বুয়া চেতনানাশক খাইয়ে সব লুটে নিয়েছে

বার্তাবাংলা রিপোর্ট ::রাজধানীর হাজারীবাগের কোম্পানিঘাটের ৪৮/১৩ নম্বর বাসায় রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তরিকুল ইসলাম তপু ও কানিজ ফাতেমা লিলি দম্পতি। পরদিন দুপুরে তাদের সাড়াশব্দ না পেয়ে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। অচেতন অবস্থায় তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান তারা। চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরে তারা দেখেন, মালামাল তছনছ, আলমারিতে রাখা দেড় লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র নেই। পরে তারা বুঝতে পারেন, বুয়া চেতনানাশক খাইয়ে সব লুটে নিয়েছে।

ঘটনা ২ : হাজারীবাগের টালী অফিস রোডের ২৯১/বি নম্বর বাসা। গৃহকর্তা এনামুল হক প্রবাসী। তার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে একাই বাসায় থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে ওই বাসায় কাজ করছেন গৃহকর্মী আশা। ২৪ জানুয়ারি রাতে তাসলিমাকে চেতনানাশক খাইয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে আশা ও তার সহযোগীরা। পরে তারা ৭০ হাজার টাকা ও চার ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

ঘটনা ৩ : ৯ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের সি বস্নকের ১৭/১৭ নম্বর বাসা থেকে বুয়ার যোগসাজশে বাড়ির লোকজনকে চেতনানাশক খাইয়ে মালামাল লুট করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন থানায় মামলা হয়; কিন্তু মঙ্গলবার পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। ৪ এপ্রিল রাজধানীর দক্ষিণখান থেকে বিপুল পরিমাণ চোরাই মালামালসহ মর্জিনা ওরফে শেফালী ও ঝর্ণা ওরফে স্বর্ণা নামে বুয়ারূপী পেশাদার দুই চোরকে আটক করে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ছদ্মনাম ব্যবহার

করে অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, মোহাম্মদপুরে তারা টার্গেট করে বাসায় কাজ নেয়। এর পর অল্প সময়ে মালিকের আস্থা অর্জন করে। সুযোগ বুঝে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক খাইয়ে সবাইকে অচেতন করে সর্বস্ব লুটে নেয়। ১৯ জানুয়ারি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বি বস্নকের ২ নম্বর সড়কের ২৪১ নম্বর বাড়ির সবাইকে অচেতন করে বুয়া মর্জিনার সহায়তায় ১৪ লাখ টাকার মালামাল লুটে নেয় দুর্বৃত্তরা। কখনও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চক্রের অন্য সদস্যদের যোগসাজশে সর্বস্ব লুটে নেয় তারা। বাধা এলে খুন করতেও পিছপা হয় না তারা। রাজধানীজুড়ে কয়েক মাসে বুয়া সেজে এ ধরনের অসংখ্য প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ভুক্তভোগীই পুলিশি হয়রানির ভয়ে থানায় অভিযোগ করেন না। এসব ঘটনার সঠিক কোনো পরিসংখ্যানও নেই পুলিশের কাছে। তাই আড়ালেই থেকে যাচ্ছে ভয়ঙ্কর এসব অপরাধী। অভিযোগ না পাওয়ায় আইনি ব্যবস্থাও নিতে পারছে না পুলিশ। আর এ সুযোগে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অপরাধীচক্রটি।

বুয়া সেজে সংঘটিত চুরি, ডাকাতি ও হত্যাকা-ের ঘটনাগুলো সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত-প্রকাশিত হওয়ায় রাজধানীবাসী গৃহকর্মীদের ওপর বিশেষ নজর দিতে শুরু করেছেন। অনেকেই তাদের বাসার গৃহকর্মীকে বাদ দিয়েছেন। অনেকে বুয়ার বিস্তারিত নাম-পরিচয় জানার চেষ্টা করছেন। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা লিপি আক্তার বলেন, তার স্বামী সকালে কাজে বের হয়ে রাতে বাসায় ফেরেন। দীর্ঘ সময় তারা মা-মেয়ে একা থাকেন। বুয়ার যোগসাজশে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় তিনি বাসার গৃহকর্মীকে আগামী মাস থেকে কাজে না আসতে বলে দিয়েছেন। সবুজবাগের বাসিন্দা ফারহানা আক্তার সুমী জানান, বাসায় স্বর্ণ চুরি ও ডাকাতির সঙ্গে বুয়াদের সম্পৃক্ততা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় তিনি আতঙ্কে রয়েছেন। নিরাপত্তার কথা ভেবে এরই মধ্যে বাসার খ-কালীন বুয়াকে বাদ দিয়েছেন। গ্রাম থেকে পরিচিত কোনো মেয়েকে আনার কথা ভাবছেন তিনি। এ বিষয়ে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বুয়া সেজে বাসার লোকজনকে অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুটে নেয়ার ঘটনা বেড়েছে। তবে নাগরিকদের সচেতনতাই এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট। বাসায় কাজের লোক নিয়োগ দেয়ার আগে তার বিস্তারিত নাম-পরিচয় জেনে নেয়া উচিত।