বায়ুবাহী হয়ে উঠছে এবোলা

বার্তাবাংলা ডেস্ক :: জাতিসংঘ পরিচালিত এবোলা নিয়ন্ত্রক দলের প্রধান অ্যান্থনি ব্যানবারি সর্বশেষ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। এবোলা ভাইরাস মাসাধিকালব্যাপী মহামারী হিসেবে বিরাজ করছে, ফলশ্রুতিতে অতীতের ভাইরাসঘটিত মহামারীর ক্ষেত্রেও যা ঘটেছিল এবারও তা ঘটতে যাচ্ছে। এবোলা ভাইরাস বিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বায়ুবাহিত হয়ে পড়ছে।

এবোলা আক্রান্তের সঙ্গে ঘনিষ্ট সংসর্গই ছিল এ রোগের ছোঁয়াচে আক্রান্ত হওয়ার কারণ। রোগীর নিকটে পৌঁছুলেই কেবল চিকিৎসক ও নিকটজনেরা অত্যাধুনিক সংক্রমণরোধী পোশাক পরতেন এবং আন্তঃদেশীয় সীমান্ত আটকে দেয়া হতো, যেন এবোলাবাহী কেউ তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে পৌঁছে গিয়ে সেখানকার মানুষের জীবনঝুঁকির কারণ না হয়।

এবার ভাইরাসটি বায়ুবাহী হয়ে পড়লে, এ কৌশল পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে।

সর্বশেষ সেনেগাল প্রতিবেশী বন্ধুদেশ গিনির সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনের সঙ্গে বাণিজ্যিক স্থল ও নৌ পথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ। সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে আইভরি কোস্ট, নাইজেরিয়ার একাংশ, চাদ, ক্যামেরুন, গ্যাবন। লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন নিজেরাই অভ্যন্তরীণ শহরগুলোর সীমান্ত একাধিকবার বন্ধ করে দিয়েছে এবং কার্ফিউ জারি করেছে।
কিন্তু বায়ুবাহিত হয়ে পড়লে বলাই বাহুল্য সীমান্ত বন্ধ করে ফল পাওয়া যাবে না। এবং আন্তঃমহাদেশীয় বায়ুস্রোতে ভর করে তা মানুষের বেঁধে দেয়া সীমানা ছড়িয়ে অবাধে প্রবেশ করবে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে। এবং অনুকূল পরিবেশে সংক্রমণ ঘটাবে। অ্যান্থনি ব্যানবারি ব্যাপারটিকে দুঃষ্বপ্ন বলে অভিহিত করেছেন।

সব শেষে ভয়াবহ তথ্যটি তিনি উচ্চারণ করলেন। বললেন, এবোলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে নিয়োজিত কর্মীদের হাতে সময় আছে আর মাত্র এক মাস। এ সময় পেরোলেই বায়ুবাহিত হয়ে পড়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবোলা।

প্রতিষেধকের অগ্রগতি কোথায়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে সর্বশেষ ১ অক্টোবর এক বৈঠক আয়োজন করেছে। সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী এক মাসের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে মানুষের শরীরের উপযোগী এবোলা প্রতিষেধক আবিষ্কারে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়োজিত ৭০ জন প্রথমসারির বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও গবেষক।

রেসাস বানরের শরীরে সর্বশেষ প্রতিষেধক প্রয়োগ করে শতভাগ ফল পাওয়া গেছে। বানরটির জেনেটিক কোডিংএর সঙ্গে মানুষের নিকটতম সামঞ্জস্য থাকলেও মানুষের শরীরে বাড়তি কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে একই প্রতিষেধক প্রয়োগে, যেগুলোর দূর করা চেষ্টাসাধ্য। ব্যাপারটি এতোই সংবেদনশীল যে অসাবধানতার কারণে নতুন রোগের জন্ম হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিদিবদ্ধ নিয়মানুযায়ী সম্পূর্ণ নিরাপদ কোন প্রতিষেধক মানুষের নাগালে আনার পূর্বে অন্তত চার বছর মেয়াদী গবেষণা ও নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে নিতে হয়। বলাই বাহুল্য এবোলার প্রতিষেধকের ক্ষেত্রে তা মেনে চলা সম্ভবপর হবে না।
প্রশ্ন আসতে পারে, এবোলার ইতিহাস তো পুরনো, সত্তরের দশকে (১৯৭৬ সালে জায়ারে) প্রথম এবোলার সংক্রমণ ঘটেছিল মধ্য আফ্রিকায়। সহস্রাব্দের দ্বিতীয় দশকে তা প্রতিরোধে যোগ্য প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হলো না কেন।

সত্তর দশক থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে প্রতিটি দশকেই এবোলায় অনেকে আক্রান্ত হয়েছে, এ তথ্য সঠিক। কিন্তু সৃষ্ট প্রতিষেধকের বিপরীতে ভাইরাসটি বারবার খুব দ্রুত নিজের ভেতর পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যার সর্বশেষ রূপ মানবদেহে আত্মপ্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছে সর্বাপেক্ষা মারণঘাতী হিসেবে। এবং সর্বশেষ রূপটির প্রতিষেধক আবিষ্কারে গলদঘর্ম হচ্ছেন গবেষকেরা।

তবে এর মধ্যে মহাদেশীয় ক্ষমতার রাজনীতির ছায়া দেখতে পাচ্ছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা দেখতে চান, শেষ সময়ে এবোলার কার্যকর ভ্যাক্সিন নিয়ে আসতে পারে কি না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এবং এরপর নতুন কোন রাজনৈতিক পট রচিত হতে শুরু করে কী না কালো মানুষেরে দেশ আফ্রিকাজুড়ে।