জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ‘মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ’ শিক্ষা

বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: মাঠের ব্যবহারিক ক্লাসের চেয়ে চার দেয়ালের ভেতরের তাত্ত্বিক ক্লাসে গুরুত্ব। ব্যাট-বলের শারীরিক অনুশীলনের চেয়ে মনোজগতের অলিগলিতে যেমন আলো ফেলা। চন্দিকা হাতুরাসিংহের ‘নতুন’ বাংলাদেশ এগোচ্ছে এই পথেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঈদ-পরবর্তী অনুশীলনের শুরুটা যে এমনই!পরশু অনুশীলনের প্রথম দিন কেটেছে কোচিং স্টাফদের সঙ্গে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের দীর্ঘ সভায়। নিজেদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী, সেই লক্ষ্য অর্জনের উপায় কী- এসব নিয়ে হাতুরাসিংহের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা মুশফিকুর রহিম-তামিম ইকবালদের। কাল সকালে আবার ঘণ্টা দুয়েকের আরেকটি সভা। অস্ট্রেলিয়ান মনোবিদ ফিল জনসির ক্লাসের ছাত্র এবার ‘মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ’রা। এরপর সেন্টার উইকেটে যে অনুশীলন, সেখানেও তামিম ইকবাল-মমিনুল হকদের ‘মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ’-এর নানা উপায় বাতলে দিয়েছেন বিখ্যাত এই ক্রীড়া মনোবিদ।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে হঠাৎ করে যেন মনোবিদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। মাঠের ক্রিকেটে জঘন্য পারফরম্যান্সের টোটকা হিসেবে তাঁদের শরণাপন্ন হচ্ছে বোর্ড। আফগানিস্তান-হংকংয়ের মতো দলের কাছে হারের জন্য ক্রিকেটীয় সামর্থ্যরে পাশাপাশি মানসিক অবস্থাকে দায়ী করে অমন পদক্ষেপ। গত এপ্রিলে কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি মনোবিদ আলী আজহার তিন দিন ক্লাস নিয়েছিলেন ক্রিকেটারদের। সেই ক্লাসের পর বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন মুশফিক-তামিমরা। এরপর মাস তিনেক গিয়েছে কেবল। আবার মনোবিদের ক্লাসে ছুটতে হয়েছে ক্রিকেটারদের।কোচ হাতুরাসিংহের পরামর্শে যে মনোবিদ এনেছে বিসিবি, তাঁর বেশ হাইপ্রোফাইল। এখন অস্ট্রেলিয়ান বেসবল দল ও কুইন্সল্যান্ড বুলস ক্রিকেট দলের ক্রীড়া মনোবিদ হিসেবে কাজ করছেন ফিল জনসি। ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের সাইকোলজিক্যাল কনসালট্যান্ট। সম্প্রতি কাজ করেছেন তিনি অস্ট্রেলিয়ান ডেভিস কাপ স্কোয়াডের সঙ্গেও। এমন হাইপ্রোফাইল মনোবিদের সঙ্গে কাজ করে মাঠের ক্রিকেটে সুদিন ফেরানোর আশা হাতুরাসিংহের।জনসির ক্লাসের মূল বিষয় ছিল মস্তিষ্কের পরিচালনা। বিশেষত খারাপ সময়ে যে সেটি আরো খারাপ করার পথে খেলোয়াড়দের নিয়ে যায়, সেটিই বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। ক্রিকেটারদের ক্লাস নেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এমনটাই বলেছেন জনসি, ‘এমন অনেক সময় আসে যখন মস্তিষ্ক আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করতে চায়। বিশেষত চাপের সময়টায় এমনটা হয়ে থাকে, সেটি ব্যাটসম্যান-বোলার সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পরামর্শ ও উপায় আমি তাদের বলে দিয়েছি।’ খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কের কাজের ধরনকে কাম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা করেছেন এই অস্ট্রেলিয়ান, ‘আমি চাই খেলোয়াড়দের মস্তিষ্ক যেন কম্পিউটার মোডে চলে যায়। নিজেদের সামর্থ্যটা ওদের বুঝতে হবে। সেটি বুঝতে পারলেই তারা সে অনুযায়ী খেলতে পারবে। একটা খারাপ ম্যাচ যখন যায়, তখন ওরা জানে যে কী করতে হবে। কিন্তু সেটি করতে পারে না।’একাডেমি ভবনে দুই ঘণ্টার তাত্ত্বিক ক্লাস শেষে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের সেন্টার উইকেটে ব্যাট-বলের অনুশীলন করেছে বাংলাদেশ দল। সেখানেও পরিস্থিতি অনুযায়ী কিভাবে কী করতে হবে, সেটি বাতলে দিয়েছেন জনসি, ‘আমি আশা করছি যে, মস্তিষ্ক কিভাবে কাজ করে, সেটি আমি ওদের বোঝাতে পারব। খারাপ সময়ে মস্তিষ্ক যে কিভাবে আমাদের আরো খারাপ খেলার দিকে নিয়ে যায়, সেটি বোঝাব। প্রত্যেকেরই একটি প্ল্যান এ থাকে। খারাপ সময়েও সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে। আমি আশা করব, প্রত্যেকেই জানবে যে, তাদের প্ল্যান এ কী!’ অর্থাৎ, নিজেদের শক্তি-দুর্বলতা সম্পর্কে জেনে আগে থেকে করা পরিকল্পনায় অটল থাকার পরামর্শ জনসির।এপ্রিলে আলী আজহারের ক্লাসে ভাষাগত কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু এই অস্ট্রেলিয়ানকে যে সেই সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটি বলেছেন অকপটে, ‘হ্যাঁ, ভাষা একটা সমস্যা তো বটেই। আমি এমনিতে দ্রুত কথা বলি। তবে আজ ধীরে ধীরে বলেছি। খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আমার কথাগুলো অনুবাদ করে নিয়েছে। আর ওরা নিজেদের ভাষায় কী সব বলেছে, আমি কিছু বুঝিনি। তবে হাসতে হাসতে যখন তা বলেছে, সেটি ভালোই হবে।’মনোবিদের ক্লাসে ছিলেন সাকিব আল হাসান। কিন্তু সেন্টার উইকেটের অনুশীলনে ছিলেন না। বরং একা একা জিম করেছেন নিষিদ্ধ এই ক্রিকেটার। অস্ট্রেলিয়ান মনোবিদের সঙ্গে কাজ করাটা যে বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, সেটি বলেছেন প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ, ‘সব দলের সাথে ক্রীড়া মনোবিদ থাকে। আমার মনে হয় ড. ফিল আমাদের ক্রিকেটারদের আত্মসচেতনতা বাড়াতে পারবেন এবং ভঙ্গুর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনায় সাহায্য করবেন।’যাচ্ছেতাই একটি বছর কাটাতে থাকা ক্রিকেটারদের জন্য সেটি বড্ড প্রয়োজন। –