পুলিশের অধীনে থাকছে না র‌্যাব

বার্তাবাংলা রিপোর্ট ::পুলিশ প্রশাসন থেকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নকে (র‌্যাব) আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে আধাসামরিক এই বিশেষ বাহিনীটি চলে যাবে সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পুলিশ ছাড়াও রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড। আর র‌্যাব পুলিশের অধীনে পরিচালিত হলেও এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায় সবাই সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা।

জানা গেছে, র‌্যাবকে সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও র‌্যাবের তরফ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব এখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর টেবিলে আর র‌্যাবের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। দুটো প্রস্তাব পর্যালোচনা করে র‌্যাবকে আরো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে। তবে কবে নাগাদ এই প্রক্রিয়া শুরু হবে সেটা কোনো সূত্রই সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বাংলামেইলকে বলেন, ‘এখনই এ বিষয়ে বলা যাবে না। পুলিশ থেকে র‌্যাবকে আলাদা করা একটি মেজর ডিসিশনের বিষয়। এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবেন।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাব কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাওয়ার পর এলিট এই বাহিনীকে সংস্কার করার দাবি উঠেছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অনেক মহল থেকে। সংস্কারের বিষয় মাথায় রেখেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তাতে র‌্যাবকে আলাদা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

জানা গেছে, ওই প্রস্তাবে স্বরাষ্ট্র সচিব স্বাক্ষর করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর পর প্রায় এক মাস অতিবাহিত হতে চললেও সেটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়নি।

এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সংকেত পেলেই তা যথাস্থানে পাঠানো হবে।

সূত্র জানায়, পুলিশের তরফ থেকে আলাদা হলে র‌্যাবের জনবল আগের মতোই বিভিন্ন বাহিনীর থাকবে নাকি শুধুই সশস্ত্র বাহিনীর থাকবে এ নিয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনার পর। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা প্রস্তাবে বাহিনীটিতে আগের মতো সব বাহিনীর সদস্য রাখার পক্ষেই সুপারিশ করা হয়েছে। এর সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনের (সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) কর্মকর্তাদের কোটা বাড়নোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আসার পর পুলিশের পাশাপাশি এ বাহিনীটি কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে, অপরাধী ধরা, মামলা তদন্ত, অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় কীভাবে হবে তা নিয়ে এখন গবেষণা চলছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুধু পুলিশ নয়, বিজিবি, আনসারও রয়েছে। র‌্যাবে যতো সংখ্যক সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন বিজিবিতে তার চেয়ে অনেক বেশি সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন। বিজিবি অর্ধলাখ সদস্যের একটি বাহিনী। সেখানে র‌্যাবের পরিধি মাত্র ৮-৯ হাজার সদস্য। বিজিবিকে যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাহলে র‌্যাবকে কেন পারবে না?

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ফাইল অনুমোদন দিয়ে পাঠানোর পরপরই র‌্যাবের প্রধান ও এ বাহিনীর গঠন, কার্যক্রম ও অন্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এসব বিষয় ঠিক করে একটি আইন করা হবে। সেই আইনের ভিত্তিতে বিধিমালা তৈরি করে র‌্যাব পরিচালিত হবে।

র‌্যাবের প্রস্তাবে যা আছে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মার্চ মাসে র‌্যাবের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি আবেদন করা হয়। তাতে উল্লেখ করা হয়, পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পুলিশের বিশেষায়িত একটি স্বতন্ত্র বাহিনী হিসেবে র‌্যাব আত্মপ্রকাশ করে। পুলিশ সদর দপ্তরের অধীনে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হলেও শুরু থেকেই র‌্যাবের দায়িত্ব, কর্তব্য ও কার্যাবলীর মধ্যে স্বাতন্ত্র ছিল। আভিযানিক দিক বিবেচনায় প্রথম থেকেই র‌্যাব স্বতন্ত্র ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু পুলিশ সদরদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় র‌্যাবকে নানাবিধ প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।

আবেদনে আরো বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠন করা হলে র‌্যাবের আভিযানিক কাজে গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে, প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা আসবে, সময়মতো ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। এছাড়া দক্ষ জনবল বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন সহজ হবে।

এছাড়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র বাহিনী হিসেবে র‌্যাব পুনর্গঠন করা হলে বাহিনীর কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাহিনী সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষায়িত বাহিনী সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তারা সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইতালির ক্যারিবিনিয়ারি পুলিশ, জার্মানির জিএসজি-৯ ও ভারতের ব্ল্যাক ক্যাটসের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবটি যেমন
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে আসা সদস্যরা সরাসরি র‌্যাবে যোগ দেন। কিন্তু এ বাহিনীতে আসা পুলিশ সুপার এবং এর ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদ স্থাপন করে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও নিম্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুলিশ অধিদপ্তর সরাসরি র‌্যাবে পদায়ন করে। সরকারের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি বিভাগে কর্মরত সদস্যরা প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ে যোগদান করে পরবর্তী সময়ে প্রেষণে নির্ধারিত কর্মস্থলে যাবেন।

কিন্তু র‌্যাবে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা ছাড়া অন্যদের পদায়নে প্রেষণ নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। র‌্যাবে প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেষণ নীতিমালা অনুযায়ী সব বাহিনী থেকে আসা সদস্যরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়নের জন্য ন্যস্ত হবেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিধিবিধান অনুযায়ী তাদের র‌্যাবে বিন্যস্ত করবে।

সুপারিশে বলা হয়, সামরিক ও অন্য যে বাহিনী থেকেই আসুক না কেন, র‌্যাবে কর্মরত অবস্থায় অনিয়ম বা অপরাধ করলে সবার জন্য একই ধরনের শৃঙ্খলামূলক বিধিবিধান অনুসরণ করা উচিৎ। এ ক্ষেত্রে র‌্যাবের জন্য একটি বিশেষ বিধি (শৃঙ্খলা ও আপিল) প্রণয়ন করা যেতে পারে।

উল্লেখ্য, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী র‌্যাবের কোনো সদস্য অপরাধ করলে মাতৃবাহিনীর আইন অনুযায়ী তার শাস্তি হয়ে থাকে। ফলে একই অপরাধ করে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যর ভিন্ন ভিন্ন শাস্তি হয়ে থাকে।

প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, র‌্যাবে নিয়োগ পাওয়ার পর এর আইন ও বিধিবিধানের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের পদায়ন করা উচিৎ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী র‌্যাবে সশস্ত্র বাহিনীর ৪৪ শতাংশ, পুলিশ ৪৪ শতাংশ, বিজিবি ৬, আনসার ভিডিপির ৪, কোস্টগার্ড ১ ও বেসামরিক প্রশাসনের ১ শতাংশ হারে কোটা বিভাজন করা আছে। সংস্কার প্রস্তাবে বেসামরিক প্রশাসনের অনুপাত বাড়ানো জন্য বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে র‌্যাবের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘের সহযোগী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইরিন (আইআরআইএন)।

গত জুলাই মাসের শেষ দিকে সংস্থাটির প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ ভারত, নেপাল এবং নাইজেরিয়ার সেনা সদস্যদেরও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তাদের অতীত কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে পর্যালোচনা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বলেছেন, শান্তিরক্ষী বাহিনীতে লোক নেয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘের শুদ্ধিঅভিযান চলছে। মানবাধিকার কর্মীরাও এ বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নের জন্য সরাসরি সে দেশের সরকারকে চাপ দেয়ার তাগিদ দিচ্ছেন: যেখানে তারা জাতিসংঘের ইউনিফর্ম পরে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। আর বিশেষজ্ঞরা শান্তিমিশনে যোগ দিতে ইচ্ছুক লোকদের যোগ্যতা যাচাই তাদের দেশ থেকেই শুরু করা উচিৎ বলে মনে করছেন।