এ প্রজন্মের ব্রিটিশ বাঙালি রাবিনা খান

বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: লন্ডনের তরুণ প্রজন্মের মাঝে বাঙ্গালীদের জয় জয়কারের মিছিল বেড়েই চলছে। সফলতার ও স্বীকৃতির নয়া এই মিছিলের আরো এক নতুন নাম ব্রিটিশ বাংলাদেশী তরুণী রাবিনা খান।

বলা হতো এক সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেতোনা, সারা বিশ্বে এই ব্রিটিশ মনার্কি একের পর এক ছড়ি ঘুরিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে ব্রিটিশরা এক সময় সারা বিশ্ব শাসন করেছিলো, সেখানে সেই শাসিত বাঙালির নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি ব্রিটিশ বাঙালিরা আজ একের পর এক ব্রিটেনের মূলধারার প্রশাসন, আইন, উন্নয়ন, সমাজ ও অর্থনীতিতে নিজেদেরকে বিকশিত করছে এবং ব্রিটিশ সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে ।

যার প্রমাণ পাওয়া যায় গত রমজানের ঈদ ম্যাসেজে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বাঙালি মুসলমানদের অবদান অকপটে স্বীকারও করেছেন এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ব্রিটেনের মূলধারার প্রশাসন, সামাজিক বিন্যাস ও অর্থনীতিতে প্রভাব রাখায় কমিউনিটি ও কাউন্সিলের কাজের নানাবিধ অবস্থানের পর এই পর্যায়ে এসে টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলর, হাউজিং এবং ডেভেলপমেন্টের কেবিনেট মেম্বার রাবিনা খানকে ‘হিরো অব দ্য ইয়ারে’ ভূষিত করেছে ইউরোপিয়ান ডাইভার্সিটি।

মূলত তার কাজ, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং সমাজ ও কমিউনিটির প্রতি যে দায়বদ্ধতা ও অবদান তারই স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ পুরস্কার পান। ইউরোপিয়ান ডাইভার্সিটি এওয়ার্ডে তাই বলা হয়েছে, “Councillor Khan in recognition of her achievements in promoting equality and diversity in her working life – as a writer and film producer; in her political life – as a ward councilor and Cabinet Member, and in her personal life as a mother of three children and well-respected member of the local community.” অর্থাৎ পুরস্কারের সময়ে তার সার্বিক কাজকেই যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে তা বাংলাদেশী এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের জন্য গৌরবের।

সমস্যা সংকুল জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে একজন রাবিনা খান আমাদের পূর্বসূরীদের যেমন পলা মঞ্জিলা উদ্দিন, রোশনারা আলী, আনোয়ার আলীদের মতো বিজয়ের মিছিলে ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের জয়ের ও সুনাম এবং ঐতিহ্যের পতাকা ধারণ করে নিজেকে জানান দিলেন।

রাবিনা খানকে এ প্রেস্টিজিয়াস পুরস্কারের স্বীকৃতির জন্য অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। ইউরোপিয়ান ডাইভার্সিটি এওয়ার্ড প্রদানকারীরা রাবিনা খানের সাথে আইটিএনের ম্যানেজিং এডিটর রবিন ইলিয়াস, কমেডিয়ান এবং অভিনেত্রী ফ্রানসেস্কা মার্টিনেজকেও শর্ট লিস্টে রেখেছিলেন।

এ ধরনের বিখ্যাত সেলিব্রিটি এবং কমিউনিটির কাজের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্বদের সাথে প্রতিযোগিতা করেই রাবিনা খানকে জয়ের মালা পড়তে হয়েছে ।

এ ব্যাপারে ইউরোপিয়ান ডাইভার্সিটি এওয়ার্ড দেয়ার সময় এক বিবৃতিতে তারা জানায়, “রাবিনা খান মুসলমান মহিলাদের জন্য সত্যিকারের প্রেরণার উৎস। তিনি সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য তার পেশা, পারিবারিক সময় ও মেধা উৎসর্গ করেছেন। তিনি পুলিশ ও ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের সাথে কাজ করেছেন। আর রাবিনা খান এসব কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তার গল্প, উপন্যাস ও অন্যান্য লেখনীর মাধ্যমে”।

কে এই রাবিনা খান

রাবিনা খান বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শেডওয়েলের একজন ব্রিটিশ বাংলাদেশী লেখিকা। তিনি একজন কাউন্সিলর, একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট পলিটিশিয়ান, টাওয়ার হ্যামলেটস এর কেবিনেট মেম্বার এবং একই সাথে তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস বারার একজন কমিউনিটি ওয়ার্কার। তার বিখ্যাত বই আয়েশাদস রেইনবো সূধীজনের প্রশংসা লাভ করেছে। গার্ডিয়ানের ব্লগেও তিনি লিখে থাকেন।

পাঁচ ভাই বোনের সংসারে রাবিনা খান তিন বছর বয়সে বাবা মায়ের সাথে ব্রিটেনের কেন্টে এসে বসবাস করেন। তার পিতা চ্যাটাম ডকইয়ার্ড কেন্টের একজন মেশিন অপারেটর ছিলেন।

রাবিনার বয়স যখন ১৯ তখন ১৯৯২ সালে তার ট্রেইনি টিচার আমিনুর নামের এক বাংলাদেশীর সাথে বিয়ে হওয়ার পর তিনি স্বামীর সাথে টাওয়ার হ্যামলেটসে বসবাস শুরু করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তাদের দুই কন্যা সন্তান রয়েছে।

রাবিনা খানের বই

২০০৩ সালে তার প্রথম প্রকাশন‍া ‘রেইনবো হ্যান্ডস’ প্রকাশিত হয়। এর পরপরই তার ‘শর্ট স্টোরি ইফ বার্ডস কুড ফ্লাই‘ প্রকাশিত হয়। ‘আয়েশাদস রেইনবো’ তার দ্বিতীয় উপন্যাস ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়।২০০৯ সালে ‘বিহাইন্ড দ্য হিজাব’ প্রকাশিত হয়।

পুরস্কার

রাবিনা ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে স্পিটাস্ফিল্ডসে ওমেন্স লিটারেরি ফেস্টিভ্যালে রয়াল লিটারেরী ফান্ড মেন্টরিং স্কিম এ অন্তর্ভুক্ত হন এবং একই সাথে টাওয়ার হ্যামলেটস সিভিক এওয়ার্ডে ভূষিত হন। ২০১০ সালে তিনি ইউরোপীয়ান মুসলিম ওমেন ইনফ্লুয়েন্স এওয়ার্ডের জন্য শর্ট লিস্টেড হন।

রাবিনার যত কাজ

বিবিসি, আইটিভি, রিচ মিক্স কালচারাল ফাউন্ডেশন, ওয়েলকাম ট্রাস্ট, বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্ক, ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ অফিসে কাজ করার দূর্লভ এক গৌরবের অধিকারি আজকের এই রাবিনা খান।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

২০১০ সালে তিনি লেবার পার্টি থেকে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের শেডওয়েলের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য এই আসনে এর আগে তিনবার লেবার দল থেকে প্রার্থী নির্বাচন করে পরাজিত হলে রাবিনা প্রথম দাড়িয়েই লেবার দলকে জয় এনে দেন। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে তিনি বাঙালি মেয়র লুতফুর রহমানকে সমর্থন করার কারণে অন্যান্য আরো নয়জন কাউন্সিলরের সাথে তিনিও দল থেকে বহিষ্কৃত হন।

এরপর থেকে রাবিনাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি লুতফুর রহমানের টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং কাজ করতে থাকেন। তিনি হাউজিং এবং ডেভেলপমেন্ট এর কেবিনেট মেম্বার মনোনীত হয়ে দক্ষভাবে কাজ চালিয়ে যান।

পুরস্কার প্রাপ্তিতে রাবিনা খানের বক্তব্য

ইউরোপিয়ান ডাইভার্সিটি এওয়ার্ড প্রাপ্তিতে রাবিনা খান বলেন, আমি নিজেকে বিপুলভাবে সম্মানিতবোধ করছি, ইউরোপিয়ান ডাইভার্সিটি এওয়ার্ড স্বীকৃতি প্রদান করায় আমি তাদেরকে বিনয়ের সাথে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এই পুরস্কারটি এমন এক সময়ে প্রদান করা হয়েছে যখন সমাজে বিভাজন সৃষ্টিতে অনেক প্রান্ত থেকেই সূক্ষ্মভাবে কাজ করা হচ্ছে, ইন্ধন যোগানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হলে কতকিছু যে অর্জন সম্ভব – এই পুরস্কার সেটাই প্রমাণ করলো। ব্রিটেন ও ইউরোপে সাধারণ পরিবারের মায়েদেরকে যদি আমার কাজ উজ্জীবিত করে, তাদেরকে রাজনীতি এবং জনজীবনে জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়ে আসে এবং বিশেষ করে যদি তারা মুসলিম সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন তাহলে সেটাই হবে আমার বিরাট অর্জন।

লুতফুর রহমানের অভিনন্দন

এ ব্যাপারে টাওয়ার হ্যামলেটস বারার এক্সিকিউটিভ মেয়র ল‍ুৎফুর রহমান বলেন, আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে কাউন্সিলর রাবিনা খান সামাজিক সাম্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে গিয়ে স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। আমি এ জন্য তাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

বিবিসির নিউজ রিডার জেইন হেইল বলেন, ইউরোপীয়ান ডাইভার্সিটি এওয়ার্ড মূলত ইউরোপের মধ্যে জেন্ডার, রেইস, সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন, ডিসেবিলিটি, রিলিজিয়ন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে। এবং সেই সব কাজের মধ্যে সমাজ, কমিউনিটিতে যে নানা ইতিবাচক পরিবর্তন ও গুরুত্বানুসারে উন্নয়ন-বিবর্তনের সূচনা করে সেই সব কাজের স্বীকৃতি এবং সেলিব্রেশনের কাজ করে এবং সম্মানিত করে থাকে।

উল্লেখ্য,এবারের পুরস্কারের বিচারক মণ্ডলীতে ব্যাংকিং এবং বিজনেস প্রফেশনাল ছাড়াও ব্যারোনেস ডোরেন্স লরেন্স, লেবার দলীয় এমপি মাইকেল কাশম্যান, বিবিসি নিউজ নাইট প্রেজেন্টার ইভান্স ডেভিস এর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা ছিলেন।