বস্তায় ভরে নিষিদ্ধ বাণিজ্য

বার্তাবাংলা ডেস্ক ::  বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে পাখি শিকার, হত্যা, পাচার, ক্রয়-বিক্রয় ও আটক রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ নিয়ে গণমাধ্যম ও অধিকার কর্মীরা সোচ্চার হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন কৌশল নিয়েছে। এমনকি প্রশাসনের প্রশ্রয়ে অবৈধ পাখির ব্যবসা চলছে নির্বিঘ্নে।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে পাখি। পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশেই চলছে এ অবৈধ ব্যবসা। পুলিশকে প্রতিদিন মোটা অংকের মাসোহারা দেয়ায় তারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

দীর্ঘদিন ধরে বকসহ বিভিন্ন পাখি বিক্রি করে আসছেন কায়েস নামে এক ব্যবসায়ী। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীতে। রাজধানীর পরীবাগের একটি গলিতে তাদের ‘আড়ৎ’। তিনি প্রতিদিন প্রায় ৪শ থেকে ৫শ বকসহ বিভিন্ন পাখি বিক্রি করেন। তিনি একাই নন, তার সঙ্গে রয়েছে বেশ কয়েজন ব্যবসায়ী। যারা ফেরি করে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে বক বিক্রি করেন।

শুক্রবার সকালে কায়েস নামের ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। বন্যপ্রাণী বিক্রি করা তো অপরাধ? তাহলে এভাবে বক বিক্রি করছেন কেন জানতে চাইলে কায়েস উল্টো প্রশ্ন করে বলেন, ‘জানি অপরাধ, দেশে কি অপরাধ কম হচ্ছে?’

জানতে পেরেছি, আপনি প্রায়ই শাহবাগ থানায় স্বাস্থ্যবান বকগুলো পাঠান এবং এ কারণেই নাকি পুলিশ আপনাকে কিছু বলছে না। কিছুক্ষণ নীরব থাকেন তিনি। এরপর বলেন, ‘বক তো আমাদের কাছ থেকে অনেকে নিয়ে খায়। আপনি যদি কয়েকটা বক খেতে চান, তাহলে কি দেব না? এ কথা বলেই তিনি বকের বস্তা নিয়ে বিক্রি করতে চলে যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার এক ব্যবসায়িক পার্টনার বাংলামেইলকে বলেন, ‘বক বিক্রি অত্যন্ত লাভজনক একটা ব্যবসা। প্রতি বছরে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এ ব্যবসা চলে। কোনো অর্থ বিনিয়োগ ছাড়াই অনেক টাকা আয় করা যায়। ফোন দিলেই বকের পার্টি এসে বক দিয়ে যায় এবং বিক্রির পর টাকা পরিশোধ করতে হয়। তবে শুধুমাত্র একটু এদিক ওদিক ( থানা-পুলিশ) ম্যানেজ করতে হবে।’

ওই ব্যবসায়ী আরো বলেন, ‘বকগুলো রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুরও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে আসে। কয়েকটি হাত বদল হয়ে বকগুলো রাজধানীতে ঢোকে। প্রথমে এলাকা থেকে বকগুলো স্থানীয় শিকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে বকগুলো রাজধানীতে আসে। পরে বস্তায় ভরে ফেরি করে বিক্রি করা হয়। একশো টাকার নিচে কেনা বকগুলো ঢাকাতে বিক্রি হয় দুইশো থেকে আড়াইশো টাকায়।’

পাখি বিক্রি করার সময় পুলিশী বাধার ‍মুখে পড়েন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাঝে মধ্যে টহল পুলিশ সমস্যা করে। তখন টাকা দিলেই সমস্য চুকে যায়। এছাড়া বড় বড় বকগুলো শাহবাগ থানার বড় কর্তার কাছে পাঠানো হয়।’ শাহবাগ থানার টহল পুলিশ নিয়মিত তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যায় বলেও স্বীকার করেন তিনি।

পরিবাগের বাসিন্দা মো. শরিফুল ইসলাম বাংলামেইলকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরে তারা এখানে বকসহ বিভিন্ন পাখি বিক্রি করে আসছেন। একাধিক বার প্রতিবাদ করেও কোনো কাজ হয়নি। এ সময় তিনি পাখি বিক্রি বন্ধ করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।’

পাখি শিকার, হত্যা, পাচার, ক্রয়-বিক্রয় ও আটক রাখার ব্যাপারে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন- ২০১২ এর ৩৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ১ (এক) বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ (এক) লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে সর্বোচ্চ ২ (দুই) বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ (দুই) লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ব্যাপারে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে ১৮ এর (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন।

এ ব্যাপারে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অপরাধ দমন বিভাগের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক অসিম মল্লিক বাংলামেইলকে বলেন, ‘বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে প্রতিদিনই আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তারপরও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নানা কৌশলে তাদের এ অপকর্ম চালাচ্ছে। তবে আমরা খবর পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

পুলিশ জড়িত থাকার বিষয়টিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ টাকা নিলেও সেটা তারা স্বীকার করে না। তাই কিছু করার থাকে না।’ তারা অভিযানের আগে পুলিশকে অবহিত করেন না বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

মাসোহারা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমিতো জড়িতই না। চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি এর সঙ্গে আমার থানার কেউ জড়িত না। তারপরও যদি কেউ জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাঁচার জন্য অনেকেই অনেক কথা বলে। ঠিকানা দেন, আপনাদের সামনেই তাদের ধরে নিয়ে আসছি।’