রাজাকার জব্বারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

ডেস্ক :: একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আমলে নিয়ে পিরোজপুরে শান্তি বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

এর আগে, রোববার তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন। সোমবার সকালে এ নিয়ে শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জব্বারের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতনের ৫টি অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিচারপতি ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সোমবার ওই অভিযোগ উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জাহিদ ইমাম।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অভিযোগ আমলে নিয়ে জব্বারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।

এর আগে গত ২৮ এপ্রিল আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন, ধর্মান্তরিতকরণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, অপহরণ ও নির্যাতনের পাঁচ অভিযোগ উঠে এসেছে। একাত্তরে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে তত্কালীন পিরোজপুর মহকুমাতে শান্তি কমিটি গঠন করেন আবদুল জব্বার। তিনি এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন স্থানীয় খান বাহাদুর সৈয়দ মো. আফজালকে। আবদুল জব্বার নিজে পিরোজপুর মঠবাড়িয়ার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হন। এ ছাড়া তিনি দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করার লক্ষ্যে মঠবাড়িয়াতে ‘সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী’ গড়ে তোলেন। পলাতক আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা, একজন সাধারণ মানুষকে হত্যা, ৩৩ জনকে গণহত্যা, ২০০ হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করা, ১৫ জনকে নির্যাতন-জখম এবং ৫৫৭ বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৮ এপ্রিল ধানমণ্ডিতে তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান ও জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক এম সানাউল হক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার হেলাল উদ্দিন ও কৌঁসুলি জাহিদ ইমাম উপস্থিত ছিলেন। তদন্ত সংস্থা জানায়, একাত্তরের ৬ মে জব্বারের নির্দেশে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় যশোর বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকারী গণপতি হালদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বীরেন, ভিপি আনোয়ারুল কাদির, জিয়াউজ্জামান, গোলাম মোস্তফা, অমল, শ্যাম বেপারি ও আবদুল মালেককে হত্যা করা হয়। ’৭১ সালে পিরোজপুরের সাপলেজা কাচারিবাড়ির এক জনসভায় জব্বার ইঞ্জিনিয়ার উদ্ধত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দুদের স্থান এই পাকিস্তানের মাটিতে হবে না, হিন্দুদের সম্পদ সব গনিমতের মাল, সবকিছু মুসলমানদের ভোগ করা জায়েজ।’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২১ জুন জব্বারের ‘সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী’র হাতে নিহত হন বিনোদ বিহারীর ছেলে যজ্ঞেস বিশ্বাস। এ অভিযোগে ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল জব্বারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়।

আবদুল হান্নান খান (আইজিপি) বলেন, মঠবাড়িয়ায় ১৯৩২ সালের ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আবদুল জব্বার। ১৯৫৬ সালে প্রকৌশল বিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করেন। পরে শ্বশুর ও তত্কালীন প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা আরশেদ আলীর প্রভাবে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতি শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পিরোজপুরে মহকুমা শান্তি কমিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্বে মঠবাড়িয়ায় ১৫০ জনের ‘সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী’ গঠন করা হয়। এম সানাউল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে জব্বারের নির্দেশনায় মঠবাড়িয়ার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে ২০০৯ সালে তিনি আত্মগোপন করেন। তিনি ফ্লোরিডায় মেয়ের বাসায় অবস্থান করতে পারেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে আবদুল জব্বার জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৮৬ ও ’৮৮ সালে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। মামলায় সাক্ষী ৪৬ জন। গত বছরের ১৯ মে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। গত রোববার শেষ হয়। তার বিরুদ্ধে ৯৯ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।