বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Hang20130206040704বার্তাবাংলা ডেস্ক ::আয়ারল্যান্ড থেকে আমার এক ছোটভাই ফোন করে সোমবার বিকেলে ছ’টার দিকে। কী হচ্ছে দেশে? আমি বলি কালইতো রায়, দেখি-ই না কি হয়। কী জানি কেন সে বলে, না, কিছুই হবে না। আমি বলি ফাঁসি হবেই। সে ক্ষুব্ধ, বলে তাহলে কালই ফোন দেবো।

২) সে আমাকে ফোন করে ঠিকই। সকাল সাড়ে ন’টায় আমি তখন ডাক্তারের কাছে। ছ’মাস পরের নিয়মিত ডায়োবেটিকস পরীক্ষা। সেখানেই মুঠোফোনে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম দেখি। দেখি ফেসবুকের স্ট্যাটাস। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় আমার এক সজ্জন অনুজ কলেজ শিক্ষক লিখেছেন এ রায় মানি না। ফাঁসি চাই। অজানা এক বেদনায় আমি মেডিকেল সেন্টারের চার দেয়ালের দিকে তাকাই। ভাবতে থাকি রক্তচাপ, সুগার লেভেল এখন পরীক্ষা করানো কি সমীচীন। এসময়ই নার্স নাম ধরে ডাকেন। ভেতরে যাই।

তাহলে আর কি থাকলো। হিসেব মিলাতে থাকি। আগের দিন দেখেছি পুলিশের হাতে শিবির কর্মীরা রজনীগন্ধা ধরিয়ে দিয়েছে। কারণটা কি? তারা না কি কোন ঝামেলা ছাড়া সভা করছে তাই। কাদের মোল্লার ফাঁসি হলো না। আমাদের করার কী আছে? ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। আদালতের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। সাক্ষী-প্রমাণই আদালতের বিচার নির্ধারণ করে। কাদের মোল্লার ফাঁসি হবার মতো সে সাক্ষী-প্রমাণ কি ছিল না? সবই ছিল। জাতির প্রত্যাশাও ছিল সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু কী হলো? হঠাৎ করে বদলে গেল বাংলাদেশ, যেন ডিজিটাল বদলে যাওয়া। যে মন্ত্রীরা সময়ে-অসময়ে-অপ্রয়োজনে ওই যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে লম্বা লম্বা কথা বলতেন, তারা নিষ্প্রভ হয়ে গেলেন। অনেকেই এখন বলছেন, আদালতকে আমাদের সম্মান দেখাতে হবে। তাহলে কিসের উপর ভিত্তি করে তারা গত দু‘বছর বললেন, এদের ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েই ছাড়বেন।

আমরাও বিশ্বাস করতে চাই, আদালত ওই নেতাদের  হয়ে কথা বলেন না। কিন্তু তারা এসব বলে সাধারণ মানুষকে কেন প্রত্যাশার ভেলায় ভাসিয়েছিলেন? আর এখন বলছেন, আদালতের স্বাধীনতার কথা। এখন বলছেন তারাও হতাশ। কিন্তু এই হতাশার প্রতিফলন দেখেনি তো বাংলাদেশের মানুষ। বিবৃতি দিয়ে দায় সারতে চাচ্ছেন তারা। অথচ আওয়ামী লীগের মতো বিশাল সংগঠনটিরও একটা বিশাল কর্মী বাহিনী আছে। কি করেছে তারা। একটা উল্লেখ করার মতো মিছিল কি বের করতে পেরেছে তারা? ফাঁসির দাবিতে তারা কি নেমেছে রাস্তায়। শাহবাগের মোড়ের বিক্ষুব্ধ ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের সাথে এসে একাত্ম হয়ে বক্তৃতা দিলেই কি দায় সারা যায়? একাত্ম হওয়া এক জিনিস আর ছাত্রলীগের ব্যানার থেকে হাজারো-লাখো ছাত্রের আহ্বানে থাকতে পারা আরেক বিশালত্ব। এই বিশালত্বের তরঙ্গে সারা দেশ তারা ভাসিয়ে দিতে পারে। এ শক্তি ছাত্রলীগের আছে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

জামায়াত-শিবির ঢাকায় হাজার হাজার মানুষের জঙ্গি মিছিল করে, কাদের মোল্লার বিচারের রায়ে তাদের বিজয় হওয়ার পরও তার রাজপথ ছাড়ছে না। এমনকি মরছে। অথচ আওয়ামী লীগের নাম নিয়ে যে ছাত্ররা সারা বাংলাদেশকে চাঁদা-টেন্ডারে সন্ত্রস্থ করে রাখে, তারা কি করলো। না-কি এখানেও আছে কোন গ্রিন সিগন্যাল? কার? দেশের মানুষকে কি অন্ধ করে রাখা যাবে। মনে রাখতে হবে, বাঁধ ভাঙছে তারুণ্য। এক বুক হতাশা তরুণদের বিক্ষুব্ধ করেছে। তাদের নিয়ে যাচ্ছে ঐক্যের মিছিলে। তারা যেন তাহরির স্কয়ারের মতো ডাকছে—এখানে কোনো বিপ্লব নয়, নয় সরকার পরিবর্তনের ডামাডোল। দীর্ঘ চার দশকের দায় আছে আমাদের। আজকের তারুণ্য এই দায় মেটাতে মিলছে একত্রে। তারুণ্যের এই ক্ষোভকে শক্তির দিকে নিয়ে যেতে হবে। সরকার ভয় পেয়েছে কি না জানি না। কিন্তু তারুণ্য—দীর্ঘ রাত জেগে জেগে একটি সুন্দর সকালের জন্যে জয়গান গাইছে  তরুণরা, কসাইয়ের ফাঁসির দাবিতে তারা নির্ঘুম কাটিয়েছে প্রহর, সকালের শুরুতে আবার শুরু হয়েছে তাদের দলবদ্ধ সেই দাবি—ফাঁসি চাই। এরা ফাসির দাবি নিয়ে এসেছে। এরা আমার দাবি নিয়ে এসেছে, এরা সারা বাঙালির একাত্তরের রক্তাক্ত প্রতিজ্ঞা নিয়ে এসেছে। আমরাও বলতে চাই সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। আপিল চাই, ফাঁসি চাই।

৩) যে মানুষটি খুন করলো, শুধু খুনিই নয়, কসাই যার নামের আগে, যে মানুষ কেটে কেটে কসাই উপাধি পেয়েছে, সেই মানুষটি পার পেয়ে গেলো। তার খুন-খারাবি প্রত্যক্ষ প্রমাণিত হলো। কিন্তু রায় হলো আশা ভঙ্গের। অথচ শুরুটা আশাভঙ্গের ছিল না। বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ ছিল দায়মুক্তির শুরু। আমরা মনে করেছিলাম চার দশকের দায় থেকে মুক্ত হচ্ছে একটা জাতি। দেশের প্রধান রাজাকাররা একে একে ঝুলবে। স্বাধীনতার বিরোধী অপশক্তি লেজ গোটাবে। কিন্তু জনগণ যেন ভিমড়ি খেলো। অনেকেই বলবেন, সাজাতো হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করুন, ঐ মোল্লা দুই আঙ্গুল উঁচিয়ে ভি সাইন (বিজয় চিহ্ন) দেখিয়ে মূলত তার কিংবা তাদের বিজয়ের ঘোষণাই দিয়েছেন রায়ের পর পর। বলতে গেলে সারা জাতিকে ব্যঙ্গ করেই যেন বলতে পেরেছেন, বিচারকরা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন।

এই মোল্লারা যদি পার পেয়ে যায়, মিলিত হওয়া তারুণ্য কিন্তু আরো একটা বড় ধাক্কা দেবে। এরাই ক্ষমতায় এনেছিলো। এরাই আবার ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেবে। এদের এই দ্রোহ থেকে হয়েই যেতে পারে আরেকটি পরিবর্তন। তাদের অজান্তেই আরেকটি অপশক্তি গজিয়ে উঠতে পারে এই বাংলাদেশে। আর তখন ক্ষমতার পালাবদলে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে এই বাংলা। কাদের মোল্লারা তখন আর জেলে শুধু আরামে-আয়েশে থাকবে না। এদের গাড়িতে উড়বে আবারো রক্ত ঝরানো সেই পতাকা। সারা জাতিকে ব্যঙ্গ করে নিজামী-কাদেররা ডাইনির মতো হাসবে। হয়ত নতুন উন্মাদনায় আবারো কোন নতুন হত্যা-ধর্ষণের পরিকল্পনা আঁটবে।

লন্ডন-ম্যানচেস্টারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেকের সাথেই কথা বলেছি। দেখেছি তারাও বেদনায় নীল। ষাট বছরে এবার পা দিয়েছেন আমাদের এক সিনিয়র, আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা তার সংগঠন নিয়ে নিয়ে উলটা-পাল্টা কথা কেউ বললে যিনি ক্ষেপে উঠেন সেই আওয়ামী লীগার, একদম চুপসে গেছেন, যেন কোনো কথা নেই তার মুখে। এভাবে গোটা কমিউনিটি যেন স্তব্ধ, তবে জামায়াতিরা করছে উল্লাস নৃত্য।

আইনমন্ত্রী আইনের কথা বলেছেন। বলেছেন, দু‘পক্ষেরই সুযোগ আছে আপিল করার। হ্যাঁ, কাদের মোল্লা এখন মুক্তির প্রত্যাশায়। কারণ প্রাথমিক বিজয় তিনি পেয়ে গেছেন। কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত মানুষ, শহীদ পরিবারের সন্তানেরা, মুক্তিযোদ্ধা মায়েরা কিংবা দেশের আপামর মানুষ—আমাদের প্রত্যাশাতো এখনও মিট মিট করে জ্বলছে। আইন-ই বলে দিচ্ছে সে সুযোগ আছে। আর তাইতো শাহবাগ মোড়ের উচ্চারণ কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠের মিলিত উচ্চারণ একীভূত হয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে সারা বাংলায়। বলতে হবে ফাঁসি চাই সেই সব খানে দজ্জালদের…।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »