বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে

বার্তাবাংলা ডেস্ক::আড়ংয়ের ই-কমার্স উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গভর্নর উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। প্রিয়.কম এর পাঠকদের জন্য বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হল:

আজকের অনুষ্ঠানের সম্মানীয় সভাপতি, উপস্থিত বিশেষ অতিথি ও আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, মিডিয়ার কর্মীগণ এবং সুধীবৃন্দ, শুভ অপরাহ্নে সবাইকে জানাই আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।

পণ্য যাচাই বাছাইয়ে অবাধ সুবিধা এবং সুলভে পছন্দমত জায়গায় পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে গ্রাহককে সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ই-কমার্স সেবা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহন করার জন্য আমাদের স্বদেশী পণ্যের বৃহত্তম ভান্ডার আড়ং-কে ধন্যবাদ জানাই। এ ওয়েবসাইট উন্মুক্ত করণের মাধ্যমে আড়ং দেশীয় গ্রাহকদের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও আমাদের পণ্য দ্রুত এবং সহজে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করছে বিধায় তাদেরকে জানাই আমার আন্তরিক সাধুবাদ।

বিশ্বায়নের এ যুগে ভোক্তার স্থান-কাল-পাত্রের বিভেদ ঘুচাতে ই-কমার্স সবচেয়ে কার্যকরী ভুমিকা রাখছে। উন্নত দেশগুলো এ কার্যক্রমে অগ্রনী ভুমিকা রাখলেও বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোও দ্রুত এ বৈশ্বিক ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ২০১৩ সালে ই-কমার্সের মাধ্যমে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের পণ্য ক্রয়-বিক্রয় বা বিনিময় হয়েছে; যাতে এশিয়া-প্যাসিফিকের দেশগুলো ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও অগ্রনী ভুমিকা পালন করেছে।

আপনারা জানেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একই সাথে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার যথাযথ নিবিড় পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথেও সমন্বয় রেখে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে সকল তফসিলী ব্যাংককে তাদের ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের জন্য নিন্মোক্ত সুবিধাগুলো প্রদান করতে পারবে মর্মে নীতিমালা ঘোষনা করে, যা ছিল দেশে ই-কমার্স প্রবর্তনের প্রথম মাইলফলক।

এ নীতিমালার মধ্যে রয়েছে-

১. অনলাইনে গ্রাহক কর্তৃক নিজ হিসাব থেকে প্রাপক পক্ষের ব্যাংক হিসাবে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ;

২. গ্রাহকের এক ব্যাংক হিসাব থেকে একই ব্যাংকের গ্রাহকের নামে রক্ষিত অন্য ব্যাংক হিসাবে অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর;

৩. ই-কমার্স ব্যবস্থায় ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য পরিশোধ বা আদায়ের সূত্রে ক্রেতার ব্যাংক হিসাব থেকে বিক্রেতার ব্যাংক হিসাবে অনলাইনে পরিশোধ দেয়া বা আদায়; এবং

৪. স্থানীয় মুদ্রায় ইন্টারনেটে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন করা।

এছাড়াও ই-কমার্সে ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা প্রদান ব্যবস্থা সহজতর করার লক্ষ্যে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ NPSB স্থাপন করা হয়েছে। ওয়েব পোর্টাল/ইন্টারনেটের মাধ্যমে পন্য/সেবা বিক্রয়, ফ্রিল্যান্সিং/বিজনেস প্রসেস, আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ প্রত্যাবসন, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনলাইনে সীমিত আকারে পন্য/সেবা ক্রয়ের সহজতর নীতিমালা প্রনয়নের মাধ্যমে ই-কমার্স কে উৎসাহিত করনের কার্যক্রম গ্রহন করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ই-কমার্স লেনদেন হচ্ছে। এ লেনদেনকে আরো বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে ই-কমার্স আরো নিরাপদ হবে এবং ব্যাংকগুলোও ঝুঁকিমুক্তভাবে ই-কমার্সের জন্য ক্রেডিট কার্ড ওপেন রাখতে পারবে।

বাংলাদেশে ই-কমার্স সেবা দেবার জন্য সক্রিয় ওয়েব পোর্টাল রয়েছে ৪০টির অধিক। ১০০টির বেশি ফ্যাশন হাউজ ই-কমার্সের মাধ্যমে তাদের পন্য বিক্রি করছে।

কুরবানীর গরু থেকে শুরু করে পদ্মার ইলিশ, নকশী কাঁথা, শাকসবজী সবই বিক্রি হচ্ছে ই-কমার্সের মাধ্যমে। এছাড়া রয়েছে ৫০০ শতাধিক ফেসবুক পেইজ,যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রোডাক্ট প্রোমোট করা হচ্ছে। সুখের বিষয় ই-কমার্সের প্রধান উদ্যোক্তা আমাদের প্রান প্রাচুর্যে ভরা তরুন সমাজ।

ই-কমার্সের জন্য পন্য উৎপাদনকারী যেসব গরীব মহিলা, ক্ষুদে উদ্যোক্তা রয়েছেন তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ টাকার হিসাব খোলার ব্যবস্থা করেছে যাতে সহজে তারা তাদের বিক্রয় লব্দ অর্থ অনলাইনে পেতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এ জাতীয় যেকোন নীতি সমর্থন দিতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।

ই-কমার্সের দ্রুত বিস্তার নিশ্চিতকরনের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশীয় বাজারে পন্যের বিক্রি বৃদ্ধি এবং ভোক্তাকে অধিকতর সুবিধা প্রদান, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে ব্রান্ড ভ্যালু প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন বৃদ্ধি করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি ক্রেতা এবং বিক্রেতার মনোভাব এবং বাণিজ্য সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনা আবশ্যক। লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে ই-কমার্সের জন্য কারিগরী অবকাঠামো নির্মাণ এবং সুযোগ সুবিধা প্রদান সহজ হলেও ব্যবসায়িক ও ভোক্তাদেরকে এ ব্যাপারে সচেতন এবং ই-কমার্স মুখী করে তোলা অপেক্ষাকৃত কঠিন। তাছাড়া ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষার বিষয়টিও জরুরি। তারা যাতে প্রতারিত না হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে। এলক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সাথে নিয়মিত মত বিনিময় করছে। এছাড়া সাধারণ গ্রাহকদের জন্য আর্থিক সাক্ষরতা কার্যক্রম গ্রহন করেছে, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরাপদ পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তুলতে চালু করা হয়েছে অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ ও ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক। ব্যাংকিং লেনদেনের গতি আরো বাড়াতে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (RTGS) সিস্টেম বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এক ব্যাংকের গ্রাহকের হিসাব থেকে অন্য ব্যাংকের গ্রাহকের হিসাবে বড় অংকের টাকা অনলাইনে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও ই-কমার্স প্রসারে সকল ব্যাংকের বিভিন্ন লেনদেনের একক প্লাটফর্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্থাপন করা হয়েছে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ। এ ব্যবস্থায় ATM, POS প্রভৃতির ব্যবহারও বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের পেমেন্ট সিস্টেমসকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সামাজিক দায়বোধ প্রণোদিত বিভিন্ন কার্যক্রমও গ্রহন করেছে। কৃষি, এসএমই সহ উৎপাদনমুখী ও পরিবেশবান্ধব খাতগুলোতে ঋনের যোগান বাড়ানো, কৃষক ও হতদরিদ্রদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেয়া, বর্গাচাষিদের জন্য বিশেষ ঋন, আমদানি নির্ভর ফসল চাষে কমসুদে ঋন, ক্ষুদে ও নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋনের সুযোগ সৃষ্টি, স্কুল ব্যাংকিং, কর্মজীবী পথশিশুদের জন্যে ব্যাংক হিসাব খোলা, সামাজিক দায়বদ্ধ কর্মকান্ড প্রসারে বিভিন্ন ব্যাংককে তাগিদ দেয়া ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রহন করা হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে এবং অল্প খরচে টাকা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত পাঠানোসহ সীমিত আকারের ব্যাংকিং সেবা গণমানুষের কাছে পৌছে দেয়ার জন্যে প্রবর্তন করা হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং। এ সৃজনশীল সেবার মাধ্যমে বিদেশ হতে প্রেরিত ও দেশের ভেতরের রেমিটেন্স বিতরন সহজ করা হয়েছে। বর্তমানে ১ কোটি ৫০ লক্ষ ২৪ হাজার মানুষ মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব খুলে এ সেবা গ্রহন করছেন। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন বিল, রেল ও ক্রিকেট খেলার টিকেট কেনা, বেতন ভাতা প্রদান, কেনাকাটা ইত্যাদি সেবাও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া যায়।

মোবাইল ব্যাংকিং আজ ই-কমার্স প্রসারের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

আড়ং আজ বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বের প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে, যার পরিচিতি বিশ্বব্যাপী। আড়ং এর বাজার রয়েছে সর্বত্র। ই-কমার্স প্রবর্তন এ বাজারকে আরো সম্প্রসারিত করবে। আড়ং এর দেশী উচ্চমানের পন্য ভোক্তার জন্য করবে সহজলভ্য। আড়ং এর এ উদ্যোগ অন্যান্য ব্রান্ডকেও ই-কমার্স সেবা প্রদানে উৎসাহিত করবে।

পরিশেষে আমি গ্রাহকদের পন্য ক্রয়ের ২৪/৭ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ই-কমার্স ওয়েবসাইট শুরু করার জন্য আড়ং -কে অভিনন্দন জানিয়ে আড়ং ই-কমার্সের শুভ উদ্ধোধন ঘোষনা করছি।