জড়িতরা ওয়েস্টার্ন মেরিনের শ্রমিক, কারখানা বন্ধ » Leading News Portal : BartaBangla.com

বার্তাবাংলা ডেস্ক »

WESTEN MARIN SHIPYARD (SM)20121001040503বার্তাবাংলা ডেস্ক ::চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়নে বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের চারটি মন্দিরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ক্ষেত্রে জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিনের শ্রমিকরাই মূল ভূমিকা পালন করেছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে প্রশাসন।

আর এক্ষেত্রে ওয়েস্টার্ন মেরিনের কর্মকর্তাদের অবহেলারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার নেপথ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিনের কর্মকর্তাদের কোন ইন্ধন ছিল কি না সেটি এখন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, রোববারের ওই ঘটনার পর সোমবার থেকে থেকে প্রশাসনের নির্দেশে ওয়েস্টার্ন মেরিন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (কারিগরি) আরিফুর রহমান খান।

র‌্যাবের চট্টগ্রাম জোনের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সাইফুল করিম বলেন, ‘শ্রমিকরা ওয়েস্টার্ন মেরিনের কারখানার ভেতর জড়ো হয়ে মিটিং করে। তারপর মন্দিরে হামলা করার জন্য কারখানা থেকে বের হয়। ওয়েস্টার্ণ মেরিনের কর্মকর্তারা যদি মিটিংয়ের সময়ই বিষয়টি আমাদের জানাতেন, তাহলে এতবড় ঘটনা ঘটতনা।’

পটিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ওয়েস্টার্ন মেরিনের কারখানা থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে এতবড় ঘটনা ঘটাল, তাতে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে সেটাই স্বাভাবিক। ওয়েস্টার্ন মেরিন তাদের শ্রমিকদের উত্তেজিত হওয়ার বিষয়টি সময়মত অবহিত করলনা কেন, এক্ষেত্রে তাদের কোন ইন্ধন আছে কিনা এ ধরনের বিভিন্ন বিষয় আমরা খতিয়ে দেখছি।’

তবে দায় এবং ইন্ধনের বিষয়টি অস্বীকার করে ওয়েস্টার্ন মেরিনের পরিচালক (কারিগরি) আরিফুর রহমান খান বাংলানিউজকে বলেন, ‘এটি ছিল বোমা বিস্ফোরণের মতো একটি ঘটনা। শ্রমিকরা এ ধরনের কাজ করবে আমাদের কল্পনায়ও ছিল না। এখানে আমাদের কোনো দায় কিংবা ইন্ধনের কথা বলা হলে সেটি আমাদের প্রতি অবিচার হবে।’

কক্সবাজরের রামু উপজেলায় বৌদ্ধমন্দির ও বসতিতে হামলার ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়নের লাখেরা গ্রামে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে একের পর এক চারটি মন্দিরে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।

দুর্বৃত্তরা অভয় বৌদ্ধ বিহার, কোলাগাঁও রত্নাঙ্কুর বৌদ্ধবিহার, কোলাগাঁও নবারুণ সংঘ দুর্গামন্দির ও জেলেপাড়া মাতৃমন্দিরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর, প্রতিমার মূর্তি তছনছ এবং আসবাবপত্রে অগ্নিসংযোগ করে।

রাতে ওয়েস্টার্ন মেরিনের ভিডিও ফুটেজ দেখে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ২৬ জন শ্রমিককে আটক করে পুলিশ।

পটিয়া থানার ওসি আমিনুর রশিদ জানান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ৩৭ জনের নাম উল্লেখ সহ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার অজ্ঞাতনামা লোককে আসামী করে পটিয়া থানায় তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে।

এর মধ্যে কোলাগাঁও সার্বজনীন রত্নাঙ্কুর বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ শ্রী মৎ দিবানন্দ ভিক্ষু বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। আটক ২৬ জনের মধ্যে ২৫ জন সহ ওয়েস্টার্ণ মেরিনের ৩৭ জন শ্রমিকের নাম উল্লেখ করে এ মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৪৫০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এছাড়া ঘটনার সময় পুলিশের উপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে আরও দুটি মামলা দায়ের হয়েছে।

এর মধ্যে পটিয়া থানার এস আই জাকির হোসেন বাদি হয়ে ৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা দেড় থেকে দু`হাজার জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

এছাড়া পটিয়া থানার এস আই কামাল উদ্দিন বাদি হয়ে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা দেড় থেকে দু`হাজার জনকে আসামী করে আরও একটি মামলা দায়ের করেছেন বলে ওসি জানিয়েছেন।

ওয়েস্টার্ন মেরিনের পরিচালক (কারিগরি) আরিফুর রহমান  জানান, রোববার সকালের শিফটের কাজ শুরুর পরই কিছু শ্রমিক কারখানার ভেতরে জড়ো হয়ে কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ নিয়ে কথাবার্তা বলা শুরু করেন। খবর পেয়ে কারখানার নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ কয়েকজন সেখানে গিয়ে তাদের সরিয়ে দেন।

এর প্রায় ১৫ মিনিট পর শ্রমিকরা আবার কারখানার ভেতরেই আরেক জায়গায় গিয়ে জড়ো হন। খবর পেয়ে কর্মকর্তারা আবারও গিয়ে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেন।

এর কিছুক্ষণ পর তৃতীয় দফায় শ্রমিকরা আবারও সংঘবদ্ধ হন। তারা উত্তেজিত ভাষায় গেট খুলে দেয়ার জন্য নিরাপত্তা রক্ষীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এরপর শ্রমিকরা নিরাপত্তারক্ষীর বাধা উপেক্ষা করেই গেট দিয়ে বেরিয়ে যান।

শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির বিষয়টি জানতে পেরেও প্রশাসনকে জানানো হলনা কেন, এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আরিফুর রহমান খান বলেন, ‘প্রথমে না বললেও শ্রমিকরা বের হবার সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছি। আর কারখানা এত রিমোট এরিয়ায় যে পুলিশের আসতেও একঘণ্টা সময় লেগেছে।’

তিনি দাবি করেন, ঘটনার সঙ্গে প্রায় ২০০-৩০০ লোক জড়িত থাকলেও এর মধ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিনের শ্রমিক ছিল মাত্র ২০-৩০ জন। বাকি লোকজন ওই গ্রামের বলে তিনি জানান।

তবে পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোকেয়া পারভিন বলেন, ‘পাঁচশ’রও বেশি লোক হামলায় অংশ নিয়েছে। ওয়েস্টার্ন মেরিনের শ্রমিকরা কীভাবে কারখানা থেকে বের হল, তাদের গাফেলতি আছে কিনা এগুলো নিবিড়ভাবে তদন্ত করা উচিত। নিজেদের কারখানায় উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক আছে কিনা, সেটি তো তাদেরই খতিয়ে দেখা উচিত ছিল।’

পটিয়া থানার ওসি আমিনুর রশিদ বলেন, ‘আমরা ভিডিও ফুটেজে ওয়েস্টার্ন মেরিনের শ্রমিকদের হামলায় মূল ভূমিকা পালন করতে দেখেছি।’

আরিফুর রহমান খান বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমাদের কারখানায় তিন হাজার বেশি শ্রমিক কাজ করে। কেউ একটা চিৎকার দিলেই সব শ্রমিক জড়ো হয়ে যায়। এত শ্রমিকের বিষয়ে নজরদারি রাখা সম্ভব না।’

এদিকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় কোলাগাঁওয়ে ওয়েস্টার্ন মেরিনের শিপইয়ার্ড কারখানায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করায় সকাল থেকে কোনো শ্রমিক কারখানায় যাননি বলে আরিফুর রহমান খান জানান।

শেয়ার করুন »

লেখক সম্পর্কে »

মন্তব্য করুন »