোগিতা চাইল থাইল্যান্ড: এ অঞ্চলে মানব পাচার-বাণিজ্য বন্ধে মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের সহযোগিতা চেয়েছে থাইল্যান্ড। গতকাল দেশটির সামরিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চাঁন-ও-চাঁ বলেন, এ মাস শেষ হওয়ার আগেই মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের সরকারপ্রধানের সঙ্গে তাঁর বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছেন তিনি।

থাইল্যান্ডে মেয়রকে গ্রেপ্তার: থাইল্যান্ডের পুলিশপ্রধান সোময়ুত পুমপানমং গতকাল জানান, মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অভিযানের মধ্যে পেদাং বেসার শহরের মেয়র বানজং পংফলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি শংখলা প্রদেশের মানব পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা।

এর আগে পাচারকারীদের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে অর্ধশতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।