৪ দিনেও মেলেনি পিনাকের সন্ধান

বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: পদ্মা নদীর মাওয়া এলাকায় এমভি পিনাক-৬ ডুবার চারদিন অতিবাহিত হলেও লঞ্চটির অবস্থান শনাক্ত হয়নি। গতকাল পর্যন্ত ৩৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে মোট ১৬টি। নিখোঁজদের স্বজনদের অভিযোগ, লাশ উদ্ধার করতে আগ্রহী না সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। গতকাল লঞ্চের সন্ধানে কাজ করেছে পাঁচটি ইউনিট। বুধবার রাত থেকেই কাজ শুরু করেছে চট্টগ্রাম থেকে আসা
কাণ্ডারী-২। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযানে যোগ দিতে মাওয়ার পথে ছিল জরিপ-১০। এ পর্যন্ত উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া ইউনিটগুলো লঞ্চ নিমজ্জিত হওয়ার স্থান থেকে ৫০ বর্গ কিলোমিটার ভাটি পর্যন্ত অনুসন্ধান করেছে। নিখোঁজদের স্বজনদের অভিযোগ, উদ্ধারে অংশগ্রহণকারী সরকারি বাহিনীর সদস্যরা মূলত লঞ্চের সন্ধান করছেন। লাশ উদ্ধারে তাদের কোন তৎপরতা নেই। গতকাল সকালে মাওয়াঘাট থেকে স্পিডবোটে স্বজনের লাশ খুঁজতে বের হন ফরিদপুরের সালথার কসবাকাঠির সবুজসহ কয়েকজন। পদ্মা নদীর শরীয়তপুরের কাঁচিকাটারচরে আট বছর বয়সী এক মেয়ের লাশ দেখে তারা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে অবহিত করেন। কিন্তু গতকাল বিকাল ৬টা পর্যন্ত ওই লাশ উদ্ধার করেনি পুলিশ। সবুজ জানান, লঞ্চডুবিতে তার বোন শেফালী ও তার ভাগ্নে শিশু আরাফ এবং এনাম নিখোঁজ রয়েছেন। চারদিন ধরেই স্পিডবোট ভাড়া করে তাদের লাশের সন্ধান করছেন স্বজনরা। খুঁজতে গিয়ে ওই শিশু মেয়েটির লাশ দেখে মাওয়া ফেরিঘাটে পুলিশ কন্ট্রোলরুমে তা জানালে তারা বলেছে, ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এভাবেই শরীয়তপুরের চর সুরেশ্বর, চর কাঁচিকাটাসহ ভাটির বিভিন্ন এলাকায় লাশ ভেসে উঠেছে বলে নিখোঁজদের স্বজনরা জানান। কিন্তু সরকারি বাহিনী এসব লাশ উদ্ধার করছে না বলে তাদের অভিযোগ। তবে মাওয়াঘাটের কন্ট্রোলরুমে দায়িত্ব পালনকারী লৌজহং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মজিবর রহমান জানান, আমরা তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানায় জানিয়েছি। পুলিশ লাশ উদ্ধারে তৎপর রয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, প্রবল স্রোতের কারণে লাশগুলো ভাটিতে ভেসে গেছে বলেই উদ্ধারকারীরা মনে করছেন। লঞ্চ পাওয়া গেলে এতে কিছু লাশ পাওয়া যেতে পারে। তাই লঞ্চ উদ্ধারকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্ধার অভিযানে অংশগ্রহণকারী সদস্যরা। তবে লঞ্চটিও স্রোতে ভেসে গেছে বলেই তারা মনে করেন। তাৎক্ষণিকভাবে প্রযুক্তি সংবলিত জাহাজ দিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করতে পারলে লঞ্চটি হয়তো এই কয়েক দিনে উদ্ধার হতো বলেই মনে করেন অনেকে। নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম জানান, লঞ্চে অনেক কাঠের ব্যবহার করা হয়। স্রোতে তা ভেসে যেতে পারে। এমনকি লঞ্চে ব্যবহৃত লোহার ওজন পানিতে হ্রাস পায় ফলে তা-ও ভেসে যেতে পারে। এজন্য লঞ্চটির অবস্থান নির্ণয় করতে বেগ পেতে হতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। গতকাল উদ্ধার অভিযানে কাজ করেছে পাঁচটি ইউনিট। তারা ১০টি জাহাজ ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি জাহাজ অভিযানে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বাকি পাঁচটি প্রচলিত পদ্ধতিতে দড়িতে ইট বেঁধে লঞ্চের সন্ধান করছে। বুধবার রাতে উদ্ধার অভিযানে অংশ গ্রহণকারী কাণ্ডারী-২ জাহাজে রয়েছে সাব-বটম প্রোফাইলার। এটি একটি সাউন্ড সিস্টেম সোনার। এটি নদীর তলদেশে কাদা-পলির ভেতরের ৭০ ফুট গভীর পর্যন্ত খুঁজতে পারে। বালুর মধ্যে খুঁজতে পারে ১৮ ফুট পর্যন্ত। এছাড়া অভিযানে অংশগ্রহণকারী সন্ধানী জাহাজে সাইড স্ক্যান, বদ্বীপে ইকো সাউন্ড, তিস্তা ও আইটি ৯৫ জাহাজে সোনার প্রযুক্তি রয়েছে। ইতিমধ্যে ৫০ বর্গ কিলোমিটার অনুসন্ধান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিযানের সমন্বয়কারী নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম। তিনি আরও জানান, এর মধ্যে ৬ থেকে ১০ কিলোমিটার নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তার আগে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে ০ থেকে ৫ কিলোমিটার। প্রয়োজনে আজ ১১ থেকে ১৫ কিলোমিটার নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে, গতকাল বিভিন্ন স্থান থেকে ১৩টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এ পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জ থেকে চার, শরীয়তপুর থেকে আট, বরিশাল থেকে পাঁচ, চাঁদপুর থেকে চার, ভোলা থেকে ১০, লক্ষ্মীপুর থেকে এক ও মাদারীপুর থেকে একটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে মাদারীপুরের দুরাইল গ্রামের হায়দার আলীর মেয়ে ইমা (১৮), একই এলাকার শিবচর উপজেলার কোরকচর গ্রামের রহিম মাদবরের মেয়ে ইফা আক্তার (১৪), একই ব্যক্তির ছেলে ইব্রাহিম (১), বরিশালের বাকেরগঞ্জের দক্ষিণ দুধলগ্রামের শহীদুল ইসলামের ছেলে জাহিদ হোসেন (১৫), ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সাড়ে এগাররশি গ্রামের আজিজ মাদবরের ছেলে আবু ইউসুফ (২২), একই এলাকার সাতরশি গ্রামের রুবেল মিয়ার মেয়ে ফাইজা (৭), বরিশালের বাকেরগঞ্জের কৃষ্ণকাটি গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন জুলহাস (৪০), গাজীপুরের কাপাসিয়ার ইব্রাহিম হোসেনের মেয়ে ইশরাত জাহান মিম (১৪) ও লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরজগবন্ধু গ্রামের ইদ্রিশ মিয়ার ছেলে সাইদুল হক গাজী (৫৫)-এর লাশ। মাদারীপুরের শিবচরের পাঁচচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে লাশ হস্তান্তর করা হচ্ছে।
গতকাল পর্যন্ত নিখোঁজদের তালিকায় ১৪৯ জনের নাম লিপিবদ্ধ হলেও লাশ উদ্ধার ও পরিচয় পাওয়ার পর ওই তালিকা থেকে তা বাদ যাচ্ছে।
নিজ এলাকায় ভেসে উঠলো জাকিরের লাশ
মাওয়ায় লঞ্চ ডুবির ঘটনায় নিখোঁজের ৪ দিন পর নিজ এলাকা বরিশালে ভেসে উঠলো হতভাগ্য জাকিরের লাশ। জাকির বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণকাঠি গ্রামের আবদুল হামিদ মাস্টারের ছেলে। জাকির ঢাকার বকশীবাজার এলাকায় খাবার হোটেলের ব্যবসা করতেন। পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে তিনি গ্রামের বাড়িতে যান। পরে ঢাকার কর্মস্থলে যোগ দেয়ার জন্য তিনি সোমবার কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়ায় আসার জন্য পিনাক-৬ লঞ্চে ওঠেন। ঘাটের কাছে এসে লঞ্চটি ডুবে গেলে জাকির নিখোঁজ হন। জাকিরের বড় ভাই আল- মামুন গত চারদিন মাওয়া ঘাটে এসে ভাইয়ের খোঁজ করতে থাকেন। গতকাল বেলা ১১ টার দিকে পুলিশ কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানতে পারেন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ এলাকায় জাকিরের লাশ পাওয়া গেছে। জাকিরের প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে পরিচয়পত্র দেখে মেহেন্দীগঞ্জ থানা পুলিশ তার পরিচয় নিশ্চিত করে।
আরও ১২ যাত্রীর লাশ উদ্ধার
মুন্সীগঞ্জের পদ্মায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমভি পিনাক-৬ এর আরও ১২ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল লক্ষ্মীপুরে ১টি, ভোলায় ৫টি, বরিশালে ৩টি ও শরীয়তপুর থেকে নদীতে ভাসমান অবস্থায় ৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে তিনদিনে ২৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। গতকাল রাত পর্যন্ত লাশ উদ্ধারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩-এ। উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মধ্যে ১৬টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন শতাধিক যাত্রী।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মাতাব্বরনগর এলাকার মেঘনা নদী থেকে বুধবার রাত সাড়ে ৮টার সময় অজ্ঞাত এক যুবতীর (২৫) লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। ওই যুবতীর পরনে খয়েরি রঙের সালোয়ার-কামিজ রয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওই যুবতীর লাশ উদ্ধার করে কমলনগর থানায় রাখা হয়েছে।
ভোলা প্রতিনিধি জানান, গতকাল ভোলার মেঘনা নদী থেকে লঞ্চের পাঁচ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সকাল ১০টায় সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের দাসেরহাট এলাকার মেঘনা নদী থেকে একজন পুরুষ ও চর ফৈজুদ্দিন থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। বেলা ১২টার দিকে লালমোহনের মঙ্গল সিকদার এলাকার মেঘনা নদী থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই যুবকের বয়স হবে আনুমানিক ২৫ -৩০ বছর। উদ্ধারকৃত মৃতদেহগুলোর পরিচয় শানক্ত না হওয়ায় মাদারিপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কন্ট্রোল রুমে পাঠানো হয়েছে।
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, শরীয়তপুর এলাকার পদ্মা নদী থেকে গতকাল লঞ্চের তিন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সকালে নড়িয়া উপজেলার চরআত্রার পদ্মা নদী থেকে এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর কিছুক্ষণ পর গোসাইরহাট উপজেলার আবুপুর এলাকার মেঘনা নদী থেকে দুই যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বরিশাল থেকে নদীতে ভাসমান অবস্থায় ৩টি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়।