ধর্মের স্বার্থে হত্যায় উন্মুখ প্রথম ইংরেজ নারী

বার্তাবাংলা ডেস্ক :: বাইশ বছরের তরুণী খাদিজা দারে মরিয়ম, প্রথম নারী জিহাদী হিসেবে ইসলামিক স্টেটের অধীনে আটক কোন ইংরেজ বা মার্কিনির শিরচ্ছেদ করতে চান। সম্প্রতি ইংরেজ সাংবাদিক জেমস ফলির শিরচ্ছেদের চলৎচিত্র প্রকাশিত হওয়ার পর টুইটারে এ পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন মরিয়ম। এর মধ্য দিয়েই সংবাদ মাধ্যমগুলোর চোখে পড়েন। ব্রিটেনের ইংরেজি দৈনিক দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও টেলিভিশন চ্যানেল ‘চ্যানেল ফোর’ এ নিয়ে বিস্তারিত সংবাদ তৈরি করার পর আলোচনার জন্ম দিয়েছেন এ নারী।

লন্ডনের এক খ্রিস্টান পরিবারে বড় হয়েছিলেন তিনি। আঠারো বছর বয়েসে খ্রিস্ট ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বিয়ে করেন সুইডেনের নাগরিক আবু বকরকে। বিয়ের কিছুকাল পর ২০১২ সালে জিহাদের আকর্ষণে স্বামীর সঙ্গে ছুটে আসেন সিরিয়ায়। স্বামী আবু বকর এখন সাবেক আইসিস- বর্তমান ইসলামিক স্টেটের নিয়মিত যোদ্ধা, মরিয়ম তাকে নিয়ে গর্ব করেন।

আবু বকরও তরুণ, বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে মুসলিমদের ধর্মতান্ত্রিক বিজয়ের আদর্শে। তাই স্বাধীন ইসলামি ভূখণ্ড সৃষ্টির জন্যে লড়ে যাচ্ছেন, সঙ্গিনী মরিয়ম তাকে প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছেন। দুজনই যেহেতু ইউরোপীয়, এবং ভিন্নতর পরিবেশে বড় হওয়া মানুষ, সুতরাং তাদের মনোজগতের এমন পরিবর্তন আলোচ্য বিষয়ই বটে।

ভিডিওচিত্র ধারণকারী সাংবাদিকের সঙ্গে ধর্মগ্রহণ, জিহাদে আসা- প্রভৃতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন আগাগোড়া কালো কাপড় জড়ানো, হাতে দস্তানা পরিহিতা মরিয়ম। তিনি জানালেন, ইসলাম তাকে বন্দি করেনি। যদি করতো, তো এ ধর্ম তিনি ত্যাগ করতেন। ইসলাম বরং তাকে মুক্ত করে দিয়েছে।

সার্বক্ষণিক সঙ্গী কালাশনিখভ রাইফেল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বলেন, এটা সন্ত্রাসীর চিহ্ন নয়। এবং তিনি, তার স্বামী বা ইসলামি স্টেটের সেনারা সন্ত্রাসী নন। সন্ত্রাসী তারাই যারা অন্যের ভূমি দখল করে, অন্যের নারীদের ধর্ষণ করে, পুরুষদের হত্যা করে, সম্পদ কেড়ে নেয়। ইসলামিক স্টেট তা করে না, কোন মুসলমান তা করতে পারে না।

সিরিয়ার ঘরপালানো মানুষদের ছেড়ে যাওয়া এক দালানে তারা থাকছেন। সাংসারিক আলাপচারিতাতে যুদ্ধ, অস্ত্র ঢুকে পড়ছে অনায়াসে। জীবদ্দশায় তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়তো দেখে যেতে পারবেন না- এমনটাই ভাবেন তারা। তবে এ নিয়ে চিন্তিত নন, বরং ‘শহীদ’ হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে আছেন। কখনও ইংল্যান্ড ফিরে যাবেন কী না প্রশ্ন করা হলে জানান, এ জীবনে নয়। তার স্বামী যদি এ ‘শাহাদাত’ বরণও করেন, তবুও যাবেন না। কারণ, ইসলামের ভবিতব্যের সঙ্গে তিনি নিজেকে বেঁধে নিয়েছেন।
ব্রিটেনে ফেলে আসা কোন বিষয়টির কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে তাকে বলতে শোনা গেল জন্মভূমির খাবারের কথা। খুব অনুভব করার তালিকায় সেখানকার পরিবেশ, খাবার, আয়েশী ভাজাপোড়ার বিকেল, কেক, আর মায়ের হাতের রান্না। শেষ শব্দটি বলার সময় গলাটা খানিক কেঁপে ওঠে তার। মরিয়মের বাবা মা জানেন তাদের সন্তান সিরিয়ায়। কিন্তু কী অবস্থায় আছেন, কী করছেন, তার কিছুই জানেন না।

মরিয়ম-আবু বকরের পুত্র খেলা করে নিচতলায় বসবাসকারী আরেক পরিবারের মেয়েশিশুটির সঙ্গে। ঐ পরিবারটির ইতিহাসও প্রায় একইরকম, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ইংরেজ। কালো কাপড়ে জড়ানো অপর ঐ নারীর নাম- আয়েশা। আয়শাকে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা জিজ্ঞেস করা হলে কিছুটা বিব্রত হয়ে পরমুহূর্তে সামলে নেন তিনি। বলেন, ‘বাচ্চারা খুব দ্রুত খাপ খাইয়ে নেয়, জানেনই তো। ওরা তো ছুটছে, খেলছে; নিরাপদেই আছে আল্লাহর দয়ায়।’

আয়শা জানান, তিনি বা তার স্বামীও আর ফিরবেন না। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল, সিরিয়ায় এসে পরিস্থিতি দেখে আবার ফিরে যাবেন তারা। আসার পর দেখেশুনে তার স্বামী ইসলামিক স্টেটের সেনাদের সঙ্গে থেকে গিয়ে যুদ্ধ করার পরিকল্পনা স্থির করেন। মাতৃভূমির জন্যে আয়শার একটু মন খারাপ হলেও ধর্মের স্বার্থের কথা চিন্তা করে, স্রষ্টার প্রশংসা করে সব মেনে নেন তিনি।

মরিয়ম-আবু বকরের কথায় আসা যাক আবার। মরিয়ম অস্ত্র চালানো ভালোই শিখে নিয়েছেন। রিভলবার, কালাশনিখভ চালাতে পারেন খুব সহজে, নিয়মিত লক্ষ্যস্থির করে অনুশীলন করেন। স্বামীর সঙ্গে ছদ্ম খুনসুটি করেন অস্ত্র নিয়ে, স্বামী বলেন, ‘তোমার কালাশনিখভের চেয়ে আমারটাই বেশি ভালো।’ মরিয়ম বলেন, ‘হতেই পারে না। আমারটাই ভালো বরং।’ স্বামী ছাড়েন না, বলেন, ‘কী করে? আমারটা ব্যবহার করি যুদ্ধে, আর তোমারটা নাও বাজারে যাওয়ার সময়।’ মরিয়ম নির্বিকার। বলেন, ‘গুলি করার সময় আমারটিতেই বেশি আরাম বোধ হয়, সুতরাং…’

যুদ্ধের নিষ্ঠুরতম পরিবেশে বড় হতে থাকা তাদের নিষ্পাপ পুত্রসসন্তান ইতস্তত ঘুরে বেড়ায়, অস্ত্র নেড়েচেড়ে দেখে। এরই মধ্যে মরিয়ম আবারও অন্তসত্ত্বা হয়েছেন। আবু বকর এ নিয়ে ভীষণ উল্লসিত, বারবার জানালেন সে কথা। দুজনেই চাইছেন, বিধাতার ইচ্ছায় আসছে জনও হোক পুত্রসন্তান। জিহাদের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে, এটা ভীষণ জরুরী।