তোবা কারখানা বন্ধ ঘোষণা ফের অস্থির হওয়ার আশঙ্কা

বার্তাবাংলা ডেস্ক :: পাওনা আদায়ে অবৈধ ধর্মঘটের কারণ দেখিয়ে উত্তর বাড্ডার তোবা গ্রুপের পাঁচ কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করেছেন মালিক দেলোয়ার হোসেন। বন্ধের এ নোটিশ সোমবার গ্রুপের পাঁচ কারখানার ফটকে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বন্ধের এ ঘোষণা ১১ই জুন থেকে কার্যকর হবে। তোবার এ বন্ধের ইস্যুকে কেন্দ্র করে তৈরী পোশাক খাত আবারও অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা নিয়ে তোবার মালিক দেলোয়ার দু’-এক দিনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে।
সবিচালয়ে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, কারখানা বন্ধ করতে হলে তোবা গার্মেন্টের মালিককে আইন অনুযায়ী শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
এদিকে গতকাল তোবা গ্রুপের বন্ধ পাঁচ কারখান চালুর দাবিতে মিছিল সমাবেশ করতে চাইলে মোশরেফা মিশুকে আটকের পর রাতে ছেড়ে দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে কারখানার মেশিনপত্র বিক্রি করায় বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছিল, মালিক আর কারখানা চালু করতে পারবেন না। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও কারখানা বন্ধ হচ্ছে এমনটা শ্রমিকরাও মনে করেছিলেন। সেই আশঙ্কাটাই গত সোমবার স্পষ্ট করেছেন তোবার মালিক। কিন্তু বেকার হওয়ার পথে দেড় হাজার শ্রমিক কি করবেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে ৫ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করার পর বিশাল এ খাতে পরিস্থিতি আরও গভীর সঙ্কট পড়তে যাচ্ছে। তাদের মতে, তোবার মালিক শ্রমিকদের ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলায় পোশাক খাতে আবারও অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলো। ফলে নতুন করে এ ইস্যুতে আবার আন্দোলন দানা বাঁধবে। এ সঙ্কট সমাধানের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে দফায় দফায় সভা করেও কোন কূলকিনারা করতে পারছে না বিজিএমইএ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সহসভাপতি এসএম মান্নান কচি বলেন, পরিস্থিতি যাতে স্বাভাবিক থাকে তার জন্য তোবার মালিক দু’-এক দিনের মধ্যেই সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেখানে তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার ব্যাখ্যা দেবেন। কারখানা বন্ধ ঘোষণা সম্পর্কে তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ জুন মাস থেকে। আর বেতন-বোনাস পরিশোধ জুলাই মাস পর্যন্ত। অতএব শ্রম আইন অনুযায়ী তোবার মালিকের কারখানা বন্ধ ঘোষণা ঠিকই আছে বলে মনে করেন তিনি।
শ্রমিকদের মতে, ঘোষণা দিলে শ্রম আইন অনুসারে শ্রমিকদের প্রতি কার্যবছরের জন্য এক মাসের বেতন ও অতিরিক্ত এক মাসের বেতনসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করতে হবে, যা তোবার মালিক চাইছেন না। আর মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এ বিষয়ে সহযোগিতা করছে না বলেও তাদের অভিযোগ।
এদিকে অনেক শ্রমিক নতুন কারখানায় চাকরির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে। তোবার পরিচয় শুনলে শ্রমিকদের কাজে নিতে চাইছে না মালিকপক্ষ, যা তোবা শ্রমিকদের বেকারত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিষয়টি শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে শ্রমিকদের। তাদের মনে এখন প্রশ্ন, কি হবে আমাদের? আমরা কি পথে বসে যাবো? এমন পরিস্থিতিতে আবারও আন্দোলনে নামছেন শ্রমিকরা। সালমা নামের বুকশান গার্মেন্টের এক শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বাড্ডায় দু’টি গার্মেন্টে চাকরির চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তোবার নাম শোনার পর তারা চাকরি দেয়নি।
এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেছিলেন, এটি কারখানা কর্তৃপক্ষের বিষয়। তবে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অবশ্যই চাপ থাকবে।
এর আগে বিজিএমইএ কার্যালয় থেকে তোবার শ্রমিকরা মে, জুন ও জুলাই মাসের বকেয়া মজুরি নিয়েছেন। তবে এখনও ওভারটাইম পাননি। তোবার শ্রমিকদের এখন মূল দাবি ১৬০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কারখানা আবার চালু করা। বিজিএমইএ মে ও জুন মাসের মজুরি পরিশোধ করে। এ জন্য শ্রমিকদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। ২৮শে জুলাই থেকে ঈদের আনন্দ ছেড়ে তারা টানা ১১ দিন অনশন করেছে। পুলিশের লাঠিপেটা, এমনকি রাবার বুলেটও জুটেছে কারও কারও ভাগ্যে। অভিযোগ আছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি করা হয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্যে। পোশাক শ্রমিকদের জিম্মি করেই তোবার মালিক দেলোয়ার হোসেন কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ২০১২ সালের নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে ১১১ শ্রমিক পুড়িয়ে মারার অভিযোগ আছে।
এদিকে গতকাল রাজধানীর গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডে তোবা গ্রুপের বন্ধ পাঁচ কারখানা চালুর দাবিতে মিছিল সমাবেশ করতে চাইলে তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশুকে আটক করে পুলিশ। অবশ্য রাতে মিশুকে ছেড়ে দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডে তোবার শ্রমিকরা জড়ো হতে শুরু করেন। বেলা তিনটার দিকে মিছিল শুরু করার আগ মুহূর্তে বাড্ডা থানা পুলিশ মিছিলে বাধা দেয়। পুলিশ তাদের কাছ থেকে ব্যানার কেড়ে নেয়। একপর্যায়ে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। পুলিশ বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মোশরেফা মিশুকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় এবং জড়ো হওয়া শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ জলিল বলেন, এটি খুবই ব্যস্ততম সড়ক। এখানে মিছিল-সমাবেশের পূর্ব অনুমতি না থাকায় তাদের বাধা দেয়া হয়।
এদিকে আটকের আগে মোশরেফা মিশু সাংবাদিকদের বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলাম আমরা। কিন্তু পুলিশ স্বৈরাচারী কায়দায় আমাদের কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি। তিনি বলেন, শ্রমিকরা যখন মজুরি পান না, তখন পুলিশ এগিয়ে আসে না। কিন্তু দাবি আদায়ে যখন তারা রাস্তায় নামেন, তখন পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়।